বাংলাদেশের মহাকাশ জয়

মো. আব্দুল লতিফ বকসী

গল্প নয় সত্যি। স্যাটেলাইট জগতে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ। মহাকাশে যাচ্ছে বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। কিছুদিন আগেও যা ছিল স্বপ্ন। আজ তা বাস্তবতা। সময় এসেছে এ স্যাটেলাইট সুবিধা গ্রহণ করার। এতোদিন আমরা স্যাটেলাইট ভাড়া করে দেশের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করেছি। আজ আমরা নিজের চাহিদা পূরণ করে অন্যদেশের ব্যবহারকারীদের কাছে বিক্রয় বা ভাড়া দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করছি। ইতোমধ্যে পৃথিবীর ৫৬টি দেশ মহাকাশে স্যাটেলাইটের অধিকারী হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ হচ্ছে ৫৭তম। বাংলাদেশ এখন আর পিছিয়ে নেই। এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে।

স্যাটেলাইটটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে উৎক্ষেপণ করা হবে। স্যাটেলাইটটিতে মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার রয়েছে। ২০টি ট্রান্সপন্ডার দিয়ে আমাদের দেশের চাহিদা পূরণ করা হবে। বাকি ২০টি ট্রান্সপন্ডার ভাড়া দেওয়া হবে। এতে আয়ও হবে বেশ। এ মুহুর্তে বাংলাদেশ প্রায় ১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ভাড়া প্রদান করে স্যাটেলাইট সুবিধা গ্রহণ করছে। ৪০টি ট্রান্সপন্ডারের দ্বারা কিউ-ব্যান্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপাইন কমিউনিকেশন স্যাটেলাইটটির সুবিধা ভোগ করার সুযোগ পাবে। অপরদিকে সি-ব্যান্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মায়ানমার, ভুটান, নেপাল, শ্রীলংকা, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান এবং কাজাকিস্তানের কিছু অংশে এ স্যাটেলাইটের সুবিধা দেয়া সম্ভব হবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুদূরপ্রসারী চিন্তার ফলশ্রুতিতে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টেলিকম ইউনিয়ন (International Telecom Union (ITU) এর সদস্যপদ লাভ করে। ১৯৭৫ সালের জুন মাসে বেতবুনিয়া উপগ্রহ ভূ-কেন্দ্র উদ্বোধনের মাধ্যমে তিনি বহির্বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের উন্নত টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার সূচনা করেন। তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা “ডিজিটাল বাংলাদেশ” এর রূপকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসাবে মহাশূন্যে বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের লক্ষ্য স্থির করেন। ২০০৯ সালের মে মাসে বিটিআরসি’র একজন কমিশনারকে আহ্বায়ক করে সরকার একটি স্যাটেলাইট কমিটি গঠন করে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের প্রস্তুতিমূলক কার্যাদি শুরু করা হয়। পরে ২০১৩ সালের ৩১ মার্চ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় মহাকাশে অরবিটাল স্নটের জন্য আইটিইউ (ITU) তে আবেদন দাখিল করা হয়। ইন্টারস্পুটনিক থেকে ১১৯ দশমিক ১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ অরবিটাল স্নট লিজ গ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে স্যাটেলাইট নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ফ্রান্সের থ্যালেস এলেনিয়া স্পেস (Thales Alenia Space France) এর সাথে ১১ নভেম্বর ২০১৫ তারিখে স্যাটেলাইট নির্মাণ ও উৎক্ষেপণের জন্য চুক্তি স্বাক্ষর সম্পন্নের মধ্য দিয়ে প্রকল্পের মূল কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ২৭৬৫.৬৬ কোটি টাকা, এর মধ্যে থ্যালেস এর চুক্তি মূল্য প্রায় ১৯০৮.৭৫ কোটি টাকা।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এর উপদেশ ও পরামর্শক্রমে চলমান বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ প্রকল্পের সফল সমাপ্তির দিকে শুধু দেশবাসীই নয়, উন্নত বিশে^র কারিগরি বিশেষজ্ঞরাও অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় কেপ ক্যানাভেরাল উৎক্ষেপণকেন্দ্র থেকে বিশ^খ্যাত প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স (SpaceX) এর ফ্যালকন নাইন স্পেস ক্রাফ্ট(Falcon 9 Space Craft) দিয়ে ৩৭০০ কেজি ওজনের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মহাশূন্যে উৎক্ষেপিত হবে এবং ১৫ বছরের অধিক সময় মহাশূন্যে থেকে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিয়ে যাবে। এই পুরো সময়ে স্যাটেলাইটটির কার্যক্রম বাংলাদেশের গাজীপুর (প্রাইমারি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র) ও বেতবুনিয়া (সেকেন্ডারি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র) থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ সুবিধার ব্যাপক প্রসার ঘটবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো – সমগ্র বাংলাদেশের স্থল ও জলসীমায় নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচারের নিশ্চয়তা, বর্তমানে বিদেশি স্যাটেলাইটের ভাড়া বাবদ প্রদেয় বার্ষিক ১৪ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয়, ট্রান্সপন্ডার লিজের মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয়, টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার সেবার পাশাপাশি টেলিমেডিসিন, ই-লার্নিং, ই-এডুকেশন, ডিটিএইচ প্রভৃতি সেবা প্রদান, প্রাকৃতিক দুর্যোগে টেরিস্ট্রিয়াল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে সারাদেশে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ সুবিধা প্রদান, স্যাটেলাইটের বিভিন্ন সেবার লাইসেন্স ফি ও স্পেকট্রাম চার্জ বাবদ সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, স্যাটেলাইট টেকনোলজি ও সেবার প্রসারের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি।

