রাঘববোয়ালরা আড়ালেই

নিউজ ডেস্ক: মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকার পরও নানা কৌশলে ইয়াবা আসছে, ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন জায়গায়। এই অভিযানে এ পর্যন্ত সারাদেশে গ্রেফতার হয়েছে ২১ হাজার মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ী; মামলা হয়েছে ১৪ হাজার ৯৩৩টি। অন্যদিকে, ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে মোট ১৫৩ জন। যাদের মধ্যে পুলিশের সঙ্গে ৮৪ জন, র‌্যাবের সঙ্গে ৩৪ জন এবং বাকি ৩৫ জন ‘মাদক ব্যবসায়ীদের দুই পক্ষের’ ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে। এর পরও ইয়াবা চক্রের শক্ত নেটওয়ার্ক এখনও ভাঙা সম্ভব হয়নি, রাঘববোয়ালও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।

ঘোষণা দিয়ে গত ১৮ মে থেকে দেশব্যাপী মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু করে পুলিশ। ৪ মে থেকে পৃথকভাবে অভিযানে নামে র‌্যাব। অভিযানে যারা ধরা পড়েছে অথবা নিহত হয়েছে, তাদের অধিকাংশই হয় চুনোপুঁটি, না হয় মধ্যম সারির মাদক ব্যবসায়ী। অভিযোগ, মাদক ব্যবসায়ীদের অনৈতিক সুবিধাও দিচ্ছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অসাধু কিছু সদস্য। অভিযান শুরুর পর পরই চিহ্নিত অনেক মাদক ব্যবসায়ী গা ঢাকা দিয়েছে, কেউ কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। এ অবস্থায় ‘বন্দুকযুদ্ধ’ নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাসহ বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্নও উঠছে।

তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, ‘মাদকের সঙ্গে জড়িত যেই হোক, তাকে আইনের আওতায় নেওয়া হবে। সেখানে রাঘব বোয়াল আর চুনোপুঁটি আলাদাভাবে দেখার সুযোগ নেই।’

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি সহেলী ফেরদৌস বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে, সম্পৃক্তদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি নেওয়া হয়েছে।’

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘মাদকের সাপ্লাই চেইন ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এখন ইয়াবা প্রায় দুষ্প্রাপ্য। কোনো কোনো মাদক ব্যবসায়ী গা-ঢাকা দিয়েছে। মাদকবিরোধী অভিযানের কারণেই এসব ক্ষেত্রে প্রভাব পড়েছে।’

দেশজুড়ে চলমান মাদকবিরোধী অভিযানের আগে পাঁচটি সংস্থা পৃথকভাবে তালিকা তৈরি করে। এসব তালিকায় সর্বমোট মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা চার হাজার। সবচেয়ে বেশি মাদক ব্যবসায়ী কক্সবাজারে। মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান আসা পুরোপুরি বন্ধ করা না গেলে মাদকরোধ করার সম্ভব নয় বলে মনে করছেন অনেকে। বর্তমানে রাজধানীতে তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী ৮২ জন। এ ছাড়া কোকেন পাচারের রুট হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করতে গিয়ে অনেক বিদেশি নাগরিকও সংশ্নিষ্ট এবং গ্রেফতার হচ্ছেন। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, মাদক প্রতিরোধে এদিকেও নজর রাখা দরকার।

অনেকে বলছেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যদের সংশ্নিষ্টতা ও সহযোগিতা ছাড়া মাদকের চালান সীমান্ত থেকে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য জায়গায় পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে গত এক বছরে শুধু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে ৭২ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয় আরও ৯০ জনকে। পুলিশের একাধিক সদস্যকেও গ্রেফতার করা হয় মাদক ব্যবসায় সংশ্নিষ্টতার কারণে।

