ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে প্রায় শত কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি

 
মো. নজরুল ইসলাম, ময়মনসিংহ: মধ্যবিত্য ও নিম্ন মধ্যবিত্ত লোকদের কেনাকাটার জন্য ময়মনসিংহ শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত গাঙ্গিনারপাড় হকার্স  সুপার মার্কেটে বৃহস্পতিবার সকালে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে দেড় শতাধিক দোকানপাট ও মালামাল। আগুনে পাশের মসজিদ মাকের্টেও আরো প্রায় ৩০টি দোকানের মালামাল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়াও আশপাশে আরো শতাধিক দোকানের মালামাল সরাতে গিয়ে ক্ষতির স্বীকার হয়েছে। সকাল সাড়ে ৬টায় লাগা এ আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিটের পাশাপাশি র‌্যাব-পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবী ও ব্যবসায়ীরা। তবে ছয় ঘন্টা পর বেলা সোয়া ১২টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণ হলেও ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন থাকে পুরো গাঙ্গিনারপাড় জুড়ে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আগুন আকস্মিক ছড়িয়ে পড়ে পাশের মসজিদ মার্কেটে।  ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ফলে হকার্স  মার্কেট, মসজিদ মার্কেট ও আশপাশের সকল দোকানের  প্রাথমিকভাবে আনুমানিক প্রায় শত কোটি টাকা ক্ষয়ক্ষতি হবে বলে জানান ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ। 
ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। এদিকে খবর পেয়ে বিভাগীয় কমিশনার জি.এম সালেহ উদ্দিন, ডিআইজি নিবাস চন্দ্র মাঝি,  জেলা প্রশাসক ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস, পুলিশ সুপার সৈয়দ নূরুল ইসলাম, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইউসূফ খান পাঠান,  ময়মনসিংহ পৌর মেয়র ইকরামুল হক টিটু, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো: মোহসীন উদ্দিন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আল আমিন, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট জহিরুল হক খোকা ও  সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল, জাপার মহানগর শাখার সভাপতি জাহাঙ্গীর আহমেদসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এসময় জেলা প্রশাসন ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস আসন্ন ঈদকে বিবেচনা করে ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ীদের দুই/এক দিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণ ও স্বল্প সময়ের মধ্যে ব্যাংক ঋণ প্রদানের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। আগুনের সূত্রপাত ও ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মো: নায়িরুজ্জামানকে প্রধান করে আট সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে তিন দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক। 
 
এদিকে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের ধীরগতির কথা উল্লেখ করে জেলা প্রশাসককে জানান, শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জনাকীর্ণ প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র গাঙ্গিনারপাড়, স্টেশন রোড এলাকায় কোনো জলাধার  বা পুকুর নেই। বেশ কয়েকটি পুকুর থাকলেও বর্তমানে শহরের একমাত্র পানির উৎস বিদ্যাময়ী সরকারী বালিকা বিদ্যালয়ের পুকুর। ঘটনাস্থল থেকে পুকুরটি কোয়ার্টার কিলোমিটার দূরে হওয়ায় আগুন নিয়ন্ত্রণে প্রায় ছয় ঘন্টা সময় লাগে। এনিয়ে প্রচন্ড ক্ষোভ প্রকাশ করেন ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা জানান, হকার্স মার্কেট লাগুয়া গাঙ্গিনারপাড় মসজিদের ভিতর ওজুর জন্য বিশাল জলাধার ছিলো। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীদের যোগসাজসে সেটিকে বন্ধ করে মার্কেট ও হোটেল করা হয়েছে। ফলে হকার্স মার্কেটের পাশে কোনো জলাধার না থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে বিলম্ব হয়েছে। নইলে ক্ষতির পরিমান অনেক কম হতো। এদিকে আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়লে মার্কেটের ব্যবসায়ী, স্বজন ও লাখো উৎসুক জনতা ভীড় জমান। যে কারনে আগুন নিয়ন্ত্রণে অনেকটা বেগ পেতে হয়।      
 