বাংলাদেশ সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন এর মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন কেন্দ্র (স্পারসো) বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। এতে খরচ হচ্ছে ৩ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা। এতে রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের ১ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। বাকি ১ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ থেকে আসবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিম ব্যাংক, ফ্রান্সের এইচএসবিসি, জাপান ব্যাংক অভ ইন্টারন্যাশনাল, সিডব্লিউজি গাল্ফ ইন্টারন্যাশনাল অভ ইউকে, চায়না গ্রেট ওয়াল ইন্ডাষ্ট্রি করপোরেশন এ প্রকল্পে ঋণের মাধ্যমে অর্থ যোগান দিচ্ছে।

মহাকাশ থেকে অত্যাধুনিক যোগাযোগ সুবিধা স্থাপনের উদ্দেশ্যেই এ কৃত্রিম উপগ্রহটি পাঠানো হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিদেশের স্যাটেলাইট ভাড়া নিয়ে নিজের দেশের প্রয়োজনীয় কাজ পরিচালনা করছে। দি থ্যালেস এলেনিয়া স্পেস অফ ফ্রান্স, বাংলাদেশের স্যাটেলাইটটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে। আগামী ১৫ বছর এ কৃত্রিম উপগ্রহটি মহাকাশে কার্যকর থাকবে। তবে প্রয়োজনীয় সংস্কার করে এটি আরো তিন বছর পরিচালনা করা সম্ভব হবে। ১ হাজার ৬০০ ওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এ স্যাটেলাইটটির ওজন হচ্ছে ৩.৫ মেট্রিক টন। এ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইটটি কক্ষপথে স্থাপন হতে সময় লাগবে ৮ দিন।

বাংলাদেশ প্রথমবারের মত কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠাচ্ছে মহাকাশে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ কৃত্রিম উপগ্রহটির নির্মাণ সম্পন্ন করে উৎক্ষেপণের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় প্রেরণ করা হয়েছে। গত ৩০ মার্চ এ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইটটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছে উৎক্ষেপণকারী কর্তৃপক্ষ। উৎক্ষেপণের জন্য এখন প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলছে। স্যাটেলাইটটির নির্মাণকাজ কয়েক মাস আগেই সম্পন্ন হয়। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের এটি একটি বিশাল অর্জন। সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে মহাকাশে যাচ্ছে বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট। বাংলাদেশ এখন এ স্যাটেলাইটের সুবিধা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের মানুষ।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিশাল কর্মযজ্ঞ যাদের মেধা ও নিরলস পরিশ্রমে সফল হয়েছে জাতি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদমুক্ত বাংলাদেশ আজ বিশ্বের উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশের মানুষ আজ গর্ববোধ করছে স্যাটেলাইটের অধিকারী হবার জন্য। সবার প্রত্যাশা স্যাটেলাইটের সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা দেশের মানুষ উপভোগ করতে পারবে নির্বিঘ্নে। আমাদের স্যাটেলাইটের যাত্রা শুভ হোক। শুভহোক বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা।