সংসদ সদস্যরা সিটি নির্বাচনে প্রচারের সুযোগ পাচ্ছেন

 

নিউজ ডেস্ক : সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সময় সংসদ সদস্যরা নির্বাচনী এলাকায় অবস্থান করাসহ নির্বাচনী প্রচারের সুযোগ পেতে যাচ্ছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এই বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে এটি কার্যকর হলে সবার জন্য সমান সুযোগ থাকবে না বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা।

বর্তমান সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী সরকারি সুবিধাভোগী অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা তফসিলের পর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রচারে অংশ নিতে পারেন না। তারা কেবল ভোট দেওয়ার জন্য কেন্দ্রে যেতে পারেন। অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা হলেন প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, মন্ত্রী, চিফ হুইপ, ডেপুটি স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা, বিরোধীদলীয় উপনেতা, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ, উপমন্ত্রী, সাংসদ এবং সিটি কর্পোরেশনের মেয়র।

১২ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধিদল ইসির সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠকে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সময় সাংসদদের নির্বাচনী এলাকায় যাওয়ার সুযোগ দিয়ে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন আচরণ বিধিমালা সংশোধনের দাবি জানানো হয়। এর এক সপ্তাহের মাথায় বৃহস্পতিবার আচরণ বিধিমালা সংশোধন নিয়ে বৈঠক করে নির্বাচন কমিশন। বৈঠকের কার্যপত্রেও এইচ টি ইমামের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদলের দাবির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

বৈঠক শেষে ইসি সচিবালয়ের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, সিটি কর্পোরেশন বড় এলাকা। এখানে সংসদ সদস্যরা বসবাস করে থাকেন। নির্বাচনের তফসিল হওয়ার পর তাদের যাওয়া-আসাটা অনেকটা বন্ধ হয়ে যায়। আইনে বলা আছে, শুধু ভোটের দিন ভোট দিতে পারবেন। অন্য সময় যেতে পারবেন না। সংসদ সদস্যদের কোনো কার্যালয় নেই, তারা সরকারি গাড়িও ব্যবহার করেন না। তিনি বলেন, সংসদ সদস্য সুবিধাভোগী অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কি না-এগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানমের নেতৃত্বে আইন ও বিধিমালা সংস্কার কমিটিকে এ বিষয়টি পর্যালোচনা করে যত দ্রুত সম্ভব প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এরপর তা কমিশনে উপস্থাপন করা হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, সিটি নির্বাচনের সময় সংসদ সদস্যদের এলাকায় যাওয়ার বিষয়টি কমিশন ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে।

ইসির একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ২০০৯ সালে বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সাংসদদের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন কমিশন সাংসদদের নির্বাচনী প্রচারের বাইরে রাখার বিষয়টি বিধিমালায় যুক্ত করে। এখন ইসি আবার সাংসদদের সেই সুবিধা দিতে যাচ্ছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সাংসদেরা প্রচারের সুযোগ পেলে তার প্রভাব হবে ভয়াবহ। তিনি বলেন, সাংসদেরা নিজ এলাকায় প্রচণ্ড প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী। তারা প্রচারের সুযোগ পেলে সবার জন্য সমান সুযোগের লেশমাত্র থাকবে না।

আওয়ামী লীগের চাপে ইসি এই উদ্যোগ নিয়েছে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব হেলালুদ্দীন বলেন, চাপে নয়, যেকোনো রাজনৈতিক দল ইসির অংশীজন। পরামর্শ ও আলাপ-আলোচনা করে তাদের সুবিধা-অসুবিধাগুলো ইসি বিবেচনা করে।

তবে আওয়ামী লীগের দাবি নিয়ে তড়িঘড়ি কমিশন সভা করা হলেও বিএনপির দাবি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। ১৭ এপ্রিল বিএনপিও দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে ছয় দফা দাবি দিয়েছিল ইসির কাছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসি সচিব বলেন, বিএনপির দাবির বিষয়ে কমিশন সভা করার সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। হয়তো পরে হতে পারে। গতকালের বৈঠকেও এ নিয়ে আলোচনা হয়নি।

খুলনা ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়েছে গত ৩১ মার্চ। আগামী ১৫ মে নির্বাচন। এর মধ্যে আচরণ বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ প্রসঙ্গে সচিব হেলালুদ্দীন বলেন, ‘আচরণবিধি মাঝেমধ্যে আপডেট করা লাগে। আগে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হতো না, এখন দলীয় প্রতীকে হচ্ছে। তখন একধরনের প্রেক্ষাপট, এখন আরেক ধরনের প্রেক্ষাপট। তাই এমপিরা যাতে এলাকায় যেতে পারেন, সে জন্য আলোচনা হয়েছে’।

সচিব বলেন, প্রস্তাবটি বিবেচনা করা হচ্ছে। খুলনা ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে এটি কার্যকর হতেও পারে, না-ও হতে পারে।

শুধু সিটি কর্পোরেশন এলাকার বাসিন্দা সাংসদেরা নির্বাচনী এলাকায় যেতে পারবেন, নাকি যেকোনো সাংসদ যেতে পারবেন-জানতে চাইলে হেলালুদ্দীন বলেন, এগুলো বিবেচনা করে কমিটি প্রতিবেদন দেবে।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এই সময়ে বিধিমালা সংশোধন করা হলে তা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। দুটি সিটি নির্বাচনের তফসিল হওয়ার পর এটি করা হলে মনে হবে কাউকে সুবিধা দেওয়ার জন্য এটি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সাংসদেরা স্থানীয় নির্বাচনে প্রচারের সুযোগ পেলে ভারসাম্য থাকে না। এটা হতে পারে যে, সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দা সাংসদেরা শুধু তার সিটিতে নির্বাচনে প্রচারে অংশ নিতে পারবেন, বাইরের সাংসদেরা নন।
প্রসঙ্গ খুলনা সিটি
খুলনায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী একে অপরের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন। নির্বাচন কমিশন তাদের হলফনামায় দেওয়া তথ্য যাচাই করবে কি না-জানতে চাইলে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন বলেন, হলফনামায় দেওয়া তথ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ ইসির থাকে না।

তবে ইসি সচিবের এই বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করেন সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, ভুল তথ্য দিলে প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করার বিধান আছে। যদি ইসি যাচাই-বাছাই না করে, তাহলে তারা কীভাবে বুঝবে যে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে। এটা অবশ্যই যাচাই করা দরকার এবং ইসির সে সুযোগ আছে।

গাজীপুর নিয়ে আলোচনা
গাজীপুরের এসপি হারুন অর রশীদকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিল বিএনপি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন বলেন, বিএনপির অভিযোগ ঢালাও। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না দেওয়া হলে একজন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।

ইসির একজন কর্মকর্তা জানান, বৈঠকে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সরকারি দলের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে আলোচনা হয়। একজন কমিশনার প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের বিষয়টি তুলে ধরেন। পরে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করে দেখার সিদ্ধান্ত হয়।