নারীর ক্ষমতায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) শংকর রঞ্জন সাহা বলেছেন, বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধানে নারী-পুরুষকে সমান অধিকার দিয়ে এদেশকে সোনার বাংলায় পরিণত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। আজ তাঁরই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর নারীর ক্ষমতায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি একজন সফল ও মহিয়সী নারী। নারীদের ক্ষমতায়ন যাতে সঠিকভাবে হয় সে লক্ষ্যে আইন করে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে উপজেলা, জেলা, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, সিটি কর্পোরেশন ও জাতীয় সংসদে নারীদের সম্পৃক্ত করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা, স্পিকার ও জাতীয় সংসদে অনেক নারী এমপি-মন্ত্রী রয়েছে।

সরকারের মন্ত্রণালয় ও সচিবালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে পুরুষদের পাশাপাশি সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, উপ-সচিব, সিনিয়র সহকারী সচিব, সহকারী সচিব ও সহকারী কমিশনার পর্যায়ে অনেক নারী কর্মকর্তা রয়েছে। দেশের ৬৪টি জেলার জেলা প্রশাসকদের মধ্যে ৯ জন নারী জেলা প্রশাসক দক্ষতার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনে জেলা প্রশাসকসহ ৯ জন পুরুষ ও ১৫ জন নারী কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছে। সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীতেও নারীদের অবস্থান রয়েছে। দেশে এমন কোন সরকারি-সেরকারি সেক্টর বা দপ্তর নেই যেখানে নারীদের অবস্থান নেই। সকল ক্ষেত্রে নারীদের যে অধিকার তা যদি সুনিশ্চিত করতে পারি তাহলে জাতির পিতার স্বপ্ন এদেশকে সোনার বাংলায় রূপান্তর এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভিশন-২০২১ বাস্তবায়ন, ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে।

অপ্রতিরোধ্য উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ। এখানে নারী-পুরুষের সমান ভ‚মিকা রয়েছে। পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের ক্ষমতায়ন ও নিরলস পরিশ্রমের ফলে আমরা এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পৌঁছে গেছি। উন্নত দেশে পৌঁছতে হলে নারীদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে। তাহলে সমাজ ব্যবস্থায় উন্নয়ন হবে। নারীদের উন্নয়ন ছাড়া এদেশের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন কখনো সম্ভব নয়। আমরা নারী-পুরুষ ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সকলে মিলে এদেশকে একসাথে কাজ করলে আগামীতে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে পারবো।

গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় নগরীর ষোলশহরস্থ এলজিইডি কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত চট্টগ্রামের বিভাগের শ্রেষ্ঠ জয়িতাদের সংবর্ধনা ও সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে (জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ) প্রধান অতিথির বক্তব্য তিনি এসব কথা বলেন। সরকারের মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উদ্যোগে ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার অফিসের ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল “জয়িতা তোমরাই বাংলাদেশের আলোকবর্তিকা”।

তিনি বলেন, দেশের বিভিন্নস্তরে নারীরা আজ নিজ নিজ মেধা ও কর্মদক্ষতায় যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। শিক্ষা ও চাকুরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা এখন আর পিছিয়ে নেই। নারীদের প্রতি সহনশীল হলে দেশ উন্নয়নের দিকে আরো অনেক দূর এগিয়ে যাবে। নারীর ভিতর যখন আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি হবে তখন যত কঠিন বিষয় হোক না কেন তারা জয়ী হবেই। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে নারীরা নানা অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হয়।

আবার ভালোবাসাও অর্জন করে। মেয়ে হয়ে জন্ম নেয়ার কারণে অনেক নারীকে শত বাধা বিপত্তি অতিক্রম করতে হয়। সফলতা অর্জনে পুরুষের চেয়ে নারীদের কষ্ট অনেক বেশি। নারী মানে মা জাতি। জয়িতারাও মা। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও একজন সফল মা। মায়ের চেয়ে বড় শব্দ এই পৃথিবীতে আর নেই। তারা স্বামী ও সন্তানদের জন্য অনেক কষ্ট করে। তাদেরকে সব সময় সম্মান দেখাতে হবে। তাদের প্রতি কখনো অবহেলা না করে সহনশীল হতে হবে। যারা বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হয়েছেন কিংবা হতে পারেননি তারা সকলেই সফল। আজ যারা বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতা হয়েছেন তারা আগামীতে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করবেন এবং অন্যান্য নারীকে স্বাবলম্বী হওয়ার সাহস যোগাবেন বলে আশা করি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মহিলা বিষয়ক অধিদফতর নারীদের কল্যাণে পাশে থাকবেন।

অনুষ্ঠানের মুখ্য আলোচক চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. শিরীণ আকতার বলেন, প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর নারীদের ভার নিয়েছেন। তিনি একজন মহিয়সী নারী হয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ দফতরগুলোতে নারীদের ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি করেছেন। নারী-পুরুষ সমতা আনায়নের লক্ষ্যে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে নারীদের সম্পৃক্ত করেছেন। নারীর ক্ষমতায়ন ও দেশের জন্য তিনি উন্নয়নের রোল মডেল। শিক্ষাক্ষেত্রে জিপিএ-৫ এ ছাত্রদের চেয়ে ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদেরকে স্বর্ণ পদক দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

