যৌন হয়রানির মামলা যেকোন থানায় করা যাবে: হাইকোর্ট

নিউজ ডেস্ক: বিজয় সরণির চন্দ্রিমা উদ্যান মোড়ে সায়মার (ছদ্মনাম) পোশাক নিয়ে কথা বলে এক পথচারী। এক কথা-দু’কথা থেকে একসময় পথচারী ছেলেটি অশালীন অঙ্গভঙ্গি করে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় সায়মাকে। ছেলেটির বিষয়ে অভিযোগ করতে শেরে বাংলা নগর থানায় যোগাযোগ করলে ঘটনাস্থল কোথায় জানতে চাওয়া হয় এবং ওই ঘটনাস্থলের জন্য তেজগাঁও থানায় অভিযোগ করতে হবে জানানো হয়। ঘটনাস্থল থেকেই তেজগাঁও থানায় অভিযোগ করতে হবে কিনা, খোঁজখবর চালিয়ে তার বন্ধুরা বলেন, অভিযোগটি শেরে বাংলাতেই হওয়ার কথা। একসময় সায়মা বাসায় ফিরে যান।

ক্ষোভ নিয়ে তিনি বলেন, ‘মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে খোঁজ নিয়ে বের করতেই পারলাম না কোন থানায় যেতে হবে। এই অভিযোগ করলে আমার কপালে কী হয়রানি-হেনস্তা হবে, কে জানে!’

সব ধরনের যৌন হয়রানির ক্ষেত্রেই ভিকটিম নারী যে থানায় যাবেন, সেই থানাকেই মামলা নিতে হবে৷ ঘটনাস্থল তাদের থানা এলাকার মধ্যে নয় বলে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না, এ নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালতের এই নির্দেশনার ফলে নারীরা অভিযোগ দাখিলে অধিকতর স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন নারীনেত্রী ও আইনজীবীরা।

হাইকোর্ট গত রবিবার (২৭ মে) এক আদেশে ধর্ষণসহ যেকোনও যৌন নিপীড়নের ঘটনায় করণীয় নির্ধারণ করে ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করেছেন। আদালত বলেছেন, এই ১৮ দফা নির্দেশনার ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করতে হবে। সুনির্দিষ্ট আইন হওয়ার আগ পর্যন্ত এই নীতিমালা মেনে চলতে হবে৷

নির্দেশনায় সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া কোনও পুলিশ কর্মকর্তা যদি অভিযোগ নিতে দেরি করেন, তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বিধান তৈরি করতে হবে৷

২০১৫ সালের ২১ মে রাতে ঢাকায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন এক গারো তরুণী৷ এরপর তার অভিযোগ নেওয়া নিয়ে বিভিন্ন থানায় টালবাহানার ঘটনায় আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ও ব্লাস্টসহ পাঁচটি মানবাধিকার সংগঠন বাদী হয়ে হাইকোর্টে রিট করে। রিটের শুনানি শেষে বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ২০১৫ সালের ২৫ মে রুল জারি করেন৷ ২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি যে রায় দেওয়া হয় রবিবার তার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে ১৮ দফা নির্দেশনাসহ পরামর্শ দেন আদালত৷

নিজেরা করি’র সমন্বয়ক খুশি কবীর বলেন, ‘যেকোনও ধরনের যৌন হয়রানি কিংবা ধর্ষণের মতো অপরাধের ঘটনার শিকার নারী অভিযোগ করতে যাওয়াটাই আমাদের সমাজে এখনও ভীষণ রকম চ্যালেঞ্জ। সেটা করার সাহস সঞ্চয় করছেন যখন, তখন কিনা নানা হয়রানির শিকার হন৷ এখন এই নির্দেশনার পর সেটা বন্ধ হবে, এই আশা আমরা করতে পারি। এখন এই নির্দেশনা আইনে রূপান্তরিত করার কাজটি দ্রুত যেন হয়, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে এবং একইসঙ্গে যতদিন আইন না হয় ততদিন এই নির্দেশনা যেন থানায় থানায় পৌঁছে, সেটুকু তদারকি করা জরুরি।’

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল বলেন, ‘আদালতের নির্দেশনা অনুয়ায়ী, থানা মামলা নিতে আর দেরি করার সুযোগ পাবে না। কারণ যে থানায়ই ভিকটিম হাজির হবেন, সেই থানাকেই মামলা নিতে হবে কিংবা ডিএনএ টেস্ট বাধ্যতামূলক, এসব নির্দেশনা দ্রুত কার্যকর করতে হবে। যে নিয়ম করা হচ্ছে সেটা মানছে কিনা, সেটা খুব গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নিতে হবে। আশা করছি, ভিকটিম এবার কিছুটা হলেও থানার মতো পরিসরে গিয়ে স্বস্তি বোধ করবেন।’

ধর্ষণের মামলা দায়ের বিষয়ে কোনও নীতিমালা বা আইন না হওয়া পর্যন্ত রায়ে উল্লেখিত ১৮ দফা নির্দেশনা মানতে পুলিশ বাধ্য কিনা, তা জানতে চাইলে ব্লাস্টের জ্যেষ্ঠ আইনি কর্মকর্তা শারমিন আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হ্যাঁ। সবাইকে এই নির্দেশনা মানতে বলা হয়েছে। আর পুলিশ তো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এখানে মূলত আদালতের নির্দেশনাগুলো পুলিশের ওপরেই দেওয়া হয়েছে। পুলিশ স্টেশনে কী হবে, হবে না, এটা তো পুলিশরাই তদারকি করবেন। সেখানে নারী পুলিশ থাকবেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে ভিকটিমের তথ্য রেকর্ড করতে হবে, তাকে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে পাঠাতে হবে— এগুলো তো পুলিশেরই কাজ থাকবে। তাই পুলিশ এই নির্দেশনাগুলো মানতে বাধ্য।’

সুস্পষ্ট নীতিমালা বা আইন না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের ঘটনায় আপনাদের পর্যবেক্ষণ থাকবে কিনা জানতে চাইলে শারমিন আক্তার বলেন, ‘আমরা তো অ্যাডভোকেসি পর্যায়ে কাজ করছি। কিন্তু ওভাবে থানায় থানায় গিয়ে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। তবে এ সংক্রান্ত কোনও খবর, ঘটনা বা ভিকটিম যদি আমাদের কাছে আসে তখন আমরা এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করবো।’