রাসিক নির্বাচন ৩০ জুলাই

নিউজ ডেস্ক: রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) এলাকার প্রধান সমস্যাগুলো হচ্ছে ভাঙাচোরা সড়ক, জলাবদ্ধতা ও মাদক। নগরের বেশির ভাগ সড়ক ভাঙাচোরা। অনেক ওয়ার্ডে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা খুবই নাজুক। ভারী বৃষ্টি হলেই তৈরি হয় জলাবদ্ধতা। এছাড়া মাদকের ভয়াবহ বিস্তারে উদ্বিগ্ন নগরবাসী। এ কারণে এই তিন সমস্যাসহ আরও কিছু সমস্যা চিহ্নিত করে এবারের সিটি নির্বাচনে মাঠে নেমেছেন প্রার্থীরা। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে সমস্যাগুলোর সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তারা।

রাসিকের আয়তন ৯৭.১৮ বর্গ কিলোমিটার। ৩০টি ওয়ার্ড ও ১৩৪টি মহল্লাজুড়ে বিস্তৃত এই মহানগরীর অধিকাংশ সড়কই বেহাল। ২০১৭ সালের হিসেব অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনের ৪১৮টি হোল্ডিংয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন ৪ লাখ ৯০ হাজার ৩২২ জন। তবে অস্থায়ীভাবে বসবাস করেন আরও ৪ লাখ মানুষ।

রাসিকের বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, মেয়র নির্বাচনই এখন নগরবাসীর আলোচনার বিষয়বস্তু। আসন্ন ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য সিটি নির্বাচনকে ঘিরে ভোটারদের মধ্যে চলছে নানা আলোচনা। গত পাঁচ বছর সিটি করপোরেশন কতটুকু নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে পেরেছে, চলছে তারই হিসাব-নিকাশ।

অনেকের মতে, পরিচ্ছন্ন ও ঝকঝকে সবুজ আধুনিক রাজশাহী মহানগরী এখন বিবর্ণ ও ধূসর। রাস্তাঘাটে খানাখন্দ। এছাড়া মশার উপদ্রব, পুকুর ভরাট এবং মাদকের বিস্তার ঘটেছে ব্যাপক। মহল্লায়-মহল্লায় এখন মাদকের অবাধ কেনাবেচা ও অসামাজিক কার্যকলাপ বেড়ে গেছে। স্বাস্থ্যসেবার নামে চলছে অরাজকতা। চিকিৎসার জন্য অধিকাংশ রোগী যাচ্ছেন ভারতে। অথচ এ চিত্র আগে ছিল না। কারণ, আগে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভালো চিকিৎসা দেওয়া হতো।

নগরীর তালাইমারীর সেলিনা খাতুন, টিকাপাড়ার রফিকুল ইসলাম, বিনোদপুরের রমজান আলী, সপুরার হাবিবুর রহমান পাপ্পু, রেজাউল করিম, উপশহরের জিএম বাবুল চৌধুরী, সিএন্ডবি মোড় এলাকা আশরাফ আলী বাবু, কাজিহাটার লোকমান হোসেন, কোর্ট এলাকার মোখলেসুর রহমান, রাজপাড়া এলাকার মাইনুল ইষরাম, বড়কুঠি এলাকার শহিদুল ইসলাম সঞ্জু নামের কয়েকজন অভিযোগ করেছেন, গত পাঁচ বছর তারা দুর্বিষহ জীবনযাপন করেছেন। মশা নিধনের কোনও ওষুধ ঠিকমতো ছিটানো হয়নি। ড্রেনগুলোও নিয়মিত পরিষ্কার করা হয়নি। কিন্তু চড়া মূল্যে ট্যাক্স নেওয়া হয়েছে। সিটি করপোরেশনে সেবার জন্য গেলেও সেবা পাওয়া যায়নি। পাড়া-মহল্লায় যেসব রাস্তা-ঘাট ও ড্রেন ছিল, সেগুলো ভেঙে গেছে। শুধু তাই নয়, নগরীর অধিকাংশ এলাকায় এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। সপুরা ও বিসিক এলাকায় লাগেনি উন্নয়নের ছোঁয়া। গণশৌচাগারের সমস্যাও প্রকট। সেই সঙ্গে ফুটপাত ব্যবসায়ীদের দখলে। অত্যধিক অটোরিকশার কারণে যানজট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

