অগ্নিযুগের বিপ্লবী জননেতা রবি নিয়োগীর জন্মবার্ষিকী

নিউজ ডেস্ক: অগ্নিযুগের বিপ্লবী জননেতা রবি নিয়োগীর ১০৯ তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি । রবি নিয়োগীঃ-ময়মনসিংহ,জামালপুর,শেরপুরঃ-২৯ এপ্রিল, ১৯০৯ – ১০ মে, ২০০২ ।

আজ আজীবন বিপ্লবী উপমহাদেশের প্রখ্যাত বিপ্লবী,অগ্নি যুগের সিংহপুরুষ, আন্দামান ফেরৎ জননেতা,বৃটিশ শাসন বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামী, বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক কমরেড রবি নিয়োগীর ১০৯ তম জন্মবার্ষিকী ।

পূর্ণনাম রবীন্দ্র নাথ নিয়োগী।রবি নিয়োগীর পিতা রমেশ চন্দ্র নিয়োগী ও মাতা সুরবালা নিয়োগী কংগ্রেস রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।শেরপুর জেলা সদরের গৃদানারায়ণপুর (পুরাতন গরুহাটী) এলাকার এক সম্পন্ন গৃহস্থ পরিবারে তাঁর জন্ম।

রবি নিয়োগীর শিক্ষা জীবনের শুরু শেরপুর ভিক্টোরিয়া একাডেমিতে, পরে শেরপুর গোবিন্দ কুমার পিস মেমোরিয়াল হাইস্কুল থেকে ১৯২৬ সালে ম্যাট্রিক পাস করে ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজে আইএ ক্লাসে ভর্তি হন। ১৯২৭ সালে ঐ কলেজের ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের এক সংঘর্ষের ফলে রবি নিয়োগীসহ কিছু সংখ্যক ছাত্র কলেজ থেকে বহিস্কৃত হয়। এরপর তিনি কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে ভর্তি হন। সেখানে অধ্যয়নকালেই তিনি বিপ্লবী যুগান্তর দলের সান্নিধ্যে আসেন। ১৯২৯ সালে তিনি আই. এ পাস করেন। ১৯৩০ সালে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ময়মনসিংহে সংঘটিত সত্যাগ্রহ আন্দোলনে রবি নিয়োগী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ঐ আন্দোলনের সময় রবি নিয়োগীসহ ১৭ জন রাজনৈতিক কর্মী গ্রেফতার হন। ১৯৩০ সালে মাস্টার’দা সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের অব্যবহিত পরে ময়মনসিংহে যুগান্তর দলের যে কয়জন নেতা কর্মীকে গ্রেফতার করা হয় রবি নিয়োগী ছিলেন তাঁদের একজন।

১৯৩১ সালে শেরপুরের ঝিনাইগাতি এলাকায় সালদার জমিদার বাড়িতে যুগান্তর দলের হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে রবি নিয়োগীর সাত বছর কারাদন্ড হয়। তাঁকে প্রথম রাজশাহী জেলে আটক রাখা হয়, এবং পরে একজন বিপজ্জনক বন্দী হিসেবে আন্দামান সেলুলার জেলে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তিনি সাড়ে পাঁচ বছর বন্দীজীবন যাপন করেন। আন্দামান জেলে আটক থাকা অবস্থায়ই রবি নিয়োগী কয়েকজন বিপ্লবীর সাথে সাম্যবাদে দীক্ষিত হন। ১৯৩৭ সালে গঠিত অবিভক্ত বাংলার প্রথম সংসদীয় সরকারের আমলে মুক্তি পেয়ে ময়মনসিংহে ফিরে এসে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন।

রবি নিয়োগী চল্লিশের দশকে বৃহত্তর ময়মনসিংহে কৃষক আন্দোলন ও কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করেন।তিনি ১৯৪৩ সালে নালিতাবাড়িতে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক কৃষক সম্মেলনের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন। ১৯৪৫ সালের ৫-৯ এপ্রিল ময়মনসিংহ জেলা কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে নেত্রকোণায় যে সর্বভারতীয় কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় রবি নিয়োগী ছিলেন তারও অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি -১৯৫৭ সালে ন্যাপ গঠিত হলে ন্যাপ, এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ন্যাপ ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম নেতা ছিলেন।

জামালপুর জেলা ন্যাপের সভাপতি ছিলেন রবি নিয়োগী আর আমার পিতা ক্ষিতীশ তালুকদার ছিলেন সাধারন সম্পাদক।তিনি আমাদের পরিবারের ঘনিষ্টজন ছিলেন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার শুরুতেই তেভাগা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার কারণে ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত তিনি একটানা পাঁচ বছর কারাভোগ করেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রচার কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে এবং পুলিশ ধর্মঘটে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৯৫৫ সালে গ্রেফতার হন তিনি। কিন্তু একই বছর খাদ্য আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে পুনরায় আটক হন। ছাড়া পান ১৯৫৬ সালে। ১৯৫৮ সাল থেকে আইয়ুব খান ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত রবি নিয়োগীকে কারাগারে আটক রাখে। পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ শুরু হলে ১৯৬৫ সালে বন্দি করা হয়। একই বছরের শেষ দিকে তিনি ছাড়া পেলেও পরে আবার গ্রেফতার হয়ে যানএবং ছাড়া পান ১৯৬৯ সালে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী রবি নিয়োগীকে গ্রেফতার করে। এ সময় তিনি দু’বছরের বেশী সময় কারান্তরালে ছিলেন।

১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকারের আমলেও তাঁকে কারাবন্দী করা হয় ।

১৯৯১ সালের ২৫-২৮ ফেব্রুয়ারি ভারতের মুম্বাই নগরীতে অনুষ্ঠিত জীবিত আন্দামান বন্দীদের যে সম্মাননা প্রদান করা হয় তাতে বাংলাদেশ থেকে আমন্ত্রিত হয়ে রবি নিয়োগী অংশগ্রহণ করেন।

রবি নিয়োগী লেখক হিসেবেও অবদান রাখেন। রাজনীতি বিষয়ে তাঁর রচিত নিবন্ধের মধ্যে রয়েছে একাত্তরের বিজয়গাঁথা:শেরপুর,শেরপুরের ইতিহাসে মুসলিম অবদান এবং তেভাগা আন্দোলন,সংগ্রাম ও ভবিষ্যৎ।

রবি নিয়োগী বিক্রমপুরের যোগেশ মুজমদারের কন্যা জ্যোৎস্না রানী নিয়োগীকে বিয়ে করেন।সহধর্মিনী জ্যোৎস্না নিয়োগী ছিলেন এদেশের শুধু নারী মুক্তি , শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের মুক্তির আন্দোলনেরও এক অসামান্য অগ্রসৈনিক। তাঁর জীবনের প্রায় বারো বছর কেটেছে জেল ও আত্মগোপনে।

রবি নিয়োগী তাঁর বিরানব্বই বছরের জীবনে ৩৪ বছর জেলে কাটিয়েছেন। পাকিস্তান আমলে চব্বিশ বছরের মধ্যে ২০ বছর তিনি জেলেই ছিলেন। আত্মগোপনে কেটেছে আরো প্রায় দুই যুগ।