আমরা প্রতিমুহূর্তে নিঃশ্বাসে টানছি বিষ

 

স্বাস্থ্য ডেস্ক : ‘চোখে দেখা যায় না, না থাকলে চলে না’ সেটা কী? হ্যাঁ সেটা হল বাতাস বা বায়ু। বিশুদ্ধ বায়ুকে পরিবেশের আত্মা হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। বায়ুতে সাধারণত ২১ ভাগ অক্সিজেন, ৭৮ ভাগ নাইট্রোজেন, ০.০৩১ ভাগ কার্বন ডাই-অক্সাইড, একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে ওজোন, হাইড্রোজেন ইত্যাদি থাকে।

যদি কোনো কারণে বাতাসে অক্সিজেনের ঘাটতি হয়ে অন্যান্য গ্যাসের ঘনত্ব বেড়ে যায় অথবা বালিকণার ভাগ বেড়ে যায় তবে তাকে দূষিত বায়ু বলা হয়ে থাকে। বাংলাদেশে বায়ু দূষণের পিছনে প্রধানত দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, কলকারখানার ধোঁয়া এবং দ্বিতীয়ত, যানবাহনের ধোঁয়া। সার কারখানা, চিনি, কাগজ, পাট এবং টেক্সটাইল মিল, ট্যানারিজ, গার্মেন্ট, কেমিক্যাল ও ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে প্রচুর পরিমাণে ধোঁয়া নির্গত হয়।

বাতাসে ভাসছে বিষ। রাজধানীবাসীর প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেয়ারও কোনো সুযোগ নেই। কারণ নিঃশ্বাস নিলে নিঃশ্বাসের সঙ্গে বিষ ঢুকে যায়! আসলেই বর্তমানে ঢাকার বাতাসে বিষই উড়ে বেড়াচ্ছে। এ বিষের উৎস হল- গাড়ি, আশপাশের শিল্পাঞ্চল, ইটভাটা ও নাগরিক বর্জ্য। ইদানীং প্রচুর পরিমাণ সিএনজিচালিত গাড়ি চলাচল করছে। এসব সিএনজিচালিত গাড়ি থেকে বের হয় ক্ষতিকারক বেনজিন।

আর এই বেনজিনের কারণে ঢাকায় ক্যান্সারের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে বহুলাংশে। এছাড়া সালফার ও সিসাযুক্ত পেট্রল ব্যবহার, জ্বালানি তেলে ভেজাল ও ক্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিনের কারণে এসব গাড়ির ধোঁয়ার সঙ্গে কার্বন-ডাই অক্সাইড, কার্বন-মনোক্সাইড, নাইট্রোজেনের অক্সাইড, সালফার-ডাই অক্সাইড, অ্যালডিহাইডসহ সিসা নিঃসারিত হয়ে বাতাসকে দূষিত করছে।

ঢাকার বিভিন্ন স্থানের সঙ্গে অন্য স্থানের ভালো যোগাযোগের জন্য সরকার নির্মাণ করছে বিভিন্ন রাস্তা, ফ্লাইওভার। কিন্তু নির্মাণ কাজে ব্যবহার করা বালু, সিমেন্ট ফেলে রাখা হচ্ছে রাস্তার পাশে। আবার নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও অনেক নির্মাণ কাজ শেষ না হওয়ায় ধুলাবালির পরিমাণ বেড়েছে অনেক গুণ। বিশাল অঞ্চলজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ করা হচ্ছে অনেক দিন ধরে এবং তা বিভিন্নভাবে চারিদিকে ছড়িয়ে সৃষ্টি করছে প্রকট ধুলা দূষণ।

মারাত্মক বায়ু দূষণের কারণে ঢাকা শহরের মানুষ প্রতিনিয়ত অ্যাজমা (হাঁপানি), ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি রোগ (COPD) এবং ফুসফুসের ক্যান্সারসহ মারাত্মক ক্রনিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

কীভাবে বায়ু দূষণের কারণে হাঁপানি হয় : হাঁপানি ফুসফুসে বারবার হয়ে চলা একটি প্রদাহজনিত অবস্থা, যাতে কিছু উদ্দীপক শ্বাসনালিতে প্রদাহের সৃষ্টি করে সাময়িকভাবে সরু করে দেয়, ফলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।

রাস্তাঘাটে প্রতিনিয়ত যে ধুলা উড়ছে, তা হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের প্রধান উদ্রেককারী। ধুলাবালি মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে শ্বাসযন্ত্রে প্রবেশ করে শ্বাসকষ্টের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। শহরে দূষিত বায়ুর কারণে এ ধরনের রোগীর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফ্রি র‌্যাডিক্যাল দেহ কোষরাজির ক্ষতি করে।