সংশ্নিষ্ট সূূত্র জানায়, চলতি বছরের শুরুর দিকে গোয়েন্দা সংস্থা সারাদেশে মাদক স্পট ও মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পুলিশ সদস্য ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন পেশার যেসব ব্যক্তি অনৈতিক সুবিধা বা মাসোয়ারা নেন, তাদের তালিকা তৈরি করে। এ তালিকায় মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয়দাতাদের নামও উঠে আসে। তবে এদের অনেকেই এখনও আইনের আওতায় আসেনি। মাদক স্পটগুলো থেকে তাদের মাসোয়ারা আদায়ও অব্যাহত রয়েছে। যদিও এ তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার পর সেখান থেকে যাচাই করে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, বিভিন্ন জেলা পুলিশ সুপারদের কাছে এসব তালিকা পাঠানো হয়েছে। তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও বলা হয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকটি জেলায় তদন্তও শেষ হয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থার তৈরি করা তালিকার মধ্যে রংপুর, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলার মাদক ব্যবসায়ী ও স্পট থেকে মাসোয়ারা নেওয়া পুলিশ কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের তালিকা সমকালের হাতে এসেছে। এই তালিকা অনুযায়ী, এ তিন জেলায় পুলিশের ২৮ সদস্য বিভিন্ন স্পটে মাসোয়ারার বিনিময়ে মাদক ব্যবসায়ীদের সহায়তা করেন। তালিকা অনুযায়ী, রংপুরে ১০, লালমনিরহাটে পাঁচ এবং গাইবান্ধা জেলায় পুলিশের ১৩ সদস্য এমন অপকর্মে জড়িত। তবে পুলিশের এসব সদস্যের অনেকে ইতিমধ্যে বদলিও হয়েছেন। তালিকায় এ তিন জেলায় অর্ধশত স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতার নাম রয়েছে- যারা শতাধিক মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মাসোয়ারা নিয়ে থাকেন।

ইয়াবার গডফাদার হিসেবে এবারও আলোচনায় রয়েছেন কক্সবাজারের স্থানীয় সাংসদ আবদুর রহমান বদি। তবে তার ব্যাপারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে কখনও মুখ খোলেনি। বিভিন্ন সময় সংস্থাগুলোর করা মাদকের গডফাদারদের তালিকায় বদির পরিবারের লোকজনের নামও উঠে এসেছে।

রংপুরে ১০ পুলিশ সদস্য: রংপুরের তালিকায় রয়েছে পার্কের মোড় পুলিশ ফাঁড়ির এসআই এরশাদ, কোতোয়ালি থানার এসআই ওয়ালিয়ার রহমান, হারেছ শিকদার, তরিকুল ইসলাম, সেলিম; বদরগঞ্জ থানার এসআই জুলহাস; পীরগঞ্জ ভেণ্ডাবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির এসআই ওবাইদুর এবং মিঠাপুকুর থানার এসআই মনোয়ার, শফিকুল ইসলাম ও মিলন মিয়ার নাম। এদের মধ্যে কোতোয়ালি থানার চার উপপরিদর্শককেই বদলি করা হয়। তবে এসআই ওয়ালিয়ার রহমান এখনও ওই থানায় রয়েছেন।

জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানার ওসি বাবুল মিয়া বলেন, ওয়ালিয়ার রহমানের বদলি আদেশ বাতিল হওয়ায় তিনি এখনও দায়িত্ব পালন করছেন।

গাইবান্ধায় ১৩ পুলিশ সদস্য : এ তালিকায় রয়েছেন- জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এসআই আমিনুল ইসলাম, সদর থানার এসআই জামাল হোসেন, এসআই রউফ মিয়া ও কনস্টেবল মাসুদ হোসেন, ফুলছড়ি থানার এসআই আবু সালেহ ও গাড়িচালক কনস্টেবল স্বপন কুমার, সাদুল্যাপুর থানার উপপরিদর্শক রনি দাস, এএসআই আরিফ হোসেন, এএসআই মোসলেম উদ্দিন, পলাশবাড়ী থানার মাহবুব আলম, গোবিন্দগঞ্জ থানার কনস্টেবল মোখলেছুর ও মঞ্জুরুল এবং সাদুল্যাপুর থানার এসআই রেজাউল। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, পুলিশের এসব সদস্যের সরাসরি প্রশ্রয়ে বিভিন্ন স্পটে মাদক ব্যবসায়ীরা অবৈধ কারবার চালায়।

