মৃত্যুদণ্ড বাস্তবায়নে ফাঁসির বিকল্প খুঁজছে ভারতের আদালত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ফাঁসিতে মৃত্যু শুধু যন্ত্রণাদায়ক নয়, অমানবিকও বটে। তাই ফাঁসির বিকল্প কোনো উপায় ভেবে দেখতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন উচ্চ আদালত।

অপরাধী যাতে অপেক্ষাকৃত কম যন্ত্রণায় ও শান্তিতে মরতে পারেন এ জন্য পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করে ইঞ্জেকশন দিয়ে, চোখ বেঁধে গুলি করে, ইলেকট্রিক শক দিয়ে বা বিষাক্ত গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে মারা যেতে পারে।

ভারতের সুপ্রিমকোর্ট এমন পরামর্শ দিয়ে বলছেন, ভারতীয় সংবিধান খুবই সংবেদনশীল এবং মৃত্যুকালে জীবনের মর্যাদা রক্ষার স্বপক্ষে। বর্তমান যুগে বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতি হয়েছে৷ তার মধ্যে থেকেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার অন্য উপায় খতিয়ে দেখা উচিত।

ভারতীয় ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৩৫৪ (৫) ধারা অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত অপরাধীর গলায় দড়ি পরিয়ে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ঝুলিয়ে রাখা অসাংবিধানিক এবং অবৈধ। এ মর্মেই সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি বেঞ্চ নোটিশ জারি করেছেন এবং সরকার ও আইনসভাকে এর বিকল্প উপায় ভেবে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন।

উত্তরে কেন্দ্রীয় সরকার আদালতে এক হলফনামা পেশ করে বলেছেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে ফাঁসিটাই সব থেকে প্রচলিত পদ্ধতি। প্রায় ১০০ বছর ধরে এ পদ্ধতি চলে আসছে ভারতে। স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত ১৪১৫ জন অপরাধীর ফাঁসি হয়েছে। ভারতে সর্বশেষ ২০১৫ সালে নাগপুর জেলে ফাঁসি দেয়া হয়েছে ইয়াকুব মেমনকে। ‘৯৩ সালে মুম্বাই বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত ছিলেন তিনি।

ফাঁসি কার্যকরের সময় মেমনের নিকটজনদের জেলে ঢুকতে দেয়া হয়নি। উপস্থিত ছিলেন শুধু জল্লাদ, একজন ম্যাজিস্ট্রেট, একজন ডাক্তার এবং জেলের দু-একজন কর্মী। ভারত ছাড়াও বাংলাদেশ, পাকিস্তান, জাপান, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ৫৮ দেশে ফাঁসি দেয়ার প্রথা রয়েছে।

তবে চীন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামসহ সাত দেশে ফাঁসির জায়গায় মারণ ইঞ্জেকশন দেয়ার প্রচলন রয়েছে। এ ছাড়া সৌদি আরবে আছে সরাসরি মুণ্ডচ্ছেদপ্রথা৷ তবে বিশ্বে এমন বহু দেশও আছে যেখানে মৃত্যুদণ্ডই নেই। এ ব্যাপারে ভারতের সুশীল সমাজের প্রতিনিধি অধ্যাপক দীপঙ্কর দাসগুপ্ত ফাঁসির বিপক্ষে মত দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ফাঁসিটাকে আমি আলাদাভাবে দেখি না। পুরো মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপারটাই বিরোধী আমি। তা সে ফাঁসি হোক বা ইলেকট্রিক শক হোক। আমি মনে করি না যে সমাজের মৃত্যুদণ্ড দেয়ার অধিকার আছে। অপরাধী হয়তো অন্যের প্রাণ নিয়েছে। আর সে জন্য বলা হচ্ছে তোমারও প্রাণ নেয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, ফাঁসির পর যদি কোনো কারণে মনে হয় ফাঁসি দেয়াটা ঠিক হয়নি, তা হলে প্রাণটা তো আর ফিরিয়ে দেয়া যাবে না। সেই লোকটির যেমন অন্যের প্রাণ নেয়ার অধিকার নেই, তেমনি সমাজেরও কারোর প্রাণ নেয়ার অধিকার নেই।

এক্ষেত্রে যে কোনো উপায়ে মৃত্যৃদণ্ড দেয়ার বিরোধী অধ্যাপক দাসগুপ্ত। তিনি বলেন, মারণ ইঞ্জেকশন দিয়ে হোক বা অন্য পদ্ধতিতে হোক, মোটকথা- ক্যাপিটাল পানিশমেন্টেরই পক্ষপাতী নই আমি।

এই অধ্যাপক আরও বলেন, এক ব্যক্তি যত ঘৃণ্য অপরাধই করে থাকুক না কেন, সমাজের মূলস্রোতে তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য সমাজকেই সুযোগ দিতে হবে৷ এমন ঘটনা বিরল নয়, যেখানে এক সময়ের খুনি নিজেকে শুধরে নিয়েছে।

আইনজীবী ঋষি মালহোত্রার এক জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট আবেদনকে ঘিরেই ভারতরজুড়ে ফাঁসি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। শীর্ষ আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জনস্বার্থ মামলায় বলা হয়, বর্তমানে ফাঁসির মতো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুধু বর্বরোচিতই নয়, অমানবিক ও নিষ্ঠুরও।

ভারতের সংবিধানের ২১নং অনুচ্ছেদে (জীবনের অধিকার) আছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদেরও মর্যাদার সঙ্গে মরার অধিকার স্বীকৃত সেখানে। ফাঁসি দেয়া জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের প্রস্তাবের পরিপন্থী। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, মৃত্যুদণ্ড অবশ্যই কার্যকর করা হবে। তবে যতটা সম্ভব কম যন্ত্রণাদায়কভাবে।

আইন কমিশনের বিভিন্ন রিপোর্টেও একই কথা বলা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার অন্য যেসব পদ্ধতি আছে, ভারতের তা গ্রহণ করা উচিত। অনেক দেশে ফাঁসির বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক শক, মারণ ইঞ্জেকশন কিংবা গুলি করার পদ্ধতি চালু আছে। অবশ্য গুলি করে মারার প্রথা সাধারণত সামরিক বাহিনীতেই বেশি চালু।

যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে ফাঁসি দেয়ার প্রথা তুলে দিয়ে মারণ ইঞ্জেকশন দেয়া হচ্ছে। এতে ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যেই অপরাধী মারা যায়। এটাকেই সবচেয়ে সভ্য পদ্ধতি বলে ক্রমশই গ্রহণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া বৈদ্যুতিক শক বা গুলি করেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছে কিছু দেশে।

ফাঁসির নিষ্ঠুরতার এক নিখুঁত বর্ণনা দিয়ে বিচারপতি ভাগবতী বলেন, ফাঁসির মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হয় ফাঁসি দেয়ার একদিন আগে থেকে, যখন অপরাধীর দেহের ওজন নিয়ে দেখা হয় ফাঁসির কূপের কতটা নিচে দেহটা পড়লে দড়ির বাঁধনের ঝটকায় গলাটা ভেঙে যাবে। এ জন্য ঘাড়ের মাপও নেয়া হয়। দড়িটা এমন শক্ত ও মসৃণভাবে তৈরি করা হয় যাতে ফাঁসটা ঝট করে গলায় আটকে যায়। ১০ থেকে ১৫ মিনিট ঝুলন্ত থাকার পর ডাক্তার গিয়ে পরীক্ষা করে তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

সূত্র: ডয়চে ভেলে