এসব বিষয়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সদ্য সাবেক মেয়র ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেন, ‘আমার মেয়াদের অর্ধেক সময় সিটি করপোরেশন পরিচালনা করতে পেরেছি। নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে নগরবাসীর সেবা করতে পারিনি। তবে চেষ্টার কোনও ত্রুটি ছিল না। আর রাজশাহী অঞ্চলে ব্যাপক আমের ফলন হয়। তাই আমের মুকুল আসার কারণে সে সময় মশা মারার ওষুধ দিতে পারিনি। কারণ,বৈজ্ঞানিকভাবে ওষুধ দিলে আমের ক্ষতি হতো। তাই নগরবাসীর অসুবিধার কারণে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’

নগরীর এক নম্বর ওয়ার্ডের গুড়িপাড়া এলাকার মতিউর রহমান বলেন,বৃষ্টি হলে রাস্তা পানিতে ডুবে যায়। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও ভালো নেই। সাগর আলী নামের একজন বলেন, ‘আমাদের এলাকায় অনেকে মাদক বেচাকেনা করে। ছেলেমেয়েদের নিয়ে আমরা ভয়ে থাকি।’ কাউন্সিলর প্রার্থী মনসুর রহমান বলেন,‘আমার ওয়ার্ডে নয়টি মহল্লায় নতুন নতুন রাস্তা করতে হবে। কারণ এলাকায় নতুন বাড়ি তৈরি হচ্ছে। নতুন নালাও করতে হবে।’

নগরীর ৩ নম্বর ওয়ার্ডে ভোটার ১৪ হাজার ৮৫০ জন। স্বাস্থ্য ও ড্রেনেজ সেবা এই ওয়ার্ডে প্রধান সমস্যা। এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, সমস্যা আছে। এটা অস্বীকার করবো না। তবে বরাদ্দ অনুযায়ী,ওয়ার্ডবাসীর সেবা করার চেষ্টা করি। এদিকে সিটি করপোরেশনের ৩০টি ওয়ার্ডের মধ্যে পরিচ্ছন্ন হিসেবে স্বীকৃত ৫ নম্বর ওয়ার্ড। তবে রাজপাড়া ও ভাটাপাড়া এলাকার বেশ কিছু রাস্তা ও ড্রেনের অবস্থা নিয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। মহিষবাথান, ভাটাপাড়া ও রাজপাড়া নিয়ে এই ওয়ার্ড। ১০ হাজার ৯শ’৬৭ জন ভোটারের এই ওয়ার্ডটিতে প্রার্থী রয়েছেন পাঁচজন। তারা হলেন, বর্তমান কাউন্সিলর কামরুজ্জামান কামরু, সাবেক কাউন্সিলর আবুল হাশেম, মাহাতাবুল ইসলাম বাবু, আছির উদ্দিন ও কামরুজ্জামান সোহেল। নির্বাচনকে ঘিরে প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। ওয়ার্ডের উন্নয়নে কাউন্সিলরের কর্মকাণ্ড নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে ওয়ার্ডবাসীর। কারও মতে, তিনি সফল কাউন্সিলর। তবে অনেকেই অভিযোগ করেছেন, ওয়ার্ডে রাস্তাঘাট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা খুবই খারাপ। তবে কাউন্সিলর কামরুজ্জামান কামরুর দাবি,রাস্তাঘাট ও ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার করা হয়।

