শিশুশ্রম বন্ধে চাই সম্মিলিত প্রচেষ্টা

মোহাম্মদ ফয়সুল আলম: শিশুশ্রম দেশব্যাপী একটা বড়ো সমস্যা। শিশুরা শ্রমের হাতিয়ার নয়, জাতির ভবিষ্যৎ; শিশুদের হাতে ভিক্ষার থলে নয়, চাই বই ও কলম। তারা বিভিন্ন কাজে শ্রম বিক্রি করেও প্রকৃত মজুরি থেকে বঞ্চিত হয়। শিশুদের কেউ কেউ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে আসছে। শিশু শুধু মাতা-পিতা নয় জাতির আশা, আকাক্সক্ষা, প্রত্যাশা ও স্বপ্নের অপর নাম। সাধারণভাবে জন্ম থেকে আঠারো বছরের কম বয়সি মানুষের পরিচয় হলো শিশু। সে আগামী দিনের একজন প্রত্যাশিত কর্মক্ষম মানবসম্পদ। সঠিক পরিচর্যায় প্রাপ্য সকল মৌলিক অধিকার আর মর্যাদা নিয়ে তার বেড়ে ওঠার কথা। কিন্তÍ আর্থসামাজিক টানাপোড়েন আর জীবনের বাস্তবতায় কোনো কোনো শিশুকে শৈশব আর কৈশোরের সব চাওয়া-পাওয়া, আনন্দকে বিসর্জন দিতে হয়। পরিবারের দায়িত্ব নিতে হয়। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হতে হয় অনেক সময়।

শিশুশ্রম শিশুর উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে, শিশুর শৈশব কেড়ে নেয় এবং শিশুকে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। নানা ধরনের স্বাস্থ্যগত সমস্যা সৃষ্টি হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও শিশুশ্রম বলতে বুঝিয়েছে এমন শ্রম যা শিশুকে শৈশব থেকে বঞ্চিত করে তাদের সকল সম্ভাবনা ও মর্যাদা নষ্ট করে। তাদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

যে বয়সে একজন শিশুর বই, খাতা, পেন্সিল নিয়ে স্কুলে আসা-যাওয়া এবং আনন্দিত চিত্তে সহপাঠীদের সাথে খেলাধুলা করার কথা, সেই বয়সেই শিশুকে নেমে পড়তে হয় জীবিকার সন্ধানে। অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে অনেক মাতাপিতা ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার বিষয়ে গুরুত্ব দেন না। স্বল্পশিক্ষিত মাতাপিতা দারিদ্র্যের কষাঘাতে যখন পরিবারের ভরণপোষণে ব্যর্থ হন তখন তারা সন্তানকে স্কুলে পাঠানো এবং লেখাপড়ার খরচ জোগাতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। তারা মনে করেন, সে যদি কাজে নিয়োজিত থাকে তাহলে সংসারের আয় সংকুলানে সহায়ক হয়।

১২ জুন বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। শিশু অধিকার সুরক্ষা ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম প্রতিরোধের লক্ষ্যে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন ২০০২ সালে বিশ্ব জুড়ে শিশুদের জন্য এই দিবসটি ঘোষণা করেছিল- আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম বিরোধী দিবস হিসেবে। পৃথিবীর নানা প্রান্তে লাখ লাখ শিশু কল-কারখানা, হোটেল, রেস্তোরাঁ, ঘর-বাড়িতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। শৈশবের আনন্দ, মাতা-পিতা, পরিবার পরিজন থেকে ¯েœহবঞ্চিত শিশুদের প্রতি অমানবিক আচরণ করার ঘটনা ঘটছে অহরহ। আন্তর্জাতিক বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দেশে দেশে শিশুশ্রম বন্ধ করার আইনের ফাঁক দিয়ে এক শ্রেণির মানুষ অবাধে শিশুদের দিয়ে কম মজুরিতে কাজ হাসিল করছে।

শিশু শ্রমিকেরা দিন শেষে ১৫ থেকে ৫০/৬০ টাকা কিংবা মাস শেষে ৫০০/৬০০ টাকা পেয়ে থাকে। যা তাদের শ্রম এবং প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য।

রাজুর বয়স এগারো। সাত বছর বয়স থেকেই কাজ করছে চিমনি কারখানায়। ভোর থেকে আগুনের কুণ্ডলীতে কাজ শুরু হয়, সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে। বিনিময়ে মাসে মাত্র ৬০০ টাকা পায়। এক সময় রাজু স্কুলে যেতো কিন্তু পেটের দায়ে কাজ নেয়। অমানুষিক পরিশ্রমে হাঁপিয়ে ওঠে, সপ্তাহে কোনো ছুটিও নেই।

