বিএমএ-স্বাচিপ নেতাদের দ্বন্দ্বে সমস্যায় স্বাস্থ্য খাত

নিউজ ডেস্ক: চিকিৎসকদের পদোন্নতি, পদায়ন ও বদলি নিয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থান নেন তারা- এক পক্ষ কোনো চিকিৎসকের পদোন্নতির তদবির করলে অপর পক্ষ বাদ সাধে তাতে; স্বাস্থ্য খাতের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে এক পক্ষ কাউকে সমর্থন করে তো অন্য পক্ষ বেঁকে বসে। তাদের এ দ্বন্দ্বের জের ধরে কোনো কোনো হাসপাতালে পাল্টাপাল্টি কমিটি গঠন হয়েছে, এক পক্ষ কোনো অনুষ্ঠান বা কর্মসূচি দিলে অন্য পক্ষ অংশ নিচ্ছে না তাতে। সর্বশেষ ইফতার মাহফিল নিয়েও ঘটেছে এমন ঘটনা।

কয়েক বছর ধরে এমন অবস্থা চলছে চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ও আওয়ামী লীগপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) শীর্ষ নেতাদের মধ্যে। তাদের মধ্যে কথোপকথন তো বটেই, মুখ দেখাদেখিও হয় না তেমন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ দ্বন্দ্বে এক পক্ষে বিএমএ সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ও মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল এবং অপর পক্ষে স্বাচিপ সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলান ও মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ অবস্থান করছেন। প্রতিটি হাসপাতালে তাদের অনুসারীদের দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠেছে। কয়েকটি হাসপাতালে দু’পক্ষই মারমুখী অবস্থানে রয়েছে।

বিএমএ ও স্বাচিপের কেন্দ্রীয় কমিটিতে রয়েছেন এমন অন্তত ১০ চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএমএ ও স্বাচিপের সর্বশেষ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে এ দুই সংগঠনের নেতাদের দ্বন্দ্ব উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। ২০১৫ সালে স্বাচিপের সম্মেলনে ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ও ডা. ইকবাল আর্সলান- দু’জনেই সভাপতি প্রার্থী ছিলেন। সম্মেলনের দিন উভয়ের সমর্থকরা একপর্যায়ে মারমুখী অবস্থান নেয়। পরে সিনিয়র চিকিৎসকদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। এ সম্মেলনে ডা. ইকবাল আর্সলান সভাপতি ও ডা. এম এ আজিজ মহাসচিব নির্বাচিত হন। তা ছাড়া সম্মেলনে গঠিত কমিটির প্রায় ৯৯ ভাগ পদও তাদের সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণে আসে। ফলে ডা. জালালের সমর্থকরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। পরের বছর বিএমএ সম্মেলনের প্রার্থিতা নিয়ে বিবদমান দু’পক্ষ আবারও দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। ডা. আর্সলান বিএমএর আগের কমিটির মহাসচিব ছিলেন। মূলত তার সমর্থকরাই বিএমএর কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতৃত্বে ছিল। কিন্তু সর্বশেষ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা সভাপতি পদে ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ও মহাসচিব পদে ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরীকে মনোনয়ন দেন। বিএনপি সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাব এ নির্বাচন বর্জন করে। ডা. জালাল-দুলাল প্যানেল বামপন্থি চিকিৎসকদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এ নির্বাচনে বিজয়ী হয়। তারা নেতৃত্বে আসার পর ডা. আর্সলান ও তার সমর্থকদের প্রভাব বিএমএতে খর্ব হতে থাকে। বিএমএ কমিটির সিংহভাগ পদই ডা. জালালপন্থিরা বাগিয়ে নেয়।

এভাবে বিএমএ ও স্বাচিপের সম্মেলন, কমিটি গঠন ও পরবর্তী কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে দুই সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্ব প্রকাশ্যে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। সর্বশেষ গত বছরের শেষ দিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি (ডিপিসি) যে প্রমোশন দেয়, তাতে দেখা যায়, সিংহভাগ পদোন্নতিই পেয়েছেন ডা. জালাল-ডা. দুলাল সমর্থকরা। বঞ্চিত হয়েছেন ডা. আর্সলান-ডা. আজিজের সমর্থকরা।

চিকিৎসকদের মধ্যে পদোন্নতির এ ঘটনা ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এর পরপরই ডা. আর্সলান ও ডা. আজিজ স্বাচিপের বিভিন্ন শাখা কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ায় হাত দেন। রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, খুলনা ও রংপুর জেলা শাখা স্বাচিপের পাল্টাপাল্টি কমিটি গঠন করে নেতারা প্রকাশ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) ও হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিকস হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর), স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল, জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা শিশু হাসপাতালসহ সারাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতেও দু’পক্ষের দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠেছে। এদিকে, কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন দেওয়া শাখা কমিটি স্থানীয় নেতারা মানতে চাইছেন না। তারা পাল্টা কমিটি গঠন করেছেন।

