কাগজে-কলমে কর্মসম্পাদন চুক্তি শতভাগ বাস্তবায়ন

নিউজ ডেস্ক: মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সঙ্গে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি অনুযায়ী বেশ কিছু মন্ত্রণালয় ও বিভাগ দাবি করেছে, তারা উন্নয়নমূলক কাজ শতভাগ বাস্তবায়ন করেছে। তবে সংশ্নিষ্টরা বলছেন, কাগজে-কলমে কর্মসম্পাদন চুক্তি শতভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে বলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে জানানো হলেও বাস্তবে অনেক গরমিল রয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত তিন বছরে কোনো কোনো মন্ত্রণালয় ও বিভাগ বার্ষিক কর্মসম্পাদন বাস্তবায়ন সম্পর্কে ঘুরেফিরে একই তথ্য দিচ্ছে। কারও কারও অগ্রগতি শতভাগ, কারও গড়ে সর্বোচ্চ ৯৮ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন অগ্রগতি ৭৩ শতাংশ। এ হিসাবে গড়ে অগ্রগতি ৯১ শতাংশ। তবে সংশ্নিষ্টরা বলছেন, আমাদের দেশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজে যে গয়ংগচ্ছ ভাব, তাতে ৯০ শতাংশের বেশি কাজ বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগও বাস্তবায়নের এই হার কার্যত বিশ্বাস করেনি। এ কারণে সম্প্রতি কর্মসম্পাদন চুক্তি বাস্তবায়নের সঠিক পরিসংখ্যান চেয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো কোনো মন্ত্রণালয় যথাযথ সাড়া দিচ্ছে না বলে জানা গেছে। এরপরও আগামী ৪ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সঙ্গে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ২০১৮-১৯ সালের বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি হবে।

প্রতি বছর কোন মন্ত্রণালয় কতটুকু উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন করবে তা নিয়ে ২০১৪ সালে প্রথমবার সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সঙ্গে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি করে। সে অনুযায়ী, প্রতি বছরের অগ্রগতি ও বাস্তবায়নের হারের তথ্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে জানানোর কথা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের (সমন্বয় ও সংস্কার) সচিব এন এম জিয়াউল আলম সমকালকে বলেন, দেশের উন্নয়নের স্বার্থে সরকার এ কর্মপরিকল্পনা করেছে, যাতে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দ্রুত কাজগুলো সম্পন্ন করেন। বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি করা মানে টার্গেট বেঁধে দেওয়া। এখন মন্ত্রণালয়গুলোতে কোনো উন্নয়নমূলক কাজের ফাইল আগের মতো পড়ে থাকে না।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৪ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সঙ্গে প্রথমবারের মতো বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি সই করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এতে ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ, সব অধিদপ্তর, ৮ বিভাগীয় কমিশনার, ৬৪টি জেলা প্রশাসন এবং ৪৯১টি উপজেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি হয়।

চুক্তির উদ্দেশ্য হচ্ছে- স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি, সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং উন্নয়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো।

জানা গেছে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের পাশাপাশি এর অধীন দপ্তর ও সংস্থাগুলোর সঙ্গেও এই চুক্তি করে। ২০১৬-১৭ অর্থবছর নিয়ে তৃতীয়বারের মতো বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি স্বাক্ষর হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সিনিয়র সচিব এবং সচিবরা নিজ নিজ মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও বিভাগের পক্ষে এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো স্থানীয় সরকার বিভাগের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়, বিগত তিন বছরে সারাদেশে গ্রাম এলাকায় ১৬ হাজার ৩ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ, ৩০ হাজার ৭০০ কিলোমিটার রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণ এবং ৯৩ হাজার ৬০০ মিটার ব্রিজ/কালভার্ট করা হয়েছে।

গ্রামীণ এলাকার ব্যবসা উন্নয়নের জন্য ৫২৩টি গ্রোথ সেন্টার উন্নয়ন, হাটবাজার উন্নয়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষাকল্পে ২২৫টি ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলের জন্য ২ হাজার ৪৭০ কিলোমিটার রাস্তা ও ফুটপাত নির্মাণ এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য ৫৪০ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে ৫৫০টি ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন।

এ ছাড়া চলতি অর্থবছরে স্থানীয় সরকার বিভাগ মন্ত্রণালয়ের অর্জনে বলা হয়, ৫ হাজার ৩০০ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক পাকাকরণ, ১০ হাজার ৩০০ কিলোমিটার পাকা সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ এবং ৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটার ব্রিজ/কালভার্ট নির্মাণ ও মেরামত, ৮২টি ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নির্মাণ, ৫৫টি উপজেলা ভবন এবং ১৮০টি হাট-বাজার উন্নয়ন ও ১০০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ২৮ হাজার ২৯৭ জন জনপ্রতিনিধি, কর্মকর্তা ও সহায়ক জনবলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

তবে দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, পৌরসভা এবং ইউনিয়নে এখনও হাজার হাজার কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক কাঁচা এবং বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে। সেগুলো মেরামত বা পাকা করা হচ্ছে না। জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, যেসব জেলা, উপজেলা, পৌরসভা এবং ইউনিয়নে বিরোধী দল বিএনপির প্রতিনিধি রয়েছেন সেসব এলাকার রাস্তার অবস্থা বেহাল। তারপরও স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চিঠিতে ৯৬ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে জনসাধারণের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া একটি অন্যতম অঙ্গীকার ছিল। এ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির টার্গেট প্রায় শতভাগ অর্জনের পথে।

এ ছাড়া শতভাগ উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন হয়েছে বলে দাবি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, শিল্প মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, সেতু বিভাগ, তথ্য মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, আইন ও বিচার বিভাগ এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়।

অন্যদিকে কোনো কোনো মন্ত্রণালয় ও বিভাগ বছরে খাতা-কলমে ৯০-৯৪ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে বলে দেখিয়েছে। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, বাস্তবে হয়তো খুব কম মন্ত্রণালয় ও বিভাগই এতটা কাজ বাস্তবায়ন করতে পেরেছে।