তানিয়ার বয়স বারো হবে। থাকে বস্তিতে, পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তানিয়া দ্বিতীয়। ভোর না হতেই ছুটে যায় মানুষের বাড়িতে ঝি-এর কাজ করতে। কাপড় ধোয়া, ঘর মোছা, থালা-বাসন মাজা, গৃহস্থালী অন্য কাজসহ খাটে নানা ফুট-ফরমাশ। সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করতে হয় তানিয়াকে। এর মধ্যে বকাঝকাতো রয়েছেই। ভুল করলেই মারধর। অথচ কথা ছিল সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কাজ করানো হবে। বেতন ধরা হলো দেড় হাজার টাকা। কিন্তু এতো কাজ করার পর বেতন বাড়ানোর কথা থাকলেও তিন বছরেও তা হয়নি।

শুধু তানিয়া কিংবা রাজুর গল্প নয়। ওদের মতো বহু শিশুশ্রমিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছে রাজধানীসহ সারাদেশে বিভিন্ন স্থানে কর্মরত শিশু শ্রমিকরা। কেউবা অকালে প্রাণ হারাচ্ছে। দেশে এ বিষয়ে কঠোর আইন আছে তবে অশিক্ষা তথা পরিবারের অসচেতনতা এবং ঘটনা গোপন থাকায় অনেক সময়ই বিচারে বিঘ্ন ঘটেছে।

আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা আইএলও’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বের প্রায় ১৬ কোটি ৮০ লাখ শিশু নানাভাবে শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। এদের মধ্যে প্রায় সাড়ে আট কোটি শিশু নানা রকম ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত। ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশুই বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত।

শিশুশ্রম নিরসনে বাংলাদেশ সরকার ৩৮টি ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম নির্ধারণ করে ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম বন্ধের অঙ্গিকার করেছে। বাংলাদেশে শিশুশ্রমের প্রথম ও প্রধান কারণ হচ্ছে অর্থনীতি। তাছাড়া নদীভাঙন, বন্যা, খরা, জলোচ্ছ¡াস- এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগে অনেক শিশু মাতাপিতার সাথে ছিন্নমূল মানুষ হিসেবে শহরে আসে কাজের সন্ধানে। এমন বাস্তবতায় কিছু মুনাফালোভী লোক স্বল্প মজুরির বিনিময়ে শিশুদের কাজে লাগায়। আবার সুযোগ পেয়ে অধিক সময় কাজে নিয়োজিত রাখে।

প্রধানত দুটি সেক্টরে বাংলাদেশে শিশুশ্রম বিরাজমান। আনুষ্ঠানিক খাত যেমন শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, যোগাযোগ ও পরিবহণ ব্যবস্থা, জাহাজভাঙা ইত্যাদি এবং অনানুষ্ঠানিক খাত যেমন- কৃষি, পশুপালন, মৎস্যশিকার/ মৎস্যচাষ, গৃহকর্ম, নির্মাণকর্ম, ইটভাঙা, রিকসা-ভ্যান চালানো, দিন মজুরি ইত্যাদি। কিন্তু সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম নিষিদ্ধ। শুধু তাই নয়, শিশুকে শ্রমে নিয়োজিত করার ক্ষেত্রেও শর্ত আরোপ করা হয়েছে জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতিমালা ২০১০ এ। এতে ১৮ বছরের নীচে শিশুকে কোনো ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ দেওয়া আইনত দÐনীয় অপরাধ।

পৃথিবীর প্রায় সব দেশের মতো বাংলাদেশে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে অল্প মজুরি দিয়ে অধিক কর্মঘণ্টায় নিয়োজিত রাখা যায় বলে তাদের কাজে নিয়োগ দিতে মালিকপক্ষের আগ্রহ বেশি থাকে। অনেক সময় কোনো মজুরি ছাড়াই পেটেভাতে কিংবা সামান্য মজুরিতে শিশুদের কাজে রাখা হয় ।