স্বাচিপের কয়েকজন চিকিৎসক বলেন, বিএমএ সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের ইন্ধনেই এসব পাল্টা কমিটি দেওয়া হয়েছে। তবে বিএমএ কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, দলের দুর্দিনে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন- এমন ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে ড্যাব-জামায়াতপন্থিদের দিয়ে স্বাচিপের শাখা কমিটি গঠন করায় চিকিৎসকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তারা বা তাদের সমর্থকরাই পাল্টা কমিটি গঠন করেছেন।

এদিকে, চিকিৎসক পদায়নেও বিএমএ-স্বাচিপ নেতারা পরস্পরের বিরোধিতা করছেন। রংপুর মেডিকেল কলেজে অধ্যক্ষ পদে ডা. আর্সলান একজন চিকিৎসককে সমর্থন করেন। ডা. জালাল অপর একজনকে সমর্থন করেন। এ নিয়ে দু’পক্ষ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। ডা. জালাল সমর্থিত চিকিৎসক এই অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পান। আবার জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক পদে নিয়োগ পেয়েছেন ডা. আর্সলানের সমর্থিত চিকিৎসক। এর আগে প্রতিষ্ঠানে ড্যাব সমর্থিত এক চিকিৎসককে পরিচালক পদে পদায়নের অভিযোগ তুলে চিকিৎসকরা আন্দোলনে নামেন। ডা. আর্সলান এ সময় আন্দোলনকারীদের বিপক্ষে অবস্থান নেন। পরে ওই পরিচালককে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পাশাপাশি যেসব চিকিৎসক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাদেরও বদলি করা হয়, যারা মূলত ডা. জালালের সমর্থক। এই প্রতিষ্ঠানেও পরে ডা. আর্সলান সমর্থিত এক চিকিৎসককে পরিচালক করা হয়।

এসবের ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি বিএমএ ও স্বাচিপ পরস্পরের ইফতার মাহফিল বর্জন করেছে, যা নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা চলছে চিকিৎসকদের মধ্যে।

যা বললেন নেতারা :বিএমএ ও স্বাচিপের শীর্ষ নেতারাও স্বীকার করছেন, তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-বিরোধ রয়েছে। স্বাচিপ সভাপতি ডা. ইকবাল আর্সলান সমকালকে বলেন, তিনি স্বাচিপের সভাপতি। অথচ তাকে সাধারণ চিকিৎসকের মতো করে দাওয়াতপত্র পাঠানো হয়েছে। ইফতার মাহফিলে অতিথিদের যে তালিকা করা হয়েছে, তাতে স্বাচিপের সভাপতি ও মহাসচিব কাউকে রাখা হয়নি। তাই তারা বিএমএর ইফতারে অংশ নেননি।

স্বাচিপের ইফতারে বিএমএর শীর্ষ নেতারা অনুপস্থিত ছিলেন জানিয়ে ডা. আর্সলানকে প্রশ্ন করা হয়, তাদের দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল কি-না। উত্তরে তিনি বলেন, দাওয়াত দেওয়ার বিষয়টি মহাসচিবের দায়িত্ব। তবে তাদের নিশ্চয়ই দাওয়াত করা হয়েছে।

অভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী হওয়ার পরও বিএমএ ও স্বাচিপের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ডা. আর্সলান বলেন, মূলত স্বাচিপের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে একটি গ্রুপ তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এটি আদর্শিক কিংবা বৈষয়িকও নয়। ব্যক্তিগত ইগো থেকে তারা বিরোধিতা করছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে স্বাচিপের সভাপতি করেছেন। তার নির্দেশনা অনুযায়ীই স্বাচিপের কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেখানে স্থান না পেয়ে অনেকে ভুল বুঝে তার বিরোধিতায় নেমেছেন।

পাল্টাপাল্টি কমিটির বিষয়ে স্বাচিপ সভাপতি বলেন, শাখা কমিটি গঠন করার এখতিয়ার স্বাচিপের কেন্দ্রীয় কমিটির। কয়েকটি শাখায় স্বাচিপ কেন্দ্রীয় কমিটির বাইরে যে পাল্টা কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেই কমিটির কোনো ভিত্তি নেই।

