আমচাষি-ব্যবসায়ীদের চাপাকান্না : সর্বনিম্ন দরে বেচাকেনা

নিউজ ডেস্ক: আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও আম অধ্যুষিত জেলা রাজশাহীতে গত পাঁচ বছরের মধ্যে এবারই সর্বনিম্ন দরে আম বেচাকেনা হচ্ছে। আমের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় চাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। আগাম জাতের আম উৎপাদনে সম্পৃক্ত ৪০ ভাগ চাষিসহ সংশ্লিষ্টরা পুঁজি হারানোর আশঙ্কা করছেন। কানসাটে ল্যাংড়া জাতের আমের কেজি বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২২ টাকা। আমের শোচনীয় এই বাজারদরে অনেক চাষি চাপাকান্না করছেন।

একই অবস্থা রাজশাহী অঞ্চলে আমচাষিদের। আম চাষের ওপর নির্ভরশীল জেলার প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ।

প্রতিবছরই এ অঞ্চলে শতকোটি টাকার আমবাণিজ্য হয়। মৌসুমের আম বিক্রির আয় দিয়ে চলে অনেকের সারা বছরের সংসার খরচ। কিন্তু এবার চাষিদের কপালে জুটেছে শনি। একযুগের মধ্যে এবারই প্রথম আমের দাম তলানিতে। ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে গুটিজাতের প্রতিমণ আম। সে হিসাবে প্রতিকেজি আমের দাম পড়ছে সাড়ে ১২ টাকা। দাম না পাওয়ায় গাছেই পাকছে আম। ফলে এবার চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন এ অঞ্চলের হাজার হাজার আমচাষি।

অবশ্য ঢাকার ব্যবসায়ীরা চাষিদের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার বিষয়টি মানতে রাজি নন। ঢাকা মহানগর ফল আমদানি-রপ্তানিকারক ও আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি হারুনর রশিদ বলেন, কৃষকরা দাম পাচ্ছে না এমনটা ঠিক নয়। ঈদের কারণে কয়েকদিন কুরিয়ার সার্ভিস বন্ধ থাকায় আমের চাহিদা কমে যায়। এছাড়া ঈদের কারণে রাজধানীতে ক্রেতার সংখ্যা কম বিধায় ব্যবসায়ীরাও আম আনছে কম। যার কারণে উৎপাদনপর্যায়ে বিক্রি কম হচ্ছে। অচিরেই আমের দামের এই অবস্থা স্বাভাবিক হবে বলে জানান তিনি।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে বর্তমানে ল্যাংড়া ও হিমসাগর জাতের আমের কেজি ৫৫ থেকে ৬০ টাকা ৬০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। কলাবাগান ও ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন স্থানে আমের মেলা চলেছে। সেসব মেলায় প্রতিকেজি ল্যাংড়া আম ৮০ টাকা ও প্রতিকেজি হিমসাগর ৭০ টাকা বিক্রি হচ্ছে।
এবার আমের আর দরপতনের কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. মঞ্জুরুল হুদা জেলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে জানান, প্রতিবছর আগাম, মাঝামাঝি এবং নামলা মুকুল এসে থাকলেও এ বছর তীব্র শীতের কারণে বিলম্ব এবং একসঙ্গে মুকুল আসায় আমও একসঙ্গে পেকে বাজারে এসেছে। সঙ্গে প্রচ- গরমের কারণে গাছে আম রাখা দায় হয়ে পড়েছে। বাগানমালিকরা দ্রুত আম বাজারে নামাচ্ছেন। এতে বাজারে চাহিদার চেয়ে আমের সরবরাহ বেশি, কিন্তু ক্রেতা কম থাকায় ক্ষিরসাপাত (হিমসাগর) ১৪০০-১৬০০ টাকা মণ এবং ল্যাংড়া ১২০০-১৪০০ টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া রমজান ও ঈদে ঘরমুখো মানুষ আম কম খাওয়ার কারণে বাজারও নিম্নমুখী।
তবে এ কর্মকর্তা আশাবাদী, গুটিজাতের আম শেষ হয়ে গেলে জেলার চাষিরা নাবি জাতের ফজলি, সুরমা ফজলি ও আশ্বিনা জাতের আম বিক্রি করে লোকসান পুষিয়ে নিতে পারবেন।