বাংলাদেশ সংবিধানে সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে এবং জবরদস্তিমূলক শ্রম পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমসহ সবধরনের শ্রমসাধ্য কাজ থেকে শিশুদের প্রত্যাহার করে তাদের জীবনকে অর্থবহ করে তোলাই জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতিমালার লক্ষ্য। এ নীতিমালায় শিশু বিকাশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো শিশু দৈনিক সর্বোচ্চ পাঁচঘণ্টার অতিরিক্ত সময় কাজ করে; নিরাপত্তাহীন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করে; সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে; বিশ্রাম বা বিনোদনের কোনো সুযোগ না পায়; যা তার শিক্ষাজীবন ব্যাহত করে এবং এমন কোনো কাজে নিয়োজিত হয় যা জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও অমর্যাদাকর তবে মালিক বা নিয়োগকর্তা শিশু অথবা তার অভিভাবকের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হবে।

চুক্তি অনুযায়ী ১৪ বছরের কম বয়সি শিশুকে সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে নিয়োগ করা যাবে না। কাজের সম্পূর্ণ শর্ত থাকতে হবে, যাতে দৈনিক কর্মঘণ্টা, কর্মতালিকা, নির্দিষ্ট হারে নিয়মিত বেতনসহ সপ্তাহে কমপক্ষে একদিন ছুটির উল্লেখ থাকবে। লেখাপড়া অথবা দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং চাকরিচ্যুতির কমপক্ষে একমাস পূর্বে অবহিত করতে হবে। শিশুরা সহজেই কারিগরি বিষয় রপ্ত করতে পারে, এজন্য শ্রমে নিয়োজিত শিশুদের প্রচলিত আইনের আলোকে প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এ নীতিমালায়। যাতে আগামী দিনে তারা প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে নিজেদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।

সরকারের পাশাপাশি বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ও জাতীয় বেসরকারি সংস্থাও বাংলাদেশে শিশুশ্রম বন্ধে কাজ করে যাচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ইউনিসেফ, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম, বাংলাদেশ শ্রম ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, আইন ও শালিস কেন্দ্র, ওয়ার্ল্ড ভিশন, সিএসআইডি, অপরাজেয় বাংলাদেশ, তরঙ্গ, শাপলানীড়, ইডুকো, কোয়ালিশন ফর আরবান পুওর, ডন ফোরাম, তেরেদেশ নেদারল্যান্ড ইত্যাদি।

স্বাধীনতার পর মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে প্রবর্তন করা হয় শিশু আইন ১৯৭৪। পরবর্তীতে জাতীয় শিশুনীতি-১৯৯৪ প্রণয়ন করা হয়। শিশুদের জন্য জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০০৫-২০১০ গ্রহণ করাসহ জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ অনুসমর্থনে বাংলাদেশিদের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং তৈরি পোশাক শিল্প থেকে শিশুশ্রম প্রত্যাহারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। তারপরও শিশুশ্রম নিরসন তথা ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম থেকে শিশুদের পুরোপুরি প্রত্যাহার এখনো সম্ভব হয়নি। চলতি বছর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (ইইঝ) প্রাক্কলিত শিশুশ্রম জরিপ থেকে দেখা গেছে, দেশে ১৭ লাখ শিশু শ্রমিক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সি এ শিশুরা পূর্ণকালীন শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। সবমিলিয়ে দেশে ৩৪ লক্ষ ৫০ হাজার শিশু কোনো-না-কোনোভাবে শ্রমের সাথে যুক্ত রয়েছে।

সরকার প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। ২০২১ সালের মধ্যে দেশ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন হবে আশা করা যায়। আর ২০২৫ সালের মধ্যে নিরসন হবে সব ধরনের শিশুশ্রম। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (ঝউএ) ২০২৫ সালের মধ্যে দেশ থেকে সব ধরনের শিশুশ্রম নিরসনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সম্মিলিত উদ্যোগ এবং যথাযথ বাজেট বরাদ্দের পূর্ণ ব্যবহার হলে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব।

বাংলাদেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়ন কৌশল আজ তৃতীয় বিশ্বের বহুদেশের জন্য একটি মডেল। আজকে যে শিশু বা কিশোর, আগামী দিনে সেই হবে এ উন্নয়ন কৌশলের মূল চালিকাশক্তি। তাই শিশু অধিকার সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। তেমনি দারিদ্র্য দূরীকরণে আরো মনযোগী হতে হবে। সবাই মিলে শিশুদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হলে একটি সুন্দর দেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সফল হবে। দেশ ও জাতি উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারবে এবং শিশুশ্রমের অভিশাপ থেকে বাংলাদেশ মুক্ত হবে।
পিআইডি প্রবন্ধ