এলএনজি নিয়ে নতুন স্বপ্ন শিল্প খাতে

নিউজ ডেস্ক: অবশেষে মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটায় মহেশখালী উপকূলে বহু কাঙ্ক্ষিত এলএনজিসহ গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ জাহাজটি এসে পৌঁছেছে। এটা আসলে একটি টার্মিনাল। আমদানি করা এলএনজি বা তরল প্রাকৃতিক গ্যাস রূপান্তর করে প্রাকৃতিক গ্যাসে পরিণত করা হবে। পাইপলাইনের মাধ্যমে তা সারাদেশে সরবরাহ করা হবে। এটা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুখবর। গ্যাসের ঘাটতি অনেকাংশেই পূরণ হবে। তবে গ্যাসের দাম দিতে হবে বেশি। তবে জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী বীরবিক্রম নিশ্চিত করেছেন, সহনীয় হারে গ্যাসের দাম বাড়ানো হবে।

চট্টগ্রামে অবস্থানরত রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির (আরপিজিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. কামরুজ্জামান জানান, মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ জাহাজটি বঙ্গোপসাগরের টার্মিনালের জন্য নির্ধারিত স্থানে এসে পৌঁছেছে। ২৯ এপ্রিল জ্বালানি বিভাগের একটি প্রতিনিধি দল চট্টগ্রাম যাবে। তারা গ্রাহক পর্যায়ে এলএনজি সরবরাহের আনুষ্ঠানিক তারিখ ঘোষণা করবেন। আগামী মাসের মাঝামাঝি গ্রাহকরা আমদানি করা এই গ্যাস ব্যবহার করতে পারবেন। বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা ৩৫০ কোটি ঘনফুট। সরবরাহ করা হয় ২৭০ কোটি ঘনফুট। ৮০ কোটি ঘনফুট ঘাটতি। মহেশখালীতে মে মাস থেকেই পাওয়ার কথা ৫০ কোটি ঘনফুট, ৩০ কোটি ঘনফুট ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এ বছরের শেষ দিকে আরও ৫০ কোটি ঘনফুট আমদানি করা হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে সংযোগের অপেক্ষায় থাকা শিল্প উদ্যোক্তারা নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। অনেক শিল্পমালিক কারখানার যন্ত্রপাতি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছেন। বিদ্যুতেও গ্যাস সরবরাহ বাড়বে। গ্যাসের দাম ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) প্রস্তাবনা পাঠিয়েছে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো। এলএনজি আমদানি প্রক্রিয়ার তত্ত্বাবধানকারী রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি আরপিজিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরুজ্জামান বলেন, এলএনজি দিয়ে প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রামের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের চাহিদা মেটানো হবে। পরে ঢাকাসহ দেশের অন্য অঞ্চলে এই গ্যাস দেওয়া হবে।

দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহের জন্য চুক্তি হলেও অবকাঠামোগত ঘাটতির কারণে প্রাথমিক পর্যায়ে ২৫ থেকে ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হবে জাতীয় গ্রিডে। এখন চট্টগ্রামের গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৩০ কোটি ঘনফুট। সরবরাহ করা হয় ২০ কোটি ঘনফুট। এলএনজি আমদানিকে ঘিরে নতুন কারখানায় গ্যাস সংযোগ দেওয়া শুরু করেছে চট্টগ্রাম অঞ্চলের গ্যাস বিতরণ কোম্পানি কর্ণফুলী। তারা ২৬৫টি নতুন কারখানার ডিমান্ড নোট ইস্যু করেছে। ৭১টি প্রয়োজনীয় অর্থ পরিশোধ করেছে। আরও ৩৫৬টি শিল্পের আবেদন অনুমোদনের জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সব মিলিয়ে চলতি বছরের শেষ নাগাদ চট্টগ্রামের চাহিদা ৪৫ কোটি ঘনফুটে পৌঁছাবে বলে আশা করছে কর্ণফুলী কর্তৃপক্ষ। কর্ণফুলীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী মো. আল মামুন বলেন, এলএনজি এলে চট্টগ্রামের গ্যাসের ঘাটতি দূর হবে। নতুন নতুন কারখানায় গ্যাস দেওয়া সম্ভব হবে।

প্রথম পর্যায়ে এলএনজি চট্টগ্রাম অঞ্চলে দেওয়া হবে। পরে পাইপলাইন নির্মাণ শেষ হলে তা ঢাকাসহ দেশের অন্য অঞ্চলেও দেওয়া হবে। কারণ, এখন জাতীয় গ্রিড থেকে গড়ে ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস চট্টগ্রামে দেওয়া হচ্ছে। এলএনজি আসার ফলে চট্টগ্রামে দেশি গ্যাসের সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হবে। দেশি গ্যাস বাখরাবাদ ও তিতাস বিতরণ কোম্পানির নেটওয়ার্কে দেওয়া হবে। জানতে চাইলে তিতাস গ্যাস কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মসিউর রহমান বলেন, এলএনজি না পেলেও তার সুবিধা পাব আমরা। এখন যে গ্যাস কর্ণফুলীকে দেওয়া হচ্ছে, এলএনজি আসার পর তার একটি বড় অংশ তিতাসকে দেওয়া হবে। কিছু অংশ পাবে বাখরাবাদও। ফলে ঢাকার, বিশেষ করে গাজীপুর-সাভারের শিল্পের গ্যাস সংকট অনেকটাই কেটে যাবে। সুবিধা ভোগ করবেন কুমিল্লার গ্রাহকরাও।

চট্টগ্রামের বাইরে এলএনজি সরবরাহের জন্য আনোয়ারা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত ৪২ ইঞ্চি ব্যাসের ৩০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পাইপলাইন ও ৩৬ ইঞ্চি ব্যাসের ১৮১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের চট্টগ্রাম-ফেনী-বাখরাবাদ সঞ্চালন লাইন প্রকল্পের কাজ চলছে। আগামী সেপ্টেম্বরে এ প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হতে পারে। তখন চট্টগ্রামের বাইরে এলএনজি দেওয়া যাবে।

দেশের পাইপলাইনে সরবরাহ করা প্রাকৃতিক গ্যাস আর এলএনজি দুটোই একই পদার্থ। পরিবহনের সুবিধার জন্য প্রাকৃতিক গ্যাসকে তরল করা হয়, এটি এলএনজি নামে পরিচিত। মাইনাস ১৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় প্রাকৃতিক গ্যাসকে তরল করে এলএনজিতে রূপান্তর করা হয়। তরল গ্যাস বিশেষভাবে নির্মিত জাহাজে করে আমদানি করা হয়। পরে উচ্চ তাপে আবার তা গ্যাসে পরিণত করে পাইপলাইনে সরবরাহ করা হয়। তখন এটিকে ‘রিগ্যাসিফাইড এলএনজি’ বা আরএলএনজি বলে। এলএনজিকে আবার গ্যাসে রূপান্তর করতে দুই ধরনের টার্মিনাল রয়েছে। একটি সমুদ্রে ভাসমান (এফএসআরইউ), অন্যটি স্থলভিত্তিক টার্মিনাল।

দেশের প্রথম এলএনজি টার্মিনালটি হচ্ছে ভাসমান। মহেশখালী দ্বীপের কাছে গভীর সমুদ্রে এই টার্মিনাল অবস্থান করবে। ওই স্থানে সাগরের গড় গভীরতা ৩২ থেকে ৩৫ মিটার। টার্মিনাল থেকে স্থলভাগের পাইপলাইনে গ্যাস দিতে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে ২৪ ইঞ্চি ব্যাসের ৭ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছে। সংযোগ পয়েন্টটি মহেশখালীর কোয়ানক ইউনিয়নের ঘটিভাঙায়।

এই জাহাজটিতে এলএনজি আছে এক লাখ ৩৮ হাজার ঘনমিটার বা ২৯০ কোটি ঘনফুট। এখান থেকে দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুট করে গ্যাস গ্রিডে দেওয়ার কথা। এলএনজি আমদানি করা হবে মূলত কাতার থেকে। এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় অংশ নিতে পাঁচটি টাগ বোট দেশে এসেছে। এর দুটি জ্বালানি ও লোকবল পরিবহনে ব্যবহূত হবে। আর তিনটি এলএনজি ভেসেলকে এলএনজি টার্মিনাল পর্যন্ত নিরাপদে পৌঁছাতে কাজ করবে।

চুক্তি অনুসারে জাহাজের মালিক এক্সিলারেটকে বছরে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা দিতে হবে। এ ছাড়া সব ধরনের কর পেট্রোবাংলা পরিশোধ করবে। টার্মিনাল পর্যন্ত এলএনজি আনার দায়িত্ব পালন করবে পেট্রোবাংলা।

শিল্পে আশার আলো : গ্যাসের ঘাটতির কারণে ২০১০ সালের পর শিল্পে গ্যাস সংযোগ সংকুচিত করা হয়। এ সময় অনেক শিল্প উদ্যোক্তা কারখানা স্থাপন করে গ্যাস সংযোগের আবেদন করলেও সংযোগ মেলেনি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে কারখানা বসিয়ে রেখে তাদের ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে। অনেকেই নতুন বিনিয়োগ করেননি। এলএনজি আমদানি ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি করেছে।

জাতীয় গ্রিডে এলএনজি যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন গ্যাস বিতরণ কোম্পানির অধীনে আবেদন জমা থাকা দুই হাজার ৩৯০টি শিল্পকারখানায় নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে। সরকার ধাপে ধাপে মে থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যে এসব কারখানায় নতুন গ্যাস সংযোগ দেবে।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, কুতুবদিয়া ও পায়রায় আরও একাধিক স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কাতার ছাড়াও সুইজারল্যান্ড, ওমান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গেও এলএনজি আনতে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। সরকার ২০২৪ সালের মধ্যে দিনে ৪০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস আমদানির পরিকল্পনা করেছে।