টানটান উত্তেজনায় কাঁপছে বিশ্ব

নিউজ ডেস্ক: ‘সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। ইমারজেন্সি দেখা দিয়েছে। আপনারা যার যার নিকটস্থ দরজা দিয়ে ভবন ত্যাগ করুন। দয়া করে লিফ্ট ব্যবহার করবেন না।’ ঘোষণাটি শোনার সঙ্গে সঙ্গেই বুকটা লাফিয়ে উঠল। ৩৯০ আসনের মিডিয়া সেন্টারে কর্মরত বিভিন্ন দেশের বেশ কয়েকজন রিপোর্টার ল্যাপটপ ফেলে রেখেই দৌড় দিলেন এক্সিট ডোরের দিকে। অনেকে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছেন স্পিকারের দিকে। উঁকিঝুঁকি মারছেন, আসলেই কিছু হলো কিনা দেখার জন্য।

এরই মধ্যে মিডিয়া সেন্টারের ঘোষক বললেন, ‘দয়া করে আসন গ্রহণ করুন। এটা কেবল “সিস্টেম চেক”।’ লুঝনিকি স্টেডিয়ামের সব বিভাগই এভাবে নিজেদের শেষ মুহূর্তের পরীক্ষা সেরে নিল গতকাল। নীলনয়না রুশ ললনারাও রঙিন পোশাকে শেষবারের মতো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মহড়া সেরেছেন। আজ যে তাদের পরীক্ষা! সারা বিশ্ব দেখবে রুশরা এক মহাযজ্ঞের আয়োজন কতটা সুন্দর করে তুলে ধরেন!

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কী হবে, ভাসা একটা তালিকা মোটামুটি সবার জানা। কিন্তু কী বিচিত্র বর্ণিল পোশাক পরে সেখানে পারফর্ম করবেন শিল্পীরা, তা কেউ জানে না। ওইটা আড়ালে-আবডালে চলছে। প্রহরীর দৃষ্টি এড়িয়ে মহড়ার ঘোমটাটা একটু ফাঁক করে তাকাতেই চোখে পড়ল নীলনয়না রুশ সুন্দরী দলের ওপর। বিচিত্র রঙেঢঙের পোশাকে নিজেদের সাজিয়েছেন তারা। তাদের দিকে তাকিয়ে ‘প্রিভিয়েত’ (হাই) বলতেই হেসে উঠলেন। ভিনদেশি মানুষের মুখে মায়ের ভাষা শোনার আনন্দ সত্যিই আলাদা। হাসতে হাসতেই বললেন, ‘স্পাসিভা’ (ধন্যবাদ)।

রুশদের এমন কোমল মনের যেমন সন্ধান মেলে তেমনি উগ্রগোষ্ঠীর দেখাও পাওয়া যায় রাস্তাঘাটে। মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটির স্প্যারো হিলে ফ্যান জোনের দিকে যেতে যেতেই সামনে পড়ল রাশিয়ান সমর্থকগোষ্ঠী। অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড গলায় ঝোলানো দেখেই ঢাকঢোল পিটিয়ে বন্ধুদের নিয়ে সমস্বরে বলে উঠল, রাশিয়া চ্যাম্পিয়ন। হাত তুলে তাদের সমর্থন দেওয়ার ভঙ্গি করলেও পথ ছাড়ল না। ভাষার মতো ইশারা-ইঙ্গিতের রীতিনীতিও বুঝি ভিন্ন হয়ে থাকে! ‘চ্যাম্পিয়ন রাশিয়া’ বলার পরই তারা পিছু ছাড়ল। হেসে উঠে হাত মেলাল। ফ্যান জোনে এমন উগ্র রুশ সমর্থকের কমতি নেই।

কিন্তু মস্কোর প্রাণকেন্দ্র রেড স্কোয়ারের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওখানে বিশ্বসংস্কৃতির মিলনমেলা। নানা রঙের হ্যাট মাথায় উরুগুয়ের সমর্থকরা পতাকা নিয়ে উৎসব করছেন। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন মোহাম্মদ সালাহর ভক্তরা। মিসরীয় ফুটবল ভক্তদের দলটা নেহায়েত ছোট নয়। তারা লিভারপুলভক্তদের তৈরি করা ‘মো সালাহ লা লা লা’ কোরাস গাইছেন। রেড স্কোয়ারে সবচেয়ে বেশি ইরানি ভক্তের সংখ্যা। তারা বিরাট পতাকা দুলিয়ে দুলিয়ে ‘ভাইকিং চ্যান্টে’র মহড়া দিচ্ছেন। যেন যুদ্ধ ঘোষণার পূর্বসংগীত!

ঐতিহাসিক লুঝনিকি স্টেডিয়াম তার স্মৃতির জাদুঘরে আরও একটা মুহূর্ত ধরে রাখতে যাচ্ছে। অলিম্পিক, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল, উয়েফা কাপ ফাইনালসহ আরও কত ইভেন্ট আয়োজন করেছে এই স্টেডিয়াম। লুঝনিকির স্মৃতির জাদুঘরে অবশ্য সবচেয়ে গুরুত্ব পাবে বিশ্বকাপটাই। একটা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী আর ফাইনাল ম্যাচের সাক্ষী হওয়া যে বিরাট ভাগ্যের ব্যাপার! আজ রাশিয়া-সৌদি আরব ম্যাচ দিয়েই পর্দা উঠছে বিশ্বকাপের।

রাশিয়ানরা বলছে বটে, ওরা চ্যাম্পিয়ন হতে চায়। কিন্তু বাস্তবতাটা বেশ ভালোই জানেন বিশেষজ্ঞরা। উরুগুয়ে আর সালাহসমৃদ্ধ মিসরকে টপকে দ্বিতীয় রাউন্ড খেলাটাও তো স্বাগতিক রাশিয়ার জন্য বেশ কঠিন হবে। গতকাল রাশিয়ান কোচ বললেন, ‘আমাদের প্রস্তুতি ভালো। সেরা ফুটবলটাই খেলতে চাই।’ এতটুকুতে থেমে ভিন্ন প্রসঙ্গ ধরেছেন তিনি। চেরচেসভের এমন বক্তব্যে মোটেও আস্থা নেই রাশিয়ান ফুটবলের খবরাখবর যারা রাখেন তাদের। গিওর্গি নামের এক ফুটবলভক্ত মেট্রোতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাঙা ইংরেজিতে বললেন, ‘চেরচেসভই আমাদের দলটাকে ডোবাল। ওর খেলার ধরনটাই ঠিক নয়।’

রাশিয়া কেমন খেলবে? সৌদি আরব জয় পাবে কি? এসব প্রশ্ন থাকলেও ফুটবলের মাতাল ভক্তদের এর উত্তর নিয়ে খুব একটা আগ্রহ নেই। একটা মাস ফুটবলে বুঁদ হয়ে থাকার প্রস্তুতি তারা বহু আগেই শেষ করেছেন। এবার কেবল মাতাল হওয়ার অপেক্ষা! বিশ্বকাঁপানো বিশ্বকাপের সেই রজনি ভোরটা যে এসেই গেল!