দরজায় কড়া নাড়ছে সিটি নির্বাচন

নিউজ ডেস্ক: নির্বাচন কড়া নাড়ছে খুলনাবাসীর দরজায়। আর বাকি একদিন। তার পরই ভোটাররা ছুটবেন ২৮৯টি ভোটকেন্দ্রে। ১ হাজার ৫৬১টি বুথে গিয়ে দেবেন তাদের রায়। বেছে নেবেন খুলনার পঞ্চম নগর পিতা ও নিজ এলাকার কাউন্সিলরকে। খুলনায় শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় এখন ঘাম ঝরাচ্ছেন প্রার্থীরা। আজ রোববার মধ্যরাতে শেষ হয়ে যাচ্ছে আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা।

নির্বাচনী এলাকার মধ্যে বসবাসকারী বাসিন্দা ও ভোটার ছাড়া সব বহিরাগত গতকাল শনিবার রাত ১২টার মধ্যে শহর ছেড়েছেন। আজ থেকে শহরে নামছে বিজিবির ১৬টি টিম। নির্বাচনের পরদিন পর্যন্ত টহল দেবে তারা। প্রতিটি টিমের সঙ্গে থাকছেন একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।

তবে নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের নানা প্রস্তুতির মধ্যেও বিভিন্ন অজানা শঙ্কা আর ভয় ভর করেছে প্রার্থী ও সাধারণ মানুষের মনে। খুলনায় পুলিশের ভূমিকাকেও ‘অতি বাড়াবাড়ি’ মনে করছেন সুশীল সমাজের কেউ কেউ। খুলনা সিটি নির্বাচনের পাঁচজন মেয়র প্রার্থীর সঙ্গেই গতকাল শনিবার পৃথকভাবে কথা হয়েছে সমকালের। তাদের মধ্যে তিনজনই সুষ্ঠু ভোট নিয়ে নিজেদের সংশয় প্রকাশ করেছেন। কথা হয়েছে কাউন্সিলর প্রার্থীদের সঙ্গেও। সাধারণ ভোটাররা প্রকাশ করেছেন উদ্বেগ। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে পারবেন কিনা- এটা নিয়েই তাদের এ উদ্বেগ। তবে নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার মো. ইউনুচ আলী সমকালকে বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই খুলনায়। সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।’

উৎকণ্ঠায় ভোটার ও প্রার্থী: নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি-না, তা নিয়ে নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করে ১২ নম্বর ওয়ার্ড খালিশপুর হাউজিং বাজার এলাকার জুতা-স্যান্ডেল ব্যবসায়ী মোহসীন আলী বলেন, ‘আপনারা (সাংবাদিক) কি জানেন- নির্বাচন শান্তি মতো হবেনে? মারামারি হবে নানে? পুলিশ দেহি পত্যেক রাত্রিবেলা আইসে এরে-তারে ধইরে‌্য নিয়ে যায়। উরা (পুলিশ) এরাম কত্যিছে ক্যা?’ এই ভোটার বলেন, ‘ইলেকশনের দিন যদি দেহি ভালো (শান্তিপূর্ণ) ভোট হচ্ছে, তালি (তাহলে) ভোট দিতি যাবানে।’

রিটার্নিং অফিসার কার্যালয় থেকে জানা গেছে, মোট ২৮৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে তারা ২৩৪টি ভোটকেন্দ্রকেই ‘গুরুত্বপূর্ণ’ মনে করছে। কোনো ঝুঁকি নেই- সাধারণ এমন ভোটকেন্দ্র মাত্র ৫৫টি।

ভোটারদের মতো অনেক প্রার্থীও রয়েছেন শঙ্কায়। সিটি নির্বাচনে সিপিবির মেয়র প্রার্থী মিজানুর রহমান বাবু বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন এখনও ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। নির্বাচন সুষ্ঠু হবে বলে আমার কাছে মনে হয় না।’

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর মেয়র প্রার্থী মো. মুজ্জাম্মিল হক বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে আমাদের মনে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আছে। কারণ পুলিশের ধরপাকড়-হয়রানি ও ক্ষমতাসীনদের হুমকি-ধামকি রয়েছে।’

তবে ভিন্নমত পোষণ করেন জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী এসএম শফিকুর রহমান মুশফিক- ‘আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক তো বলেছেনই, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। আমার কাছেও সে রকম মনে হয়।’

শঙ্কা রয়েছে অনেক কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যেও। ২১ নং ওয়ার্ডে বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী মোল্লা ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘পুলিশ আমার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করছে। আর আওয়ামী লীগের লোকজন আমার কর্মীদের হুমকি-ধাকি দিচ্ছে। এমনকি আমাকে নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ারও হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’

২৩ নং ওয়ার্ডের স্বতন্ত্র কাউন্সিলর প্রার্থী ও বর্তমান কাউন্সিলর ইমাম হাসান চৌধুরী ময়না উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘একজন কাউন্সিলর প্রার্থীর লোকজন ভোটারদের বলে বেড়াচ্ছে- ভোটকেন্দ্রে এবার গোলমাল হবে। সে কারণে আমার সমর্থক ভোটারদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।’