যেসব নেতা নেন মাসোয়ারা : প্রতিবেদন বলা হয়, সুন্দরগঞ্জের কাপাশিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা মমিনুল ইসলাম, একই এলাকার মঞ্জু মিয়া, পলাশবাড়ীর সরওয়ার বিপ্লব, ফিরোজ কবীর, মতিন ওরফে বস মতিন, গাইবান্ধা সদরের ওয়াহেদ মিয়া, আবদুর রাজ্জাক, পৌর এলাকার জসিম উদ্দিন বিহারী, হায়দার আলী, আবদুর রউফ, লিটন মিয়া, শহিদুল ইসলাম, রুবেল মিয়া, সরবত আলী, আনোয়ার হোসেন, হামিদ, কছিবর আলীসহ ৪৩ নেতা মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসোয়ারা নেন।

ওসিসহ পাঁচ কর্মকর্তার নজর মাদকের টাকায় :গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা থানার ওসির দায়িত্বে থাকার সময় রেজাউল করিম নিজেই মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোয়ারা নিতেন। এ থানার তৎকালীন পরিদর্শক আবদুর রাজ্জাক, তিনজন উপপরিদর্শক নূর আলম, জহুরুল হক ও মাহমদ আলমও এই অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন। তালিকায় নাম আসার পর ওসি রেজাউল করিম রেজাকে পঞ্চগড় কোর্ট ইন্সপেক্টর হিসেবে বদলি করা হয়। অন্য তিন উপপরিদর্শককেও বিভিন্ন এলাকায় বদলি করা হয়েছে। তবে এসআই নূর আলম এখনও এ থানাতেই কাজ করছেন।

ঢাকার প্রভাবশালীরাও অধরা: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ঢাকার প্রভাবশালী ৮২ মাদক ব্যবসায়ীর তালিকা তৈরি করে। এ তালিকাভুক্ত গডফাদার হিসেবে শীর্ষে থাকা মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পের ইসতিয়াক ওরফে কামরুল হাসান, নাদিম ওরফে পঁচিশ এখনও অধরা। এ ছাড়া এই তালিকাভুক্ত প্রভাবশালী পাইকারি মাদক ব্যবসায়ী ও গডফাদার উত্তরার ফজলুল করিম, বাড্ডার রিয়াদউল্লাহ, বংশালের নাছির উদ্দিন ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। এ তালিকায় আরও রয়েছে পাইকারি ইয়াবা ব্যবসায়ী ছাব্বির হোসেন ওরফে সোনা মিয়া, কামাল হোসেন, মোবারক হোসেন বাবু, আনোয়ারা বেগম ওরফে আনু, নারগিস ওরফে মামী ওরফে সকার বউ, দয়াগঞ্জের মাদক সম্রাজ্ঞী রহিমা বেগম, মুগদার পারভীন ও শফিকুল ইসলাম মলাই, ডেমরার রাজু আহম্মেদ, মুগদার আলম হোসেন, কমলাপুরের লিটন, ইসলামবাগের ওমর ফারুক, কামরাঙ্গীরচরের খুরশিদা ওরফে খুশি, মোহাম্মদপুরের শহীদুজ্জামান ওরফে নাভিদ, শাহবাগ এলাকার শামীম শিকদার, চানখাঁরপুলের পারভীন আক্তার, উত্তরার গোলাম সামদানী ফিরোজ, এনায়েতুল করিম ও শরীফ ভূঁইয়া আকিক, ভাটারার সাহিদা বেগম ইতি, কারওয়ান বাজারের মাহমুদা খাতুন, মিনা বেগম, বংশালের কাশেম, সেলিম ও সূত্রাপুরের হানিফ হোসেন উজ্জ্বল।

সূত্র: সমকাল