গত কয়েক বছর ধরে ধানের প্রকৃত মূল্য না পাওয়া, ধান কাটার সময় শ্রমিক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে বিপুলপরিমাণ ধানি জমি আমবাগানে রূপান্তরিত হয়েছে। আর আম চাষে কম খরচ ও প্রতিবছরই আমের মূল্যে বৃদ্ধি কারণে নতুন নতুন বাগান সৃজনে এলাকার কৃষকরা ঝুঁকে পড়েছেন।

কানসাটের বাগানমালিক নুরুল ইসলাম জানান, এবার আমের বাজারদর সর্বনিম্ন হওয়ায় চাষিদের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। তারা কখন আমের ন্যায্য বাজারদর পাবেÑ এ প্রশ্ন তুলছেন। আগাম জাতের ক্ষিরসাপাত, বোম্বাই ক্ষিরসাপাত, ল্যাংড়া, লক্ষণভোগ তো শেষের পথে।
ভোলাহাট আম ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক চুটু জানান, ভোলাহাট উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা নাজুকের কারণে মূলত চাষিরা আমের ন্যায্যমূল্য পান না দীর্ঘদিন ধরে। আর এবার বাজারদরে ধস নামায় সর্বস্বান্তের পথে চাষিরা।

মল্লিকপুরের আমচাষি জানান, পাকা আমের দাম না পাওয়ায় তারা এসব আম ‘আমসত্ত্ব’ করে শুকিয়ে পরবর্তী সময়ে অসময়ে বেশি দামে বিক্রির জন্য মজুদ করছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ আম ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসলাম আলী জানান, গত বছর এ সময়ে প্রতিদিন তহাবাজারের আম বাজারে ৩-৪ কোটি টাকার আম কেনাবেচা হয়েছিল। এবার এ সময় মাত্র ৫০-৮০ লাখ টাকা বেচাকেনা হচ্ছে।

রহনপুরের আম ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলাম জানান, মৌসুমের শুরুতে গাছে ১৬০০ টাকা মণ দরে ক্ষিরসাপাত আম কিনে বাজারে ১৪০০-১৬০০ টাকা মণ বিক্রি করায় মণপ্রতি ৪০০-৫০০ টাকা লোকসান হচ্ছে। এতে অনেকের পুঁজি হারানোর উপক্রম।

কানসাট আম আড়তদার সমিতির সভাপতি হাবিুবুল্লাহ জানান, প্রতিকেজি আম উৎপাদনে ৭-৮ টাকা খরচ হয়, আর বাজারে ক্ষিরসাপাত ও ল্যাংড়া আম পাইকারি বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০-২২ টাকা কেজি দরে। আর আমের বাজারদর পতনের সুযোগ নিয়েছে দেশের বহুজাতিক কোম্পানি প্রাণ ও আকিজ গ্রুপ। আগাম জাতের গুটি আম ২৫০-৩০০ টাকা মণ দরে কিনছে।

কানসাট আম আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক জানান, প্রতিবছরই বাগানের দাম বাড়ছে। বেশি দামে আমবাগান ক্রয় করে এবার বাজারে দর নেই। এতে আমচাষি, ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টরা ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন। জেলার বৃহত্তম আম বাজার কানসাটে এখনো তেমন ব্যাপারী আসেননি। গত কয়েক বছরের মধ্যে এবারের মতো এত কমমূল্যে আম আর বেচাকেনা হয়নি। আমচাষিসহ সংশ্লিষ্টরা এই ক’দিনে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। তিনি প্রকৃত আমচাষিদের জন্য সরকারি ভর্তুকির দাবি করেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবদুল ওয়াহেদ বলেন, এ জেলায় ৩-৪ মাস আম বেচাকেনার কারণে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। ব্যবসার কারণে প্রতিবছর আমসংশ্লিষ্টসহ পরিবহন, হোটেল, ব্যাংক, কুরিয়ার সার্ভিস, বিকাশ এজেন্ট, বাগান পাহারাদার, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা আয় করে কিছু উদ্বৃত্ত জমা রাখেন। কিন্তু এবার প্রায় সবাই কমবেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। এই আকস্মিক ক্ষতি পোষাতে তিনিও সরকারি ভর্তুকিসহ বীমা প্রথা চালুর দাবি করেন।