দূষিত বায়ু ফুসফুসে ঢোকার পর সেখানে ফ্রি রেডিক্যালের সৃষ্টি হতে পারে। দেখা গেছে শ্বাসতন্ত্রের অসুখ সৃষ্টিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে এসব ফ্রি র‌্যাডিক্যাল।

কীভাবে বায়ু দূষণের কারণে COPD হয়

বৈশ্বয়িক উষ্ণতা, জলবায়ু পরিবর্তন, ক্রমবর্ধমান পরিবেশ দূষণ এবং মানুষের অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অসংক্রমণ ব্যাধি। ফুসফুসের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ রোগ, যাতে ভুগছে এ দেশের লক্ষ মানুষ, তা থেকে যাচ্ছে পর্দার অন্তরালে। ইংরেজিতে রোগটির নাম Chronic obstructive pulmonary disease (COPD) যার বাংলা করলে দাঁড়ায় ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী শ্বাস রোধক রোগ।

এটি ফুসফুসের এমন একটি রোগ যার ফলে শ্বাসপ্রশ্বাস বাধাগ্রস্ত হয় এবং রোগী শ্বাসকষ্টে ভোগেন। এটি chronic obstructive lung disease (COLD), chronic obstructive airway disease (COAD), chronic airflwo limitation (CAL), Ges chronic obstructive respiratory disease (CORD) নামেও পরিচিত।

ফুসফুসের শ্বাস রোধক প্রক্রিয়াটি ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং তা মূলত হয়ে থাকে দূষিত শ্বাস গ্রহণের কারণে, ফুসফুসে সৃষ্ট প্রদাহের জন্য। এই প্রদাহের কারণে ফুসফুস দু’ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়-

প্রথমত, ফুসফুসের ছোট ছোট শ্বাসনালীর ভিতরের দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, স্থায়ীভাবে সংকুচিত হয় এবং সেখানে অতিরিক্ত শ্লেষা তৈরি হয়ে বায়ু রোধক প্রক্রিয়াটি বাড়িয়ে দেয়।

দ্বিতীয়ত, ফুসফুসের বায়ু কুঠুরির অস্বাভাবিক প্রদাহের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে এর সংকোচন-প্রসারণ ক্ষমতা নষ্ট হয় এবং রক্তে অক্সিজেনের প্রবাহ কমে যায়।

কীভাবে বায়ু দূষণের কারণে ফুসফুসের ক্যান্সার হয়

বাতাসে কার্বন মনোঅক্সাইড ও সালফারডাই অক্সাইডের আধিক্য দিনে দিনে মানুষের ফুসফুসের প্রদাহ বাড়ছে। দূষিত বায়ু ফুসফুসে ঢোকার পর সেখানে ফ্রি রেডিক্যালের সৃষ্টি হতে পারে। দেখা গেছে ফুসফুসের ক্যান্সার সৃষ্টিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে এসব ফ্রি র‌্যাডিক্যাল।

বায়ু দূষণের বিরূপ প্রতিক্রিয়া ঠেকাতে সহায়তা করে ভিটামিন সি

ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল-মূল বা শাক-সবজি খেলে বায়ু দূষণের বিরূপ প্রতিক্রিয়া ঠেকানো যায়। যারা ফুসফুসের জটিল রোগে ভুগছেন তাদের ক্ষেত্রে এ কথা বিশেষভাবে প্রযোজ্য। লন্ডন হাসপাতালের একটি গবেষণায় এ বিষয়টি উঠে এসেছে।

গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন, হাঁপানি এবং ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডি নামের রোগে যারা ভুগছেন তাদের রক্তে ভিটামিন সি’র মাত্রা কমে গেলে বায়ুতে দূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার সময় শ্বাসকষ্টে ভোগার ঝুঁকি বাড়ে।

লেবু, আমলকী, পেয়ারা, জাম্বুরা, আনারস, আমড়া, আম, আঙ্গুর, কাঁচা মরিচ, জলপাই, বড়ই, কামরাঙা, টমেটো, বাঁধাকপি, কমলালেবু ইত্যাদি ভিটামিন-সি’র গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এসবই সহজলভ্য এবং তুলনামূলক সস্তা।

এছাড়া ভিটামিন সি আমাদের দেহে লৌহ বা আয়রন শোষণে সাহায্য করে। মাছ বা গোশত অর্থাৎ আমিষ জাতীয় খাবার খাওয়ার সময় সঙ্গে লেবু খেলে দেহের লৌহ শোষণ ক্ষমতা বাড়ে।

লেখক : বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ, ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ২/১ রিং রোড, শ্যামলী, ঢাকা।