সমুখে দাঁড়িয়ে জননী সাহসিকা কবি সুফিয়া কামাল

রাখী দাশ পুরকায়স্থ: এই দেশ এই সমাজ আজও অনুভব করে একজন কবি সত্তার মানুষ, স্বভাব-মাধুর্য আর মনের সুকুমারবৃত্তিকে এক সুতোয় গেঁথে কীভাবে সমাজের বিবেক হয়ে উঠেছিলেন তার যাপিত জীবনে। ন্যায় প্রতিষ্ঠার এক অবিস্মরণীয় সংগ্রামী মুখ হয়ে সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে স্থায়ী আসনে অধিষ্ঠিত হতে পেরেছিলেন; তিনি আর কেউ নন; সর্বজনশ্রদ্ধেয়া কবি সুফিয়া কামাল। তিনি এই বর্তমান বাংলাদেশ নামের ভূখণ্ডের মানুষের দীর্ঘ বিপদসংকুল জীবনে ইতিহাস গড়ায় দৃঢ় গৌরবময় ভূমিকা পালন করে পরিণত হয়েছেন জাতীয় ব্যক্তিত্বে। মহিলা পরিষদের সদস্য, কর্মী-সংগঠকদের তাকে নিয়ে ব্যক্তিগত স্মৃতির ভাণ্ডার এতই সমৃদ্ধ ও হৃদয়গ্রাহী যে তার প্রয়াণের ১৮ বছর গত হলেও এখনও জীবন্ত এসে ধরা দেয় চোখের সামনে।

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন যখন বলেন, বাংলাদেশে যে প্রভূত উন্নয়ন হয়েছে, তার বড় কারণ হচ্ছে নারীর অংশগ্রহণ। শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের ভাষ্য তার সঙ্গে যুক্ত হয় এভাবে- আজ এদেশের নারী যেখানে এসে পৌঁছেছে, ৫০ বছর আগে তা অভাবনীয় ছিল। সামাজিক অগ্রগতির এই উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তনের মাঝে আছে ভয়াবহ নৃশংসতার চিত্র। পত্রিকার পাতা ও টিভি চ্যানেল, ফেসবুকে ভয়াবহ মাত্রা ও ধরনের নারী ও কন্যা নির্যাতনের সংবাদ আমাদের শঙ্কিত করে তুলছে। ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা; ক্ষোভ, অপমান আর অসহায়তায় নির্যাতনের শিকারের আত্মহত্যা, বিচার চাইতে গিয়ে ভয়-ভীতি আর হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে পরিবারের পালিয়ে বেড়ানোর ঘটনা আজ নিত্য সংবাদের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধর্ষণ ছাড়াও এসিড নিক্ষেপে ক্ষত-বিক্ষতদের অধিকাংশই নারী। পরিবারের জন্য খানিকটা সচ্ছলতার আশায় বিদেশে বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশে অভিবাসী নারীর জন্য অপেক্ষা করে যে নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন আর সহায়-সম্বল হারানোর বেদনা; তাদের অনেককেই আশ্রয় নিতে হয় সেসব দেশের সেফ হোমে (নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্র)। অনেক দিন পার করে যখন দেশে আসতে সক্ষম হয় তখন শূন্য হাত, যা প্রকারান্তরে পরিবারের বোঝা। শুধু তাই নয়; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধর্ষণ-যৌন নিপীড়ন যে বাড়ি বাড়ি সর্বগ্রাসী রূপ নিতে শুরু করেছে সন্তর্পণে; তাকে রুধিবে কে?