এ প্রসঙ্গে বিএমএর মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল সমকালকে বলেন, তিনি স্বাচিপের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি। অথচ স্বাচিপের ইফতার মাহফিল সম্পর্কে তাকে জানানোই হয়নি। এমনকি বিএমএর মহাসচিব হিসেবেও তাকে দাওয়াত দেওয়া হয়নি। কিন্তু বিএমএর ইফতার মাহফিলে ব্যক্তিগতভাবে তিনি স্বাচিপ সভাপতিকে ফোন করে দাওয়াত দিয়েছেন। আর বিএমএ সভাপতি স্বাচিপ মহাসচিবকে দাওয়াত দিয়েছেন। কিন্তু তারা আসেননি।

ইকবাল আর্সলানের অভিযোগ সম্পর্কে ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, ডা. আর্সলান বিএমএর কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। দাওয়াত কার্ডে তার নাম দেওয়া হলে অন্য সদস্যরাও একই দাবি তুলবেন। তাই তার নাম দেওয়া হয়নি।

পদোন্নতি, বদলি ও পদায়ন প্রসঙ্গে বিএমএ মহাসচিব বলেন, যোগ্য, দক্ষ, ত্যাগী ও বঞ্চিত চিকিৎসকরা পদোন্নতি পাবেন, ভালো জায়গায় পদায়ন পাবেন- বিএমএ এমনই প্রত্যাশা করে। কিন্তু সুবিধাবাদী ও অযোগ্য কাউকে পদোন্নতির তদবিরে বিএমএ সব সময় বিরোধিতা করে আসছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।

বিভিন্ন শাখায় স্বাচিপের পাল্টাপাল্টি কমিটি প্রসঙ্গে ডা. ইহতেশামুল বলেন, ডা. আর্সলান ও ডা. আজিজের মতামত নিয়েই তার জেলা সিলেটে বিএমএ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। শীর্ষ দুটি পদ তাদের সমর্থকদের দেওয়া হয়। কিন্তু স্বাচিপের কমিটি করার সময় তারা আমার মতামত নেয়নি। দুর্দিনে যারা স্বাচিপকে টিকিয়ে রেখেছে, তেমন ত্যাগী নেতাদের বঞ্চিত করে সুবিধাভোগীদের নিয়ে কমিটি করা হয়েছে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী শাখা কমিটি গঠন করার আগে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদের মতামত নেওয়ার শর্ত আছে। কিন্তু সভাপতি ও মহাসচিব ঢাকা থেকে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অ্যাডহক ও আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে চলেছেন। ওই সব কমিটিতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এমন অনেককেও পদ দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে স্থানীয় ত্যাগী নেতারা বিদ্রোহ করছেন।

তবে স্বাচিপ মহাসচিব ডা. এম এ আজিজ সমকালকে বলেন, স্বাচিপের যেদিন ইফতার মাহফিল ছিল, বিএমএর নেতারা সেদিন অন্য একটি অনুষ্ঠানে ব্যস্ত থাকায় যোগ দিতে পারেননি। তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। আবার বিএমএর ইফতার মাহফিলের দিনে স্বাচিপ নেতাদের অন্য একটি কর্মসূচি ছিল। তাই তিনি বা তারা সেখানে অংশ নিতে পারেননি।

বিএমএ সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ওমরাহ হজ পালনে বর্তমানে সৌদি আরবে রয়েছেন। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় টেলিফোনে তিনি সমকালকে বলেন, স্বাচিপ তার হাতে গড়া সংগঠন। তিনি স্বাচিপের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ছিলেন। অথচ সেই সংগঠনের ইফতার মাহফিলে তাকে অতিথি করা দূরের কথা, দাওয়াতও দেওয়া হয়নি।

বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথোপকথনে ডা. জালাল আরও বলেন, দুর্দিনে তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে যারা স্বাচিপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তারা কেউ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় রাজনীতি করেননি। তাদের তিনিই স্বাচিপে এনেছিলেন জানিয়ে ডা. জালাল বলেন, তারা এখন যেসব কর্মকাণ্ড করছেন, তাতে বিএনপি-জামায়াতপন্থিরা সুবিধা পাচ্ছে। বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে ছাত্রলীগের ত্যাগী ও বঞ্চিত নেতাদের বাদ দিয়ে স্বাচিপের শাখা কমিটি গঠন করা হচ্ছে। এমনকি এসব কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সংগঠনের গঠনতন্ত্রও মানা হচ্ছে না। এতে বিএমএ ও সরকারের ভাবমূর্তিও নষ্ট হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে চিকিৎসকরা বিভিন্ন শাখায় বিদ্রোহ করছেন।

সূত্র: সমকাল