১৯৫৮ বিশ্বকাপ: পেলের আবির্ভাবে ব্রাজিলের মাথায় শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট

নিউজ ডেস্ক: আর মাত্র কয়েক দিনের অপেক্ষা! তার পরেই শুরু `গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ`। বিশ্বকাপ ফুটবল। এক মাস সারা পৃথিবীকে এক সুরে বেঁধে রাখবে সেই এক খেলা। সারা বিশ্ব জুড়ে কয়েক কোটি মানুষ টিভির পর্দাতেই রোনালদো, মেসি, নেইমারদের পায়ের জাদুতে মগ্ন হবেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে এসে গেল ফুটবল বিশ্বকাপের মৌসুম। দরজায় কড়া নাড়ছে বিশ্বকাপ ফুটবলের মাসকট ‘জাভিবাকা’।

প্রায় শতবর্ষের কাছাকাছি চলে যাওয়া এই টুর্নামেন্টের শুরুটা হয়েছিল কিভাবে? ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসই বা কি ছিল? বিশ্বকাপের আগের আসরগুলো কেমন ছিল? রাশিয়া বিশ্বকাপের আগে এ প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে অনেকের মনে। তাঁদের জন্য রাইজিংবিডি’র বিশেষ আয়োজন ‘‘ফিরে দেখা বিশ্বকাপ’’। ধারাবাহিকভাবে প্রচার করা হবে বিশ্বকাপের আগের ২০টি আসর। আজ প্রকাশ করা হচ্ছে ষষ্ঠ পর্ব।

১৯৫৮ বিশ্বকাপ: আগের বছর সুইজারল্যান্ডে বিশ্বকাপ হওয়ায় এবার ল্যাতিন আমেরিকার দলগুলো স্বাগতিক হওয়ার জোড় দাবি জানায়। কিন্তু বিশ্বকাপ গড়ায় ইউরোপেই। এক বছর ল্যাতিন আমেরিকায় তো দুই বছর ইউরোপে। আর্জেন্টিনা, চিলি, মেক্সিকোর সঙ্গে লড়াই করে স্বাগতিক দল হয় সুইডেন। ৮৬টি দেশের মধ্যে ভোটাভুটি হওয়ার পর জয় তাদেরই। আর ঘরের মাঠে বিশ্বকাপে দারুণ খেলেছিল সুইডেন। কিন্তু ফাইনালে গিয়ে তাদের স্বপ্ন ভাঙ্গে গারিঞ্চার ব্রাজিলের কাছে। এ টুর্নামেন্টেই আবির্ভাব হয় ফুটবলের রাজা পেলের।

আগের বিশ্বকাপের মতো এবারও মূল পর্বে জায়গা পায় ১৬টি দেশ। তবে বাছাই পর্বে লড়াই হয়েছিল মোট ৫৩টি দেশের মধ্যে। এর মধ্যে ইউরোপ থেকে সুযোগ পায় ১২টি দল – পশ্চিম জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেকোশ্লাভাকিয়া, যুগোশ্লাভিয়া, সোভিয়েত ইউনিয়ন, সুইডেন, অস্ট্রিয়া, উত্তর আয়ারল্যান্ড, ওয়েলস ও স্কটল্যান্ড। ল্যাতিন আমেরিকা থেকে আসে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ে। টুর্নামেন্টের অপর দলটি মেক্সিকো। দুই প্রাক্তন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি ও উরুগুয়ে এ বিশ্বকাপের বাছাই পর্ব থেকেই বাদ পড়ে যায়।
 

গ্রুপ পর্ব কিংবা নকআউট পর্ব নিয়ে আগের সব আসরের বিতর্ক থাকলেও ষষ্ঠ বিশ্বকাপে তা থেকে অনেকটাই বেরিয়ে আসে। চারটি গ্রুপে ভাগ করা হয় ১৬টি দলকে। প্রত্যেক গ্রুপে ৪টি করে দল অংশ নেয়। গ্রুপ পর্বে মোট ম্যাচ হয় ২৪টি। চার গ্রুপের গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ও রানার্স আপ দলকে নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় কোয়ার্টার ফাইনাল। এরপর যথারীতি সেমি-ফাইনাল ও ফাইনাল।

ষষ্ঠ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ইউরোপের ক্লাবগুলোর রাজত্ব দেখা যায়। হাঙ্গেরির সেরা খেলোয়াড়দের ছাড়তে রাজী হয়নি দলগুলো। ফলে আগের বিশ্বকাপের টপ ফেবারিট দল হাঙ্গেরি সেবার ভাঙ্গাচোরা দল গড়ে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। আর ২৪ বছর পর বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়ে আর্জেন্টিনাও পারেনি গ্রুপ পর্বের গণ্ডি পেরোতে। তবে শুরু থেকেই দাপট দেখিয়ে বেড়ায় আরেক ফেবারিট ব্রাজিল। গ্যারিঞ্চা, ভাভা, ডিডি, জিটো, বেলিনি, জাগালোর ব্রাজিলের সঙ্গে আলো কাড়েন ১৭ বছর এক তরুণ খেলোয়াড় অ্যাডসন অরান্তেস দো নাসিমেন্তো। সারা বিশ্ব যাকে পেলে নামেই চেনে।
 

মজার ব্যাপার এবার চারটি গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন দল – ব্রাজিল, সুইডেন, পশ্চিম জার্মানি ও ফ্রান্স কোয়ার্টারের গণ্ডি পেরিয়ে সেমি ফাইনাল খেলে। কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়েলসের বিপক্ষে কষ্টার্জিত জয় পায় ব্রাজিল। জয়সূচক একমাত্র গোলটি করেন পেলে। যা ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে কম বয়সে গোল করার রেকর্ড। তবে সেমি ফাইনাল থেকেই যেন অন্য এক ব্রাজিল। আগের ৪ ম্যাচে ৬ গোল দেওয়া দলটি শেষ দুই ম্যাচে দেয় ১০ গোল। সেমিফাইনালে শক্তিশালী ফ্রান্সকে ৫-২ গোলে হারানোর পর ফাইনালে স্বাগতিক সুইডেনকেও ৫-২ গোলে উড়িয়ে দেয় পেলে-গারিঞ্চারা। সেমিফাইনালে হ্যাটট্রিক করেন পেলে। ফাইনালেও করেন জোড়া গোল। ফলে প্রথমবারের মতো শিরোপা উল্লাসে মাতে ফুটবল পাগল দেশটি।

সুইডেনের মোট ১১টি ভেন্যুতে আসরের ৩২টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ফ্রান্স তৃতীয় স্থান পায়। আর আগেরবারের চ্যাম্পিয়ন পশ্চিম জার্মানি হয় চতুর্থ। এ বিশ্বকাপে মোট গোল হয় ১২৬টি। তবে এ বিশ্বকাপেই অবিস্মরণীয় এক রেকর্ড গড়েন ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইন। ১৩টি গোল করে পান সর্বোচ্চ গোলদাতার মর্যাদা। দুইবার হ্যাটট্রিকও করেন তিনি। মাত্র একটি বিশ্বকাপ খেলে ১৩টি গোলের রেকর্ড আজও অম্লান। বর্তমান ফুটবলের ধারাবাহিকতায় সহসা এ রেকর্ড কেউ ভাঙ্গতে পারবেন বলেও মনে হয় না।