নিরাপদ চলাফেরার ক্ষেত্রে নারী ও কন্যাদের যে স্বস্তির স্থল ছিল গণপরিবহন, অর্থাৎ বাস সার্ভিসের পরিবেশও আজ নারীর জন্য প্রচণ্ড অনিরাপদ। লঞ্চ সার্ভিসে তো আছেই। নির্যাতনকারী কেউ যাত্রী, কেউ বা বাসচালক-কন্ডাক্টর। সবাই যেন অধিকার পেয়ে গেছে শিক্ষিত-নিরক্ষর যে কোনো নারী ও কন্যাকে নির্যাতনের। এ কথা কোনোভাবেই বলা যাবে না- আমাদের এই স্বাধীন বাংলাদেশে নারী ও কন্যা নির্যাতনের তালিকা অসহনীয়ভাবে দীর্ঘ নয়। বরং বলতে হলে তার উল্টোটি বলতে হবে। অন্তত নারীর অধিকার, মানবাধিকার ও নারী নির্যাতন-মানবাধিকারের লঙ্ঘন সার্বজনীন এই ঘোষণাকে যারা সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে সচেষ্ট, তাদের হাতে রাখা পরিসংখ্যান এ বিষয়টিই তুলে ধরে। অথচ নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে কথা বলতে গেলে প্রায়ই অনেকের মুখে শোনা যায়- নারী নির্যাতন নতুন কিছু নয়। চিরদিনই ছিল, এখনও আছে। কিন্তু তারা শুধু মুখে উচ্চারণ করেন না- নারী নির্যাতন চিরকালের জন্য থাকবে। তারা বলেন, গণমাধ্যমে প্রচারের কারণে, বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির দৌলতে নারী নির্যাতনের খবর একটু বেশিই প্রকাশ পাচ্ছে।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলেছিলেন- ‘যা ঘটছে, তার ভয়াবহতা নিয়ে আমরা যথেষ্ট পরিমাণে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত কি-না? কারণ আমাদের সমাজে নারী নির্যাতন এক কঠোর বাস্তবতা।’ জননী সাহসিকা কবি সুফিয়া কামাল ভাবতেন, এর প্রতিকার করতে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়োজন; নারীদের সংগঠিত করাও প্রয়োজন। তার চেতনায় যে বিষয়টি দৃঢ়ভাবে প্রোথিত ছিল তা হচ্ছে নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তি পেতে হলে নারীদের বিশেষভাবে সাহসী হতে হবে। তিনি বলতেন, মেয়েদের স্বাধীনতা কেউ দিয়ে দেবে না; আদায় করে নিতে হবে। পুরুষ শাসিত সমাজে শতাব্দীকাল ধরে মেয়েদের যে বেড়ি পরিয়ে রাখা হয়েছে, তা ভাংতে হলে সচেতন লড়াই দরকার। এই লড়াইয়ে শুধু নারী নয়; সমাজের বিবেকবান, সচেতন পুরুষদের তিনি সংগঠিত প্রতিরোধে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন সেই ৯০-এর দশকে। নারী নির্যাতন যে সামাজিক অনাচারের এক অবশ্যম্ভাবী বহিঃপ্রকাশ, তা চিহ্নিত করে রাজধানী থেকে জেলা- সব পর্যায়ে নারী নির্যাতন ও সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ কমিটি গঠন করে সমাজের মানুষের বিবেককে জাগানোর আহ্বান জানিয়ে সশরীরে নেমে গিয়েছিলেন সংগ্রামের ময়দানে। সে সময় তার সেই দৃঢ়দীপ্ত তেজি আহ্বান ছিল ক্রমাগত ঘটে চলা নারী নির্যাতন আসলে দেশ ও সমাজের জন্য কী বয়ে আনছে? যে ভয়াবহ মাত্রা ও ধরনের নির্যাতন সংঘটিত হয়ে চলছে, তার দায় কার? রাষ্ট্র কি এসব নির্যাতনের জন্য দায়ী? আমরা মনে করি, রাষ্ট্র তা প্রকাশ্যে সমর্থনও করেনি? তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায় :পুলিশ কেন অপরাধকারীদের ধরতে পারে না অধিকাংশ ক্ষেত্রে? তার জবাববিহি তো রাষ্ট্রকেই করতে হবে।

পুলিশের কথিত নিষ্ফ্ক্রিয়তা অপরাধীদের অপরাধ করার পক্ষে একটি বাতাবরণ তৈরি করছে, যা ক্রমশ সমাজকে বর্বরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সেই সময়ে আরও বলা হয়েছিল, ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও হত্যার বিষয়টি সংখ্যালঘু, আদিবাসী, প্রতিবন্ধী নারী ও পুরুষের প্রতি নির্যাতন একসঙ্গে যুক্ত হয়ে সামাজিক পরিস্থিতিতে নতুন নতুন নেতিবাচক ঘটনার সূত্রপাত করে চলেছে, যা নারী নির্যাতনকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। সময়ের বাস্তবতা হচ্ছে, এসব ধর্ষক, সন্ত্রাসীর অধিকাংশই রাজনৈতিক দল অথবা প্রভাবশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে নির্ভয়ে থাকে। আর তাই নারী নির্যাতনের প্রশ্নটি সমাজে ক্ষমতার বিন্যাস ও কর্মপদ্ধতি থেকে পৃথক করা যাচ্ছে না। কবি সুফিয়া কামালের আহ্বানে কিছুটা হলেও সচেতনতা সৃষ্টিতে উদ্যোগী হয়ে প্রগতিবাদী বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, সমাজ-সংস্কৃতিকর্মী সে সময় যুক্ত হয়ে ভূমিকা রেখেছিলেন। সরদার জয়েন উদ্দিন, কবি শামসুর রাহমান, নাজিমুদ্দিন মোস্তান, মফিদুল হক, আশরাফুর রহমান, আখতার হোসেন, কবির আহমেদসহ অনেকেই সমগ্র ধানমণ্ডি, কলাবাগান এলাকায় প্রকাশ্যে ভূমিকা রেখেছিলেন। একইভাবে ঢাকা শহরের অন্যান্য স্থানে সমভাবে এলাকায় বসবাসকারী সমাজের পরিচিত বিশিষ্টজন ও সচেতন, বিবেকবান পুরুষ নিজ নিজ ভূমিকা পালনে কুণ্ঠিত হননি। সামাজিক বিভিন্ন অনাচারের সঙ্গে নারী নির্যাতনকে যুক্ত করে সামাজিক জীবনে যে ভয়াবহ ক্ষতি আমাদের হয়ে চলেছে, তার ধারাবাহিকতা আজও প্রবলভাবে ও ব্যাপক হারে দৃশ্যমান।

