মানবিক রাষ্ট্রের উদাহরণ বাংলাদেশ

অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন: আন্তর্জাতিকভাবেই শরণার্থী সমস্যা দিন দিন বাড়ছে। পরিসংখ্যানেই এটি প্রতীয়মান। শরণার্থী, বাস্তুচ্যুত বা অভিবাসী যাদের কথাই বলি না কেন, দেশে দেশে তাদের ওপর রাষ্ট্রের আচরণ কোথাও কোথাও খুবই নিন্দনীয়।

আমাদের দেশে আশ্রয় নিয়েছে মিয়ানমার থেকে আসা নতুন ৭ লাখসহ প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা। আমরা তাদের শরণার্থী বলছি না, তবে বাস্তবতা অবস্থাদৃষ্টে তাদের সেরকমই আমরা দেখতে পাই। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার যুগ যুগ ধরে তাদের দেশে বসবাস করে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি নির্মম, নিষ্ঠুর নিপীড়ন চালিয়ে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে এই জনগোষ্ঠীর প্রতি তাদের আচরণ ছিল নির্মম ও হিংস্র। পক্ষান্তরে, বাংলাদেশের ভূমিকা প্রশংসনীয়। সারাবিশ্ব দেখেছে, বাংলাদেশ নতুন ৭ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। তাদের খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছে। সারাবিশ্বে মানবিক রাষ্ট্রের উদাহরণ সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ।

সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন তাদের সীমান্তে জিরো টলারেন্স পলিসি গ্রহণ করেছে। দেখা গেছে, শিশুকে তার পিতামাতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হচ্ছে, যা অতীতে কখনও আর দেখা যায়নি। ‘ল্যান্ড অব ইমিগ্রেশন’ হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের এই আচরণে সারাবিশ্বে নিন্দিত হচ্ছে। তাদের বাজে অভিবাসন নীতি নিয়ে সারাবিশ্বে বিতর্ক চলছে।

সম্প্রতি ভূমধ্যসাগরে এক হাজারের বেশি অভিবাসী নিয়ে একটি বোট ভাসছিল, যাদের খাবার নেই, ওষুধ নেই, আশ্রয় নেই। স্পেন তাদের আশ্রয় দিয়ে সুনাম কুড়িয়েছে।

বিশ্বজুড়ে শরণার্থী সংকট দুর্বিষহ অবস্থা তৈরি করেছে। ইউরোপে শরণার্থী সমস্যা তীব্র হচ্ছে। যখন যুদ্ধ বা সহিংসতা হয়, তখন এক দেশের মানুষ জীবন রক্ষায় আরেক দেশে আশ্রয় নেয়। এটাই আন্তর্জাতিক রীতি-নীতি, এটাই মানবিকতা। এখন বিশ্বায়নের যুগ। এই যুগে এই সময়ে এসে রাষ্ট্র যদি তার নিরাপত্তার নামে, রাষ্ট্রের স্বার্থের নামে মানবতার জায়গাটাকে অবহেলা করে মানব জীবন বিপন্ন করে তোলে, তা গ্রহণযোগ্য নয়।

মিয়ানমার শরণার্থী সংকট তৈরি করেছে। আবার এই সংকটের আশু সুরাহা যেন না হয়, সেজন্যও চেষ্টা করছে। দুঃখজনকভাবে বিশ্বের কোনো কোনো বৃহৎ শক্তি তাদের পক্ষাবলম্বন করছে। আবার, কোনো কোনো দেশ তাদের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলেও তা অত্যন্ত দুর্বল।

আমি মনে করি, অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে শরণার্থী সংকটের সমাধান অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে বাংলাদেশের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য সাপোর্ট সিস্টেম ডেভেলপ করা দরকার বিভিন্ন দেশের সাহায্য নিয়ে। তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন করাতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে। সফলভাবে এ সমস্যা মোকাবেলা করার জন্য স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে এবং এ কাজে সব রাষ্ট্রকে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে হবে। বিশ্ব ব্যবস্থা থেকে জাতিগত দমন, নিষ্ঠুরতা ও অমানবিকতা দূর করতে সব রাষ্ট্রকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।