আমাকেও এই বিশ^বিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। নারীদের এগিয়ে যেতে হলে পুরুষদের সহযোগিতা প্রয়োজন। স্বাবলম্বী হতে প্রত্যেক নারীকে তার চিন্তা-চেতনা ও কাজে-কর্মে সচেষ্ট থাকতে হবে। আজকে যারা জয়িতা নির্বাচিত হয়েছেন ও যারা নির্বাচিত হতে পারেননি তারাও মুকুট পড়ার যোগ্য। যারা জয়িতা তারা বাল্য বিবাহ ও বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের কারণে অনেক কষ্ট ভোগ করছেন। আজ ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে জীবন যুদ্ধে জয়ী হয়ে তারা জয়িতা নির্বাচিত হয়েছেন। নিজেরা জেগে উঠুন, অন্যদের জাগরিত করুন। নারী-পুরুষ প্রত্যেকে এগিয়ে আসলে আগামী বাংলাদেশ বিনির্মাণে আগামীতে সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন বলেন, দেশের সার্বিক উন্নয়নে নারীদের অবদানের স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে নারীদের আত্মশক্তিতে উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যকে সামনে রেখে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশব্যাপী ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ শীর্ষক কার্যক্রম বিগত ২০১৩ সাল থেকে শুরু হয়। এ কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংগ্রামী ও প্রতিভাবন নারীদেরকে স্বীকৃতি ও সম্মাননা দেয়া হয়। দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী জনগোষ্ঠীকে নিয়ে বর্তমান সরকারের অগ্রযাত্রাকে আরো ত্বরান্বিত করতে হলে নারীর সাফল্য, সংগ্রাম ও উন্নয়ন সমগ্র জাতির সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন।

সভাপতির বক্তব্যে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মো. নুরুল আলম নিজামী বলেন, বাংলাদেশের নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া বাংলাদেশ অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌছতে পারবে না। তাই প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার নারী শিক্ষায় যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। নারীর প্রতি নির্যাতন, সহিংসতা ও অন্যায়-অনাচার রোধে সরকার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন। নারীরা স্বাবলম্বী হলে দেশ স্বাবলম্বী হবে। তাই বিভেদ ভুলে জীবন ভিত্তিক শিক্ষা অর্জন করে নারী-পুরুষ এক সাথে কাজ করলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাবে তাহলে এদেশ আর পিছিয়ে থাকবে না। নারীদেরকে সমাজের সত্যিকারের মানুষ হিসেবে সম্মান করব, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব। চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জেলার তৃণমূল পর্যায় থেকে ৫ ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত ৫৫ জন জয়িতা থেকে নিরপেক্ষ বিচারকের নিরপেক্ষ ভ‚মিকায় মোট ৫ জনকে বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচন করা হয়েছে। তারা আগামীতে জাতীয় পর্যায়ে যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।

অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মো. নুরুল আলম নিজামীর সভাপতিত্বে ও সহকারী কমিশনার (ভ‚মি-বাকলিয়া) সাবরিনা মুস্তফার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিভাগের শ্রেষ্ঠ জয়িতাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) শংকর রঞ্জন সাহা। মুখ্য আলোচক ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আকতার। বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা অঞ্জন ভট্টাচার্য। বিচারকদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সরকারি সিটি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ঝর্ণা খানম, চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ, নারী নেত্রী ও মানবাধিকার কর্মী জেসমিন সুলতানা পারু। জয়িতাদের মধ্যে নিজের অনুভ‚তি প্রকাশ করেন অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ির লুবনা মরিয়ম, বান্দরবান পার্বত্য জেলা সদরের উজানী পাড়ার উর্মি চৌধুরী, শিক্ষা ও চাকুরি ক্ষেত্রে কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার রাশিদা আক্তার, সফল জননী লক্ষীপুর জেলা সদরের সেলিনা আক্তার, চট্টগ্রাম জেলা ফটিকছড়ি উপজেলার রাজিয়া মাসুদ, নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করা তোয়ার নেম বম, সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখা রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা সদরের কনিকা বড়–য়া ও চাঁদপুর জেলার উত্তর মতলবের পারভীন শরীফ।

জয়িতা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মোট ৫টি ক্যাটাগরিতে বিভাগের ১১ জেলার মোট ৫৫ জন জয়িতার মধ্যে থেকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পর্যায়ে ৫ জনকে শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত করে প্রত্যেকের হাতে নগদ টাকা, ক্রেস্ট ও সনদপত্র তুলে দেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার শংকর রঞ্জন সাহা সহ অন্যান্য অতিথিবৃন্দ। এছাড়া অন্য ৫০ জন জয়িতাকেও নগদ টাকা, ক্রেস্ট ও সনদপত্র প্রদান করা হয়। বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতারা হচ্ছে- অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার পারুল আক্তার, শিক্ষা ও চাকুরি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী লক্ষীপুর জেলার বাঞ্চানগরের আইরিন সুলতানা, সফল জননী নারী চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলার রাজিয়া মাসুদ, নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করা নারী তোয়ার নেম বম এবং সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখা নারী পারভীন শরীফ।

জয়িতা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের পদস্থ কর্মকর্তা, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা, নারী নেত্রী, সমাজকর্মী, ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সুধীজনেরা উপস্থিত ছিলেন। 

প্রিন্স, ঢাকা