ময়মনসিংহ শহরের প্রাণকেন্দ্র গাঙ্গিনারপাড় হকার্স মার্কেটে ছোট-বড় ব্যবসায়ীদের প্রায় দেড় শতাধিক পাইকারি ও খুচরা দোকান। যেখানে জুতা, এমব্রয়ডারি, জামা-কাপড়, গার্মেন্টস ও কসমেটিকসের দোকানই বেশি।  এ ছাড়াও শহরের একমাত্র মেশিনারিজ যন্ত্রাংশের মার্কেট। বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ৬টায় আকস্মিক আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে পান স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। খবর পেয়ে প্রথমে ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের ৪টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করলেও পানি স্বল্পতায় তা বিলম্ব হয়। এরপর ত্রিশাল, ঈশ্বরগঞ্জ, মুক্তাগাছা ও ফুলবাড়ীয়া থেকে আরো ৪টি ইউনিট এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। কিন্তু ততক্ষণে আগুনের লেলিহান শিখা মুহুর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে পুরো মার্কেট জুড়ে। এসময় ভয়ে-আতংকে হকার্স মার্কেট লাগুয়া দোকানপাটের মালামালও সরিয়ে নেন দোকানীরা। এসময় ব্যবসায়ী স্বজনদের আহাজারিতে পুরো এলাকাজুড়ে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের সৃস্টি হয়। 
 
 
হকার্স মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আব্দুল হক কান্নাজড়িত কন্ঠে জানান, আগুনে হকার্স মার্কেটের সবগুলো দোকানপাট ও মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা ঋণ করে, সূদ নিয়ে একটু লাভের আশায় প্রত্যেকটি দোকানে ঈদ সামগ্রী তুলেন। সব হারিয়ে এখন নি:স্ব এখানকার ব্যবসায়ীরা। তিনি আনুমানিক ৫০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশংকা করছেন। 
আবেগ-আপ্লুত কন্ঠে দোকানদার হৃদয় জানান, তাদের পরিবারের আয়ের একমাত্র উৎস একটি জুতার দোকান। আগুনে সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আরেক দোকানদার রবিন ও বিপ্লব জানান, আগুনে সব শেষ। এখন আমরা পথের ভিখারি। ঈদকে সামনে রেখে সূদ করে টাকা নিয়ে মাল তুলেছি একটু লাভের আশায়। 
স্থানীয় ব্যবসায়ী খন্দকার শরীফ জানান, আগুনের ঘটনা এটা সবচেয়ে ভয়াবহ। এরআগে এত বেশি দোকানপাটে আগুন লাগার খবর শোনেননি তিনি।   
 
ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারি পরিচালক শহীদুর রহমান জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট কাজ শুরু করে। কর্মীরা প্রাণপণ চেষ্ঠা চালিয়ে যাচ্ছেন। পানি সমস্যার কারনে প্রচন্ড বেগ পেতে হচ্ছে। প্রায় কোয়ার্টার কিলোমিটার দূরে শহরের একমাত্র জলাধার বিদ্যাময়ী সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের পুকুর থেকে পানি এনে আগুন নিভানোর কাজ চলছে। বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগতে পারে ধারণা করছেন ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা। 
 
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আল আমিন জানান, খবর পেয়ে পুলিশ অর্ধ শতাধিক সদস্য আগুন নিয়ন্ত্রণসহ আইন শৃংখলা নিয়ন্ত্রনে এবং লুটপাট এড়াতে প্রাণপণ চেষ্টা চালান। তবে খুব হিমশিম খেতে হচ্ছে। কোতোয়ালী মডেল থানার ওসি মাহমুদুল ইসলাম জানান, খুব সকালের দিকে আগুন লাগায় ব্যবসায়ী আগুনের খবর শুনে যথাসময়ে আসতে পারেনি। ফলে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে।  
 
জেলা প্রশাসক ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস জানান, খুব ভয়াবহ আগুন লেগেছে। মার্কেটের দেড় শতাধিক দোকানপাটের সবই পুড়ে গেছে। বিভিন্ন সংস্থার লোকজন ক্ষয়-ক্ষতি নিরূপনে কাজ করছে। তিনি আসন্ন ঈদকে বিবেচনা করে ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ীদের স্বল্প সময়ের মধ্যে অর্থাৎ দুই/এক দিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণ ও ব্যাংক ঋণ প্রদানের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।