বিদ্যুৎখাতের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ

মীর মোহাম্মদ আসলাম উদ্দিন

বিদ্যুৎ শুধু আলো নয় প্রাপ্তি, বিদ্যুৎ শুধু শক্তি নয়-অগ্রযাত্রা। সভ্যতার অগ্রযাত্রার মূলে রয়েছে বিদ্যুৎ। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ মানেই নিরবচ্ছিন্ন উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা-স্বস্তি- প্রগতি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে সামাজিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অবকাঠামো নির্মাণ ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে যে লক্ষণীয় অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে তার মূলে রয়েছে বিদ্যুৎ। ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড একদিকে যেমন বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করেছে সেইসঙ্গে বাড়িয়েছে বিদ্যুতের চাহিদা। সারাদেশে এই চাহিদা ১১% হারে বৃদ্ধি পেলেও ঢাকাসহ দেশের প্রধান প্রধান শহরে ২০% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই সরকারের উপর চাপ বাড়ছে আরও বিদ্যুৎ উৎপাদন করার। ভিশন-২০২১ বা ভিশন-২০৪১ বাস্তবায়ন করতে হলে বিদ্যুতের চাহিদাপূরণ করে আগামীর জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন, বিতরণ ও সঞ্চালনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য মূলতঃ প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর নির্ভরশীল ছিল, ২০০৯ সাল অবধি প্রায় ৯৬ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন গ্যাসনির্ভর ছিল। বর্তমানে গ্যাসের উপর অধিকমাত্রায় নির্ভরশীলতা কমিয়ে কয়লা, তেল ও পারমাণবিক শক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির উপর নির্ভরতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। ২০১৬ সালের প্রস্তাবিত পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যান (পিএসএমপি) এর অধীনে শতকরা ৬০-৭০ ভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে আমদানিকৃত বিদ্যুৎ, কয়লা বা আমদানিকৃত জ্বালানি (এলএনজি) ব্যবহারের ভিত্তিতে।

বাংলাদেশে যে হারে দ্রæত গতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ছে তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে সমান তালে তাল মিলিয়ে বিদ্যুৎ বিতরণ সম্ভব হচ্ছেনা। ফলস্বরূপ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকাসমূহে বিদ্যুৎ (যেমন চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা) সরবরাহ অনেক ক্ষেত্রে বিঘিœত হচ্ছে। ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে দেশব্যাপী বøাকআউটের মত অপ্রত্যাশিত প্রবাহ, বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সিস্টেমের ফ্রিকোয়েন্সি স্বাভাবিক দিনে নিয়মিতভাবে রুটিনমাফিক ৪৮.৯-৫১.২ হার্টজ-এর মধ্যে উঠানামা করে এবং সর্বনিম্ন ৪৮.৭ হার্টজ এবং সর্বোচ্চ ৫১.৫ হার্টজ-এর মধ্যে অবস্থান করে। এটা গ্রিড নির্ভরযোগ্যতার একটি প্রধান বাধা এবং একটি গুরুতর অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ।

বাংলাদেশে বিতরণ লাইনের বর্তমান ক্ষমতা ৪ লক্ষ ২০ হাজার কিলোমিটার এবং সাব-স্টেশনের ক্ষমতা ২০ হাজার এমভিএ। অনস্বীকার্য যে বিগত ৯ বছরে বিদ্যুৎখাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে তবে বর্তমান বন্টন অবকাঠামোর উন্নয়ন, ২০২১ সালের মধ্যে সকলের জন্য যৌক্তিক ও সহনীয় মূল্যে গুণগত, নিখুঁত এবং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত নয়। সরকারের ‘ভিশন ২০২১’ পূরণের জন্য বিপুলসংখ্যক বন্টন লাইন এবং উপকেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে তবে প্রকল্পে অর্থায়ন, বিদ্যমান অবকাঠামোর উন্নয়ন, প্রকল্প বাস্তবায়ন, ওভারহেড বিতরণ ব্যবস্থাকে ভূগর্ভস্থ বিতরণ পদ্ধতিতে রূপান্তর, স্মার্ট গ্রিড এবং প্রি-পেইড মিটারিং সিস্টেম এবং ইআরপি বাস্তবায়ন প্রকৃতই বড়ো চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশে ভ‚মি প্রাপ্যতা তথা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। তাই সে অবকাঠামো নির্মাণ, কয়লা খনির জন্য, তাপ বিদ্যুৎ উৎপাদন, ইউটিলিটি-স্কেল সৌর বিদ্যুৎ বা জলবিদ্যুৎ যাই হোক না কেন, কার্যক্রম বাস্তবায়নে ভূমির প্রয়োজন। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার ঘনত্বের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জমির পরিমাণের ৫৯ শতাংশ কৃষিকাজে ব্যবহৃত হয় এবং ১১ শতাংশ বনভূমি। জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ এখনও গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করে। কাজেই বিদ্যুতখাতে ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত ভূমি প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণে যথাযথ পরিকল্পনার প্রয়োজন।

