শান্তিনিকেতনে বাংলাদেশ ভবন

ফয়সল হাসান: আমাদের জাতীয় সংগীত বিবিসির জরিপে বাংলা ভাষার সর্বকালের সেরা গান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। বাণী, সুর, রূপক উপস্থাপনায় গানটি আমাদের হৃদয়ের কথা বলে, মর্মে মর্মে অনুরণিত হয় সর্বক্ষণ। গানটিতে দেশের সামগ্রিক রূপের যে বর্ণনা তা প্রতিটি বাঙালির ভালোবাসার এক অনন্য প্রতীক। এ গানের রচয়িতা আমাদের প্রাণের কবি- বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বাংলাদেশ ও বাঙালির এক নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে। বাঙালির চিন্তা-চেতনা, প্রকৃতি ও মানুষ রবীন্দ্রসাহিত্যের ভুবনকে সম্প্রসারিত করেছে।

রবীন্দ্রনাথের সমগ্র কর্মজীবনে তাঁর সাহিত্যকর্ম বাংলাদেশে অবস্থানকালেই অনেক বেশি সৃষ্টিশীল হয়েছিল। এদেশের বাউলদের গান এবং তাঁদের অকৃত্রিম সান্নিধ্য ধর্ম ও জীবন সম্পর্কে তাঁকে উপহার দিয়েছিল বিশ্ব মানবতার দর্শন। যে বাংলা ভাষা আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদায় অভিষিক্ত, এই ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রক্ত দিয়েছে বাঙালি, সেই ভাষাকে বিশ্বসভায়, বিশ্বভাষায় অসীম শক্তির ভাষা হিসেবে নতুন প্রাণ দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর লেখায় বাঙালির হাজার বছরের প্রেম, আবেগ ও সংগ্রামের শৈল্পিক উত্থান ঘটে। তাই বাঙালি সকল সংকটে হাত বাড়িয়েছে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গান ও চিন্তার ভুবনে।

বাংলাদেশের রাজনীতি ও শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে আজ রবীন্দ্রনাথ অবিচ্ছিন্ন এক সত্তা। প্রতিটি বাঙালির জীবনে তিনি উজ্জ্বল বাতিঘর। আমাদের হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ, দ্রোহ ও শান্তিতে রবীন্দ্রনাথ থাকেন হৃদয়ের কাছের মানুষ হয়ে। তাঁর সৃষ্টির ঝর্ণাধারায় আমরা অবগাহন করি প্রতিনিয়ত। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকীতে তাঁর সাহিত্য ও গানকে নিষিদ্ধ করার অপচেষ্টা করেছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। সেই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন এ ভূখÐের মানুষ। সংগ্রামের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথকে ধারণ করা হয় আমাদের হৃদয়ে, চেতনায় ও বিশ্বাসে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রবীন্দ্রসংগীত আমাদের দিয়েছে প্রেরণা, যুগিয়েছে উৎসাহ ও সাহস।

রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন, ভারতের কলকাতায় অবস্থিত হলেও, এটি বাংলাদেশের মানুষের অতি প্রিয়। প্রথাগত চর্চার বাইরে দারুণ এক শান্তির পরিবেশ এবং মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্থান এটি। বিশ্বপরিসরের জ্ঞানচর্চার এক অনবদ্য মিলনকুঞ্জ। প্রাচীন ভারতের নৈসর্গিক আবহের মধ্যে তপোবন বিদ্যালয়ের যে আদর্শিক নমুনা সেটাই কবিকে নানামাত্রিকে উদ্বুদ্ধ করে। সঙ্গত কারণে ‘ব্রহ্মচর্যাশ্রম’ নামে বিদ্যালয়টি কবির চেতনালব্ধ বোধেরই এক সংস্করণ। শান্তিনিকেতনের বিদ্যাশ্রমের যাত্রা এভাবে শুরু হলেও পরবর্তীতে তা আরও ব্যাপক আকার আর বিশ্বজনীনতার অপার সুষমায় গড়ে উঠতে সময় নেয়নি।

পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশীর্বাদপুষ্ট বিদ্যালয়টি কালক্রমে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদায় আসীন হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে এখানে পর্যটক ও বিদ্বানগণ আসেন, রবীন্দ্রস্মৃতি হাতড়ে বেড়ান। প্রকৃতির অপার সুষমায় মুগ্ধ আর বিমোহিত হওয়ার মতো পর্যাপ্ত আনন্দ আর বিনোদনের সঙ্গে জীবন গড়ার এক বৈষয়িক ব্যবস্থাও এখানে বিরাজমান। সারাদেশ আর বিশ্ব পরিভ্রমণ করা রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন ঐতিহ্যিক মূল্যবোধ থেকে যেমন চ্যুত হওয়া যাবে না, পাশাপাশি বিশ্বের অবাধ আর মুক্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চাকেও জীবন ও দেশ গড়ার অপরিহার্য শর্ত হিসেবে সন্নিবেশিত করতে হবে। এক কথায়, রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন সুশোভিত জীবন গড়ার কারিগর- নান্দনিক আবহে পরিশুদ্ধ বিদ্যাচর্চার উন্মুক্ত সাধনকেন্দ্র।

বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে নির্মিত হলো বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের স্মারক ও ধারক ‘বাংলাদেশ ভবন’। সেখানে আগে থেকেই আছে চীন ভবন, আছে নিপ্পন তথা জাপান ভবন। এ দুই ভবনে তুলে ধরা হয়েছে সেসব দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। আর সেখানে নতুন সংযোজন হলো বাংলাদেশ ভবন। গত ২৫ মে ২০১৮ শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নবনির্মিত এ ভবনটি যৌথভাবে উদ্বোধন করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দু’দেশের সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে ওঠা বাংলাদেশ ভবনের প্রবেশদ্বারের দুই দিকের দুই দেয়ালে আছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও নোবেল বিজয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দু’টো মুরাল। ভেতরে নির্মাণ করা হচ্ছে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের আদলে একটি শহিদ মিনার। আছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মৃতি-স্মারক। ফ্রেমবন্দি হয়েছে বাংলার মাটিতে বিশ্বকবির অবস্থানের বিভিন্ন তথ্য, ইতিহাস, স্মারক ও চিত্রাবলি। সবমিলিয়ে শান্তিনিকেতনে নির্মিত ‘বাংলাদেশ ভবন’ যেন ‘অন্য এক বাংলাদেশ’।

২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকের পর শান্তিনিকেতনে বাংলাদেশ ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরপর ২০১৪ সালের মার্চে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ সরকার। ভবন নির্মাণের জন্য ব্যয় ধরা হয় ২৫ কোটি রুপি। শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দুই বিঘা জমি প্রদান করে। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের শেষ দিকে বিশ্বভারতীর দক্ষিণ পল্লিতে ইন্দিরা ভবনের পাশে এ জমির ওপর ‘বাংলাদেশ ভবন’ তৈরির কাজ শুরু করে ন্যাশনাল বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন লিমিটেড (NBR) নামের একটি প্রতিষ্ঠান যার নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

দ্বিতল এ বাংলাদেশ ভবনের মোট আয়তন চার হাজার একশ বর্গমিটার। ভবনের ভেতরে রয়েছে দু’টি সেমিনার হল, একটি লাইব্রেরি এবং দু’টি স্টাডি সেন্টার। থাকছে ৪৫৩ জন একসঙ্গে বসে অনুষ্ঠান উপভোগের জন্য বিশ্বমানের অডিটোরিয়াম। শব্দ নিরোধক, অত্যাধুনিক আলোর ব্যবস্থা ছাড়াও অডিটোরিয়ামে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র। পাশাপাশি নিরাপত্তার জন্য বসানো হয়েছে অসংখ্য সিসিটিভি। কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় রাখা হয়েছে একটি জাদুঘরও। বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের কারুকাজ ও নকশায় তৈরি আসবাবপত্র দিয়ে সুনিপুণভাবে সজ্জিত করা হয়েছে এ ভবন। ভবনটির দেখভাল করবে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ লক্ষ্যে ভবনটি ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে ভবনটির লাইব্রেরি ও জাদুঘর পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ করবে বাংলাদেশ সরকার। আর এজন্য ১০ কোটি রুপির সমপরিমাণ একটি স্থায়ী তহবিল গঠন করা হবে।