২৬ নম্বর ওয়ার্ডের চকপাড়া এলাকার সড়কে ইট-পাথরের প্রলেপ পড়েনি। এই ওয়ার্ডের উত্তর বাগানপাড়া এলাকায় পাকা রাস্তা ও নালা হয়েছে। সেই নালার ওপর কোনও স্ল্যাব নেই। নালার পানি নামে না। ময়লা-আবর্জনা জমে থাকে। এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নূর মোহাম্মদ মোল্লা বলেন, ‘দুই মাস আগে ওয়ার্ডের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। সাড়ে ৪ কোটি টাকার কাজগুলো হলে প্রধান সমস্যাগুলো মিটে যাবে।’

নগরীর ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের ছোটবনগ্রাম উত্তরপাড়া এলাকার আশরাফুল ইসলাম বলেন, তাদের রাস্তা এখনও কাঁচা। বৃষ্টি হলেই পানি জমে। এই ওয়ার্ডের গৃহবধূ মোর্শেদা বেগম বলেন, তারা রাস্তা চেয়েছেন, বিদ্যুত চেয়েছেন। কিন্তু কাউন্সিলর দেখা করেন না। তবে এ বিষয়ে ওয়ার্ড কাউন্সিলর নুরুজ্জামান বলেন, ‘যারা আমাকে পছন্দ করে না তারা এ ধরনের অভিযোগ করবে। এই ওয়ার্ডে নতুন বিদ্যুত সংযোগ হয়েছে। রাস্তার কাজও শুরু হয়েছে। আগামী তিন-চার মাসের মধ্যে কাজ শেষ হবে।’

নগরীর দুই নম্বর ওয়ার্ডের ১১টি মহল্লার মধ্যে ৭টি মহল্লায় কোনও নালা নেই। বাকি চারটির অবস্থাও খারাপ। নালা থাকলেও কাদায় ভরে আছে। বাঁশের খুটি দিয়ে বিদ্যুতের লাইন টানা আছে বেশকিছু এলাকায়। এ ব্যাপারে ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাহবুব সাইদ বলেন, ‘ওয়ার্ডের অবস্থা বেহাল। রাস্তাঘাট ও নালা ঠিক করার জন্য সিটি করপোরেশন থেকে কোনও বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।’ এসব বিষয়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক বলেন, ‘সমস্যা আছে। সমাধানও করা হচ্ছে।’

এদিকে সিটি করপোরেশন এলাকায় মাদকের বিস্তার ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। নগরীর চার নম্বর ওয়ার্ডে ভোটার সংখ্যা ১০ হাজার ১৮৬। এ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে ৫ জন প্রার্থী রয়েছেন। কাউন্সিলর রুহুল আমিন টুনু বলেন, ‘ওয়ার্ডে ৯০ ভাগ স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়েছে। শিশুদের নিয়মিত টিকা দেওয়াসহ রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, ড্রেন নির্মাণ ও বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্কও এই ওয়ার্ডে নির্মিত হয়েছে।’ তবে ওয়ার্ডটিকে পুরোপুরি মাদকমুক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি স্বীকার করেন।

২৩ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত কাউন্সিলর শাহানাজ বেগম বলেন, ‘এই ওয়ার্ডের মাদক সেবনকারীরা টাকার বিনিময়ে দলীয় মিছিলে যায়। এতে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। ফলে তারা অনেকটা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন।’

২৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আরমান আলী বলেন, তার এলাকায় মাদক নির্মূল পুরোপুরি সম্ভব হয়নি।

এদিকে অভিযোগ রয়েছে এবার সাধারণ কাউন্সিলর পদে এক চিহ্নিত মাদক চোরাকারবারিও মনোনয়নপত্র তুলেছেন। রাসিকের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের এই কাউন্সিলর প্রার্থীর নাম জহিরুল ইসলাম। তিনি বর্তমানে কারাগারে। ওই প্রার্থীর আত্মীয়-স্বজন তার পক্ষে মনোনয়নপত্র তুলেছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও সিনিয়র সহকারী কমিশনার ইফতেখায়ের আলম বলেন, ‘জহিরুলকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মাদক চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’