যেসব কারণে ইরানের পরমাণু চুক্তি থেকে সরলেন ট্রাম্প

সুমন দত্ত

পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে আসায় বিশ্ব রাজনীতিতে শুরু হয়েছে এক অন্য ধরনের অস্থিরতা। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ৫ স্থায়ী সদস্য ও জার্মানি মিলে ইরানের সঙ্গে এই পরমাণু সমঝোতা চুক্তি করেছিল। এখন চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র বেরিয়ে যাওয়ায় বাকীদের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপড়েন শুরু হয়েছে ইরান ও বাকী দেশগুলোর। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা শেষে এই চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল।

মধ্যপ্রাচ্যে স্বার্থের সংঘাত থেকে এই অবস্থার সৃষ্টি। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হয় ইসরায়েল ও সৌদি আরবকে কেন্দ্র করে। আর এ দুটি দেশ ঘোর ইরান বিরোধী হওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে হলো। তাছাড়া প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল ইরানের এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার। ওবামা সরকারের কোনো কিছুকেই মান্যতা দেবে না ট্রাম্প সরকার। এমনটাই জানা গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়। ওবামা কেয়ার বাতিল, মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল, কানাডার সঙ্গে নাফটা বাতিল, ন্যাটোকে বিনা পয়সায় সামরিক সাহায্য দেয়া হবে না। এসব ছিল ট্রাম্পের এজেন্ডায়। এগুলোর সবগুলো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বার কয়েক হোঁচট খেয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। একে একে হোয়াইট হাউস থেকে বিদায় নিয়েছেন ট্রাম্পের সকল মন্ত্রী। এসেছে নতুন প্রশাসন। আর এই প্রশাসন হচ্ছে সেই জর্জ বুশ আমলের প্রশাসনের কুশীলবরা। ট্রাম্প এখন নিজের গদি বাচাতে জর্জ বুশের পলিসি হাতে নিয়েছে। রিপাবলিকানদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখার জন্য এসব কাজ করা হচ্ছে। যাতে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা যায়। যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরান ও রাশিয়ার মুখোমুখি হতে চাচ্ছে। এতে অন্যদের কি হলো তার পরোয়া করে না যুক্তরাষ্ট্র। আর এটা প্রমাণ করতেই ইরানের পরমাণু চুক্তি থেকে সরে আসা। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে যদি পরমাণু বোমা বানানোর লাইসেন্স দেয়া হয় তবে আগামীতে সৌদি আরবকে দিতে হবে। এরপর সৌদি আরবের দেখাদেখি কুয়েত, সংযুক্ত আমিরাতের মত দেশগুলো পরমাণু বোমা রাখতে চাইবে। আর এতে হুমকির মুখে পড়বে ইসরায়েলের নিরাপত্তা। যেকোনো সময় এই পরমাণু বোমা ইসরায়েলের ওপর এসে পড়তে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এমন একটি শক্তি যাকে ভয় পায় ইসরায়েল ও সৌদি আরব। সম্প্রতি সৌদি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে ইয়েমেনে শিয়া ভিত্তিক জঙ্গি হুতিদের ক্ষমতা দখলে। সৌদি আরবকে ঘিরে থাকা বাহরাইন, ওমানেও শিয়াদের উত্থান ঠেকানো যাচ্ছে না। সৌদি বাদশাহ তাই নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য বিপুল সামরিক অস্ত্র কিনছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে। এক হিসেবে দেখা গেছে এবার অস্ত্র কেনায় ভারতকে টপকে গেছে সৌদি আরব। সম্প্রতি সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজ দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে পরমাণু বোমা রাখার ঘোষণা দেয়। তাছাড়া ইরানের মত সৌদি আরবও পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির ঘোষণা দেয়। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে তারা চুক্তি করে। অন্যদিকে ইরানের সবকয়টি পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির কাজ পায় রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোম্পানি ইরানে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানানো কাজ পায়নি। আর এটাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল ক্ষতি। আজ সৌদি আরবের মত ইরান যদি পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর হাতে তুলে দিত। তবে এ নিয়ে কোনো কথাই ছিল না।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেছে। ইরানের সঙ্গে যেসব দেশের জ্বালানি তেলের ব্যবসা রয়েছে তারা ক্ষতির মুখে পড়েছে। ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলে কেউ ডলার দিয়ে জ্বালানি তেল কিনতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আসতে পারে বড় বাধা। তখন অন্য মুদ্রার ওপর গিয়ে পড়বে চাপ। তাতে অস্থিতিশীল হতে পারে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজার। ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় একটি আসাদ বিরোধী ফ্রন্ট খুলতে চাচ্ছে। আর তাতে সাহায্য করবে সৌদি আরব ও ইসরায়েল। ইতিমধ্যে কাজটি শুরু হয়ে গিয়েছে। আগামী দিনে এটি আরো পরিষ্কার হবে। যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানকে কাবু করার জন্য যত ধরনের চেষ্টা আছে তা চালিয়ে যাবে। এতে যদি সামনে রাশিয়া এসে যায় তাতে কোনো অসুবিধা নেই।একটা ভুয়ো যুদ্ধ খেলা খেলে ট্রাম্প নিজেকে রাশিয়া বিরোধী দেখানোর চেষ্টা করবে। যেটা দ্বিতীয় মেয়াদে তাকে প্রেসিডেন্ট হতে সহায়তা করবে। এতে নিজের স্বার্থ ও সবার স্বার্থই পূরণ হলো।

লেখক: সাংবাদিক