জাতীয় ঐক্যের দর কষাকষি কৌশলে বিএনপি

নিউজ ডেস্ক: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করার লক্ষ্যে একটি জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করতে প্রায় দুই বছর ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। সম্প্রতি এই ঐক্যে নতুন দিশা এসেছে। বিএনপির সঙ্গে সংসদের বাইরে থাকা দলগুলোর সাক্ষাৎ-বৈঠক-মতবিনিময় হচ্ছে নিয়মিত। ইতোমধ্যে ছোট দলগুলোর বড় নেতারা বিএনপির সঙ্গে দর কষাকষি শুরু করেছেন। তবে খালেদা জিয়া কারাগারে থাকায় এখনই সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাবের জবাব দিতে চায় না বিএনপি। দলটির জাতীয় স্থায়ী কমিটি ও ছোট দলগুলোর শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য জানান, জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে বিকল্প ধারা সভাপতি ডা. অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ড. কামাল হোসেন, মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ কয়েকজনের সঙ্গে বিএনপির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরাসরি কয়েকজন বিরোধী দলের নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সূত্র জানায়, এখনও আশা করার কোনও অবস্থানে যেতে পারেনি বিএনপি। তবে এই নেতাদের কেউ-কেউ আশা ধরে রেখেছেন, যে আগামী নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করতে বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্য সম্ভব।

এ বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেন, ‘আগামী নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করতে সবার আগ্রহ আছে। বিএনপিও চায় তাদের সঙ্গে একটি জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠুক। এখন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।’

ভাইস-চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান এ প্রতিবেদককে বলেছেন, ‘আমি নিজেও কয়েজনের সঙ্গে জাতীয় ঐক্য নিয়ে কথা বলেছি। আলোচনা করেছি। গণতন্ত্রের জন্য জাতীয় ঐক্য খুব বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে।’

ইতোমধ্যে চারদলীয় যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী জানিয়েছেন, ‘আগামী নির্বাচনের পর মানুষের শান্তি, নিরাপত্তা ও দেশের অগ্রগতির লক্ষ্যে আগামী ৫ বছরের জন্য একটি জাতীয় সরকার গঠন করা হোক। তাতে নির্বাচনের পরে দেশে কোনও সহিংসতা, আগুন জ্বালানো, অন্যায়, অত্যাচার ও অবিচার হবে না।’ এদিকে, শনিবার (২ জুন) জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তফ্রন্ট।

একইসঙ্গে এই জোট মনে করে, নির্বাচনকালীন সময়ের জন্য দলীয় সরকারের পরিবর্তে নির্দলীয় নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিতামূলক সরকার গঠন করা দরকার। নির্বাচনে সবার জন্য সমতল মাঠ গড়ে তোলার জন্য নির্বাচনে প্রশাসনিক প্রভাব বন্ধ করা, অস্ত্র, পেশী শক্তি ও কালো টাকার ব্যবহার বন্ধ করা প্রয়োজন। এছাড়া নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার একমাস আগে সরকারের পদত্যাগ ও পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার দাবিও করেছে যুক্তফ্রন্ট। উল্লেখ্য, বিএনপির পক্ষ থেকে যে দাবিগুলো ইতোমধ্যে সামনে এসেছে, সেগুলো অনেকটাই যুক্তফ্রন্টের দাবিতে যুক্ত হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, ‘যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান বি চৌধুরী, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের এক নেতার বৈঠকের পর সরাসরি কোনও প্রস্তাব দেননি তারা। তবে তারা বিভিন্নভাবে তাদের চাহিদাগুলোকে সামনে আনছেন। বিশেষ করে বি চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি ও ড. কামাল হোসেনকে প্রধানমন্ত্রী করার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সূত্র বলছে, নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করার স্বার্থে বিকল্প ধারা, গণফোরাম, নাগরিক ঐক্য, জেএসডি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, সিপিবি-বাসদ, বামমোর্চাসহ আরও কয়েকটি ইসলামী দলের সঙ্গে বিক্ষিপ্তভাবে আলোচনা চলছে। এক্ষেত্রে এই দলগুলো যে প্রস্তাবই করুক না কেন বিএনপি মনে করে, এখনই দর কষাকষি করা ঠিক হবে না। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে কোনও ধরনের প্রস্তাবকেই আলোচনার টেবিলে তুলতে রাজি নয় বিএনপি। রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে এই দর কষাকষির বিষয়টিকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত টেনে নিতে চায় দলটি।

যুক্তফ্রন্টের মুখপাত্র ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে তারা ফরমালি কথা বলেছেন, এরকম না। আলাদা-আলাদাভাবে যুক্তফ্রন্টের জোটের যারা আছেন, তাদের সঙ্গে তারা কথা বলেছেন। আমরা মনে করি, একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করার জন্য যারা এই দাবিতে আছেন, তাদের ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াইটা করা উচিত। কিন্তু এটার ডিটেইলিংটা হয়নি। তাদের কলের সঙ্গে আমাদের কল কাছাকাছি আছে, কিন্তু এই কল দিলেই তো আর হলো না, বসে এর ডিটেইলটা ঠিক করতে হবে। সেটা করা হয়নি, কিন্তু এটা করা সম্ভব হতে পারে।’

স্থায়ী কমিটির একটি সূত্র বলছে, নির্বাচন ঘনিয়ে এলে ছোট দলগুলোর চরিত্র আরও পরিষ্কার হবে। এক্ষেত্রে কেউ-কেউ নির্বাচনের বিষয়ে এখন থেকে ইতিবাচক অবস্থান ব্যক্ত করছেন। ফলে, শেষ মুহূর্তে গিয়ে বিএনপি নিজেদের অবস্থান জানাবে দলগুলোকে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যদি জাতীয় ঐক্য আশাপ্রদ চেহারা না পায়, তাহলে ২০ দলীয় জোটকে সঙ্গে নিয়েই প্রার্থী দেবে বিএনপি।

বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এনপিকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে কৌশলগত কারণে হলেও দলটিকে ছাড়তে পারে বিএনপি। যদিও এ বিষয়টি দলে আলোচনা আকারে স্থান পায়নি। বিএনপি-জোটের বাইরের দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য-প্রক্রিয়া চললেও জোট নিয়ে বিএনপির চিন্তা আছে। বিশেষ করে জোটের শীর্ষ নেতাদের নির্বাচনি আসন নিশ্চিত করবে দলটি। ইতোমধ্যে খালেদা জিয়া গ্রেফতার হওয়ার আগে জোটনেতাদের অনেককেই নিজে থেকেই নিজ-নিজ এলাকার ব্যাপারে নিশ্চয়তা দেন।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘ঐক্য বলতে তো সবাই এক জায়গায় আসতে হবে, তা না। একলক্ষ্যে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থেকেও আন্দোলন হতে পারে। এরশাদের সময় সবাই আন্দোলন করেছে। আন্দোলন বলতে সবাই এক ব্যানারে আসতে হবে, তা নয়। না আসলেও হতে পারে। কথা হচ্ছে, সবার গন্তব্যস্থল যদি এক থাকে, তাহলে তো হয়েই গেলো।’

দর কষাকষির প্রসঙ্গে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এটা তো এত আগে আলোচনা হবে না, নির্বাচন কাছাকাছি এলে কত কিছুই হতে পারে। ঐক্য তো একটি চলমান প্রক্রিয়া। পথ চলতে-চলতে অনেক কিছুই হতে পারে। চলতে-চলতে এটা নিজ গতি পাবে, চরিত্র পাবে, নিজের আকার পাবে।’