‘ভিশন ২০২১’ সালের মধ্যে সকলের জন্য গুণগত ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বাংলাদেশের অফ-গ্রিড এলাকায় বিদ্যুতায়ন, যেখানে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এই বাধা অতিক্রম করতে সরকার নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস উন্নয়নের মাধ্যমে অফ-গ্রিড এলাকা তথা গ্রামাঞ্চলে, দূরবর্তী দ্বীপপুঞ্জ এবং পাহাড়ি এলাকাগুলিকে বিদ্যুতায়িত করার উদ্যোগ নিয়েছে।

এবার চ্যালেঞ্জ উত্তরণে কিছু পদক্ষেপের ওপর আলোকপাত করি। প্রাকৃতিক গ্যাসই বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে কিন্তু প্রাকৃতিক গ্যাসের যোগান দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রাথমিক জ্বালানির গুরুত্ব স্বীকার করে বাংলাদেশ সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির মিশ্রণ বহুমুখীকরণে গুরুত্বারোপ করেছে। গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লা, এলএনজি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি ব্যবহার করতে সরকারের একটি পরিকল্পনা রয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকার গ্যাস, কয়লা, এলএনজি, তরল জ্বালানি, দ্বৈত জ্বালানি, পারমাণবিক ও নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস বিবেচনা করে পিএসএমপি ২০১৬ প্রণয়ন করেছে। এছাড়া সরকার প্রতিবেশী দেশগুলো থেকেও বিদ্যুৎ আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে।

গ্রিড ব্যবস্থায় স্থিরতার সম্ভাব্য সহজতম উপায় হচ্ছে ফ্রি গভর্নর কন্ট্রোল সিস্টেমের যথাযথ প্রয়োগ। সিগন্যাল জেনারেশন ইউনিটগুলির সাথে ফ্রি গভর্নর মোড অভ্ অপারেশন (FGMO) এর একটি ট্রায়াল পরিচালিত হয়েছিল যার ফলে সিস্টেমের ফ্রিকোয়েন্সিটিকে উৎসাহজনক ফলাফলের সাথে স্থির করা হয়েছিল। এ ধরনের অতিসাধারণ, সহজ, কার্যকর ব্যবস্থা বাংলাদেশের বিতরণ পদ্ধতিতে বিরাজমান সংকট থেকে পরিত্রাণের সহজতম উপায় হতে পারে এবং আগামী কয়েক দশক ধরে তা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের জনসাধারণের জন্য নির্ভরযোগ্য মানসম্পন্ন ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী বিতরণ নেটওয়ার্ক অপরিহার্য। দেশের শতভাগ জনগোষ্ঠীকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনার পাশাপাশি গ্রাহকসেবা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিতরণ নেটওয়ার্ক বাড়ানোর জন্য একটি সমন্বিত বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এই অসুবিধাগুলো দূর করতে সরকার বিতরণ ব্যবস্থার স¤প্রসারণে নানা কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ওভারহেড সিস্টেমকে আধুনিক ভূগর্ভস্থ সিস্টেমে রূপান্তর, স্মার্ট গ্রিড সিস্টেম এর বাস্তবায়ন, প্রি-পেইড মিটারিং কার্যক্রম বাস্তবায়ন, ওভারলোডেড ট্রান্সফরমারগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন ও প্রতিস্থাপন, বিতরণ লাইন ও সাব-স্টেশনগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও সংস্কারসাধন এবং বিতরণ নেটওয়ার্ক স¤প্রসারণ।

মোদ্দা কথা হলো, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নকে অব্যাহতভাবে এগিয়ে নিতে এর টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ ও একে শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করাতে বিদ্যুৎখাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। একটি সাশ্রয়ী দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ উদ্যোগ দরকার যা ক্লিন এনার্জি, স্মার্ট গ্রিড এবং জ্বালানি দক্ষতা অগ্রাধিকারভিত্তিতে নিশ্চিত করবে। বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে আমদানিকৃত বিদ্যুৎ জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বিদ্যুৎখাতের পরিকল্পনাসমূহ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ শুধুমাত্র একটি স্বপ্নই থাকবে না। এসব কার্যক্রম সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এস.ডি.জি.) অর্জনে সহায়তা করবে এবং বিশ্বব্যাপী উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশকে একটি মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে যেমনটি বাংলাদেশ মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) অর্জন করে দেখিয়েছে। বিদ্যুৎখাতের উন্নয়ন বাংলাদেশকে শুধুমাত্র উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীতই করবেনা বরং একইভাবে দেশের উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করবে। পরিশেষে বলতে হয়, সকলের সহযোগিতায় বিদ্যুৎ বিভাগ ২০২১ সালের মধ্যে দেশের সবার জন্য যৌক্তিক মূল্যে মানসম্মত, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হিসেবে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে বলে আশা করি।