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার চাষি ইউনুছ আহম্মেদ বলেন, এবার আমের উৎপাদন সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া বিরূপ আবহাওয়ার কারণে বাগানের অধিকাংশ গাছের আমেই দাগ দেখা দিয়েছে। তা ছাড়া আমের ভরা মৌসুমে রমজান মাস। ফলে বিক্রির মতো ক্রেতা পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে আমের দাম স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে কম।

দুর্গাপুর উপজেলার আমচাষি মাহবুর রহমান বলেন, ‘গত মৌসুমে গাছ থেকেই হিমসাগর ১৬০০-১৮০০ টাকা মণ, ল্যাংড়া এবং ক্ষিরসাপাত ১৬০০-১৮০০ টাকা মণ বিক্রি হয়েছে। কিন্তু এবার দাম অর্ধেকের কম। তার পরও ক্রেতা নেই। চাষের খরচই উঠবে না এবার।
রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে এ বছরের আম ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, গত ২০ মে থেকে শুরু হয় আম পাড়ার কর্মযজ্ঞ। ওই দিন থেকে গুটি ও গোপালভোগ জাতের আম বাজারে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু এবার বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে পাকেনি গুটি ও গোপাল ভোগ। ১ জুন থেকে হিমসাগর, ক্ষিরসাপাত ও লক্ষণভোগ এবং ৬ জুন থেকে ল্যাংড়া আম বাজারে ওঠার কথা ছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০ মে থেকে ১০ জুন আম পাকার জন্য যে তাপমাত্রার প্রয়োজন তা ছিল না। ফলে কমসংখ্যক চাষিই ওই সময়ে গাছ থেকে আম নামাতে পেরেছেন। আবার ১০ জুনের পর থেকে তাপমাত্রা বেড়ে যায়। সপ্তাহজুড়ে তাপমাত্রার পারদ ওঠানামা করে ৩৫-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ভ্যাপসা গরমে একসঙ্গে পেকে যায় সব জাতের আম। আর রোজা থাকায় আমের বিক্রি কমে যায়। মৌসুমের শেষ আশ্বিনা জাতের আম ছাড়া প্রায় সব জাতেরই আম চলে এসেছে বাজারে। আগামী ১ জুলাই বাজারে উঠবে আশ্বিনা।

রাজশাহী জেলার সবচেয়ে বড় আমের মোকাম পুঠিয়ার বানেশ্বর হাট। এ অঞ্চলে গোপালভোগ আম প্রায় শেষপর্যায়ে। অত্যন্ত সুমিষ্ট জাতের এ আম বানেশ্বর হাটে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা মণ, হিমসাগর এক হাজার থেকে ১১০০ টাকা মণ এবং ল্যাংড়া ১১০০-১২০০ টাকা মণ এবং ক্ষিরসাপাত ১২০০-১৩০০ টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে। আর বিভিন্ন জাতের গুটি আমের দাম মণপ্রতি মাত্র ৫০০ টাকা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে আম উৎপাদন হচ্ছে প্রায় এক লাখ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাষ হচ্ছে বৃহত্তর রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। গত সাত বছরে এ অঞ্চলে আমের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। গত বছর এ অঞ্চলের ১৭ হাজার ৪২০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। সেখানে উৎপাদন হয়েছে এক লাখ ৮১ হাজার ১০৭ টন। এর আগে ২০১৬ সালে রাজশাহীতে ১৬ হাজার ৫৮৩ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়। দেশের গ-ি পেরিয়ে রাজশাহীর আম যাচ্ছে বিশ্ববাজারে।