বয়সে প্রবীণ কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণে সময়ের সঙ্গে থাকা জননী সাহসিকা যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন, আজ আমাদের জন্য তা অনুধাবন করা প্রয়োজন। অধ্যাপক আলী আনোয়ার আমাদের সামনে এনেছেন এই বলে :এই সমাজ আর মানবিক নেই। রাষ্ট্র ক্রমে ক্রমে মহাপরাক্রমশালী ও সর্বভুক হয়ে উঠেছে। এর প্রবণতা ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের দিকে। অন্যদিকে আধুনিক প্রযুক্তির সহজে বহনযোগ্য মারণাস্ত্র, পরিবহন ব্যবস্থা এবং মোবাইল ফোন বিষয়ে সব সময়েই ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ও তার পোষ্য চর-অনুচরের জন্য সহায়ক হয়েছে। যারা ক্ষমতা পরিচালনা করছেন তাদের বাহু অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এবং অনানুষ্ঠানিক পার্টি ক্যাডার যাদের মন-মানসিক জগৎ হচ্ছে হাতের অস্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক। ক্ষমতা যতই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে ততই তা মদমত্ত হয়ে উঠছে। গোটা সমাজকে প্রভু এবং ভৃত্য, অধীশ্বর এবং অধীন, শাসক ও শাসিত- এই দ্বিমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রবণতা সর্বস্তরে ব্যাপ্ত হচ্ছে। একে পিতৃতান্ত্রিক পৌরুষের পরাকাষ্ঠা বলে ভাবছে কেবল সন্ত্রাসী মাস্তানরাই নয়; বিভিন্নভাবে ক্ষমতার বলয়ে থাকা মানুষ গোপনে বা প্রকাশ্যে এ ক্ষেত্রে আনুগত্য প্রকাশ করে থাকেন, যার প্রকাশ আমরা শুনি ও দেখি। পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধ যে সমাজে নর-নারীর মানবিক সম্পর্ককে বিষিয়ে দেয়, দিচ্ছে- তা আজ একেবারে স্পষ্ট।’

জননী সাহসিকা বলেছেন, আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এ দেশের নারী সমাজ রাষ্ট্রের কাছ থেকে নারীর স্বার্থসংশ্নিষ্ট যেসব আইন প্রণয়ন ও তার প্রয়োগের নিশ্চয়তা আদায় করেছে, সেখানেও প্রয়োগের পথে প্রতিবন্ধকতা আছে। সে জন্যই মানুষের সমাজের বিবেককে জাগাতে হবে। সমাজ ও মানুষের বিবেক জাগলে অপরাধের মাত্রা কমবে আর প্রতিরোধের মাত্রা বাড়বে। সমাজে সুস্থ সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনার পথ প্রশস্ত হবে।

তিনি বলে গেছেন,’আমরা আগাছা কেটে কেটে পথ করেছি; তোমরা এবার এগোও। ফণিমনসা ও কচুরিপানা দ্রুত বাড়ে। আগাছা আবার গজায়। এবার তোমাদের পালা। তোমাদের দায়িত্ব পরিস্কার করার। ত্যাগ করতে শেখো।’

তার হাতে গড়া বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ তার শুভ জন্মদিন ২০ জুনকে সংগ্রামের পাঠ হিসেবে গ্রহণ করে। তারা আজ স্মরণ করে তার সেই দৃঢ় উচ্চারণ :’অরণ্য কন্যারা জাগে, জাগিয়েছে বিষাক্ত নাগিনী ফুঁসিতেছে রুদ্র রোষে।/ ঝলকিছে ঈশানে অশনি,/ ধরণীর ধনলোভী বিভ্রান্ত বিকৃতমনা জন,/ পায়ে দলি-মনুষ্যত্ব আত্মারে সে করিছে হনন/ একদা অরণ্য কন্যা জাগিয়া জ্বালিবে দাবানল,/ দলিতা নাগিনী তার নিঃশ্বাসে ছড়ায়ে হলাহল/ যতদিন দীর্ঘ হোক, একদিন হবে অবসান,/ রুদ্ধ করে মূঢ়তার, আত্ম সম্ভাবতা জয়গান।/ অনাচার স্বেচ্ছাচার নরনারী নির্যাতন যত, সেই অপরোধ ভার দপিতেরে করিবেই নত।’

আজ জননী, তোমার জন্মদিনে আমাদের

সবার শ্রদ্ধার্ঘ্য।