তবে প্রার্থীদের এসব উদ্বেগ বিষয়ে আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী এসএম কামাল হোসেন বলেন, ‘উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কিছু নেই। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে। আমরা ভোটারদের সেভাবে আশ্বস্ত করছি।’

খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ইউনুচ আলী বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য যা যা করা দরকার, তার সবকিছুই করা হয়েছে।’

অবাধ নির্বাচনের দাবিতে মানববন্ধন: অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের দাবিতে মানববন্ধন করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে সুজনের জেলা সম্পাদক অ্যাডভোকেট কুদরত ই খুদা বলেন, নির্বাচনের শেষ সময়ে এসে প্রধান ২ মেয়র প্রার্থী একে অপরকে উদ্দেশ করে আক্রমণাত্মক কথা বলছেন। এর ফলে উত্তাপ ছড়িয়েছে। আমরা নির্বাচন কমিশনের যে ধরনের ভূমিকা আশা করেছিলাম, তারা তা পালন করতে পারেনি। আমরা চাই ভোটাররা যেন নিরুদ্বেগ পরিবেশে ভোট দিতে পারে।

বিএনপির প্রেস ব্রিফিং: বিএনপির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু সকাল ৮টায় তার মিয়াপাড়া এলাকার বাসভবনে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে অভিযোগ করেন, পুলিশ শুক্রবার বিকেল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বিএনপির সহস্রাধিক নেতাকর্মীর বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে। এ সময় মহানগর বিএনপির দফতর সম্পাদক মহিবুজ্জামান কচি ও জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আশরাফুল আলম নান্নুসহ ২১ জনকে গ্রেফতার করেছে। পুলিশ আমাদের কর্মীদের ভোটার স্লিপ বিলি বন্ধ করে দিয়েছে। সে কারণে পুলিশের ওপর আমাদের আস্থা নেই।

মেয়র প্রার্থী বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ২৪ নং ওয়ার্ড বিএনপির কার্যালয় ভাংচুর এবং ২৬ নং ওয়ার্ড কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। তারা আমাদের নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ছাড়ার জন্য হুমকি দিচ্ছে।

আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী: আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক সকালে নগরীর লবণচরা, জিন্নাহপাড়াসহ ৩১ নং ওয়ার্ড এলাকায় গণসংযোগ করেন। গণসংযোগের ফাঁকে ফাঁকে সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকেই বিএনপি প্রার্থী নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না বলে আসছেন। প্রতিদিন একই কথায় কেউ এখন আর গুরুত্ব দেয় না। নতুন কিছু থাকলে হয়তো মানুষ তা নিয়ে চিন্তা করে। তাদের কোনো লোককে আমাদের দলের কর্মীরা নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা দেয়নি। বরং তাদেরই নির্বাচনী প্রচারণায় আগ্রহ কম।

ইভিএম অনুশীলন: নগরীর সোনাপোতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং পিটিআই ভোটকেন্দ্রে ভোট নেওয়া হবে ইভিএম পদ্ধতিতে। শনিবার এ দুটি কেন্দ্রে ইভিএমের অনুশীলন করা হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম সচিব আবদুল বাতেন। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ সহজেই ইভিএমে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। তারা কোনো সমস্যা অনুভব করছে না।

আবহাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা: গত কয়েক দিন ধরে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত প্রচণ্ড গরম অনুভূত হচ্ছে নগরীতে। এর পর প্রতি বিকেল কিংবা সন্ধ্যায় হচ্ছে ঝড়-বৃষ্টি। ১৫ মে নির্বাচনের দিন আবহাওয়া কেমন থাকবে, তা নিয়েও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।

অবশ্য এ ব্যাপারে রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ইউনুচ আলী সমকালকে জানান, ঝড়-বৃষ্টি ঠেকানোর কোনো উপায় নেই। তবে ঝড়-বৃষ্টিতে যাতে ভোট গ্রহণ বা গণনা কার্যক্রম বিঘ্নিত না হয়, সে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

যানবাহন সংকটে কাউন্সিলর প্রার্থীরা: নির্বাচনের দিন যানবাহন নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কাউন্সিলর প্রার্থীরা। ১৪ মে রাত ১২টা থেকে শহরে সব ধরনের যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। ভোটের দিন এক কেন্দ্র থেকে কীভাবে অন্য কেন্দ্রে যাবেন, তা নিয়েই দুশ্চিন্তা তাদের। গতকাল শনিবার রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে ফোনে ও নিজে এসে তারা এ উদ্বেগের কথা জানান।

বৈধ অস্ত্র জমা নেওয়া হয়নি: ২০১৩ সালের সিটি নির্বাচনে বৈধ অস্ত্রও জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। সে অনুযায়ী থানায় অস্ত্র জমা দিয়েছিলেন লাইসেন্সধারীরা। কিন্তু এবার বৈধ অস্ত্র জমা দেওয়ার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তবে গত ৯ মে থেকে বৈধ অস্ত্র প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।