বাংলাদেশ ভবনে শিলাইদহে থাকাকালীন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা গান কবিতার পাশাপাশি রয়েছে তাঁর জীবনের বিভিন্ন মুহূর্তের ছবি। লাইব্রেরিতে রয়েছে ৬ হাজারেরও বেশি বই। এসব বইয়ের বেশিরভাগই রবীন্দ্রনাথের ওপর। এছাড়াও আরো আছে কবি কাজী নজরুল ইসলাম, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান নিয়ে নানা ধরনের বই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারগারের দিনলিপি ইত্যাদি বইও স্থান পেয়েছে এ লাইব্রেরিতে। আছে বাংলাভাষা ও বাংলাচর্চা কেন্দ্রও। বিদেশিরা সেখানে গবেষণার সুযোগ নিতে পারবেন। বাংলাদেশের ওপর গবেষণা করতে চাইলে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে পড়তে পারবেন তাঁরা।

ভবনের অন্যতম আকর্ষণ সংগ্রহশালা। সেটিরও কেন্দ্রে মূলত রবীন্দ্রনাথ। পতিসর ও শাহজাদপুর হতে সংগ্রহ করা কবির ব্যবহৃত নানা জিনিস সেখানে রাখা হয়েছে। এছাড়া শিলাইদহের কুঠিবাড়িসহ রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত নানাস্থানের ভিডিও সংরক্ষণ করা হয়েছে। একটি প্যানেলে রয়েছে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রকাশিত সব ডাকটিকেট, কবির জন্ম সার্ধশতবর্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত রৌপ্যমুদ্রা ইত্যাদি। এছাড়া ময়নামতি, পাহাড়পুরের মতো জায়গা থেকে পাওয়া বৌদ্ধযুগের বেশ কিছু নির্দশন রাখা হয়েছে অন্য একটি প্যানেলে। এছাড়া ঠাঁই পেয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নানা ছবি, নকশি কাঁথা ও পাটি ইত্যাদি। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী জামদানি শাড়ি, পদ্মার চপলা নৌকোর রেপ্লিকা, একতারা ইত্যাদিও রয়েছে বিশ্বভারতী ক্যাম্পাসের বাংলাদেশ ভবনের এ সংগ্রহশালায়। সর্বোপরি, ভবন নির্মাণ থেকে প্রদর্শনী সবকিছুতেই বাংলাদেশের সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

রবি ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত এই জায়গায় বাংলাদেশ ভবন নির্মাণ নিঃসন্দেহে আনন্দের এবং গর্বের। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ক শিক্ষা ও গবেষণার জন্য বাংলাদেশ ভবন হবে একটি অনুপম কেন্দ্র। আর এর সবই সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগ ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়। বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক অনুদানে নির্মিত ভবনটি দুই বাংলার শিক্ষা, সংস্কৃতি, গবেষণা, সর্বোপরি জ্ঞানচর্চার সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করবে- এটাই সকলের প্রত্যাশা।

উভয় দেশের মধ্যে হাজার বছরের অভিন্ন ঐতিহাসিক, সামাজিক, ভাষিক, সাংস্কৃতিক ও আত্মিক বন্ধন বিদ্যমান। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ভবন দুই দেশের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন ঘটানোর মাধ্যমে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করবে। তাছাড়া এ ভবন নির্মাণ শান্তিনিকেতন পরিদর্শনে আসা পর্যটক, গবেষক ও সাহিত্যপ্রেমীদের বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে আরো বেশি মাত্রায় জানতে ও গবেষণায় আগ্রহী করে তুলবে এবং বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বলতর করবে।
পিআইডি প্রবন্ধ