বিপদ না বাড়িয়ে আপদ তাড়াতে হবে

বিভুরঞ্জন সরকার: ‘অন্তরে অতৃপ্তি রবে, সাঙ্গ করি মনে হবে , শেষ হইয়াও হইলো না শেষ’।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার এই চরণটি মনে পড়ল কোটা সংস্কার আন্দোলনের সর্বশেষ অবস্থা দেখে। আন্দোলন আপাতত শেষ হলো বলে মনে হলেও প্রকৃত অর্থে শেষ হয়নি। এর রেশ-পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আরো চলবে। কোটা না থাকার ঘোষণা দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে উত্তেজনা প্রশমিত করা হলেও ‘কোটা’ বা বিশেষ ব্যবস্থায় পিছিয়ে পড়া বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য চাকরির সুযোগ একেবারে বাতিল করাটা সংবিধানের চেতনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হবে না। তাই কোটা না থাকলে কীভাবে ‘সমতা’র নীতি কার্যকর হবে সেটা সরকারকে নির্ধারণ করতে হবে এবং সেটা যত তাড়াতাড়ি করা হবে ততই মঙ্গল।

কিছুটা আকস্মিকভাবেই কোটা সংস্কারের আন্দোলন গতিবেগ পায়। ছড়িয়ে পড়ে প্রায় সারা দেশে। এই দাবি আদায় হলে তার কি লাভ সেটা না বুঝে অথবা ভুল বুঝে অনেকে এই আন্দোলনে শামিল হয়েছে বলে আমার মনে হয়। অনেকটা সেই গুঁড়ো দুধের বিজ্ঞাপনের মতো আমি তো এমনি এমনি খাই।

আন্দোলনটাকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ দেয়ার একটা চেষ্টা দ্রুতই লক্ষ করা যায়। লন্ডন থেকে তারেক রহমানের তৎপর হয়ে ওঠা তার বড় প্রমাণ। এ ছাড়াও আমাদের দেশে কিছু রাজনৈতিক দল ও নেতা আছেন যারা সব সময় রুটি ভাজার জন্য গরম তাওয়া খুঁজতে থাকেন। তাদের নিজেদের ঘরে চুলো বা তাওয়া নেই অর্থাৎ নিজেদের ক্ষমতায় কিছু করার সাধ্য নেই। তাদের কাঁধ আছে, জোয়াল নেই। জোয়াল দেখলেই কাঁধ বাড়িয়ে দেন। কোটা সংস্কারের আন্দোলন তাদের সামনে একটি মোক্ষম সুযোগ এনে দেয়। তারা মাঠে নেমে পড়েন।

বিষয়টি বুঝতে সরকার প্রধান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভবত একটু সময় লাগে। তিনি প্রথমে হয়তো ভেবেছিলেন একটু সময় নিয়ে পুরো বিষয়টা খতিয়ে দেখে তারপর ব্যবস্থা নেবেন। সে জন্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বসে একটি সময়সীমাও নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু কোটা সংস্কারের আন্দোলনকে সরকার পতনের আন্দোলন বানানোর পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামা পার্টিগুলো তাতে প্রমাদ গোনে। পরিস্থিতি জটিল করার পরিকল্পনা থেকেই তারা প্রধানমন্ত্রীর মুখে ঘোষণা শুনতে চান। প্রধানমন্ত্রীর কাছে তখন হয়তো বিষয়টি পরিষ্কার হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই তিনি আন্দোলনের আগুনে পানি ঢেলে দেন সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের ঘোষণা দিয়ে। আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রীকে ‘মাদার অব এডুকেশন’ ঘোষণা দিয়ে আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করেন।

এখন বলা হচ্ছে, চাওয়া হয়েছে সংস্কার। প্রধানমন্ত্রী পুরো পদ্ধতিটি বাতিল করলেন কেন? প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় সবচেয়ে অখুশি হাতে ময়দা নিয়ে বের হওয়া মতলবাজরা। তাদের যে রুটি সেঁকা হলো না। আবার এটাও মনে রাখতে হবে যে, কোটা রাখা না রাখার বিতর্ক খুব সহজে কিন্তু মিটবে না। সরকারকে, বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে উদ্যোগী হয়েই কোটা বিষয়ক জটিলতা নিরসন করতে হবে।

দুই.
কোটা সংস্কারের আন্দোলন যেভাবে ফুঁসে উঠছিল, বিস্তার লাভ করছিল, দেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কেউ কেউ যেভাবে আন্দোলনরত তরুণদের আবেগের প্রতি সম্মান দেখাতে শুরু করেছিলেন তাতে মনে হচ্ছিল এই আন্দোলনটার জন্যই বুঝি জাতি এতদিন অপেক্ষায় ছিল। এই আন্দোলনের সফল পরিণতির ওপরই যেন জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছিল। সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির সংস্কারের দাবির ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু বিষয়টিকে যেভাবে সামনে আনা হলো, এর পক্ষে যে রকম প্রচার-প্রচারণা চলল বা চলছে তাতে মনে হওয়াই স্বাভাবিক যে, এই কোটা ব্যবস্থার পরিবর্তন হলেই বুঝি দেশের সব মেধাবী এবং বেকাররা চাকরি পাবেন। দেশে আর বেকার সমস্যা থাকবে না। যত নষ্টের গোড়া হলো এই কোটা ব্যবস্থা।

আমরা অনেকেই আমাদের সন্তানদের যুক্তিহীন উন্মাদনার পথে ঠেলে দিলাম, পথ অবরোধ করে মানুষের স্বাভাবিক চলাচলে বিঘ্ন তৈরি করাতে দোষের কিছু দেখলাম না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে ঘৃণ্য হামলার নিন্দা করলাম না পুলিশি বাড়াবাড়ির অজুহাত সামনে এনে। পুলিশ যেহেতু ছাত্রদের ওপর টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করেছে, তার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় ছাত্ররা একটু ভাঙচুর করেছে, এটা তেমন দোষের কিছু নয় এমন কথাও বলা হয়েছে। ভিসির বাড়িতে হামলা না হলে সরকার কি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসত- এমন প্রশ্ন তুলে হামলার ন্যায্যতা প্রমাণের চেষ্টাও লক্ষ করা গেছে। দাবি মানতে সরকারকে বাধ্য করতে হলে শান্তিপূর্ণ পথ কার্যকর নয় বলেও বেশ ধীমান বলে পরিচিত কাউকে কাউকে বলতে শুনলাম, লিখতে দেখলাম। বিষয়গুলো আমার কাছে কেমন যেন বেখাপ্পা লাগছে।

ধরে নিলাম কোটা ব্যবস্থায় গলদ আছে, ত্রুটি আছে। তাই বলে এটা কি আমাদের তরুণদের ‘জীবনমরণ’ সমস্যা হতে পারে? সরকারি চাকরিতে যে পরিমাণ পদ খালি হয় তার চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি শিক্ষার্থী প্রতি বছর পাস করে বের হয়। কোটা ব্যবস্থা না থাকলেও তো সবার সরকারি চাকরি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয় না। কোনো একটি হুজুক তুলে শিক্ষার্থীদের পথে নামিয়ে, তাদের তারুণ্যের আবেগের প্রতি সম্মান জানানোর এই প্রবণতার পরিণাম কি আমরা একটু ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখছি? আমার তো মনে হয় আন্দোলনের এই স্টাইলটা ভবিষ্যতে যে কোনো আন্দোলনের সময়ই ব্যবহার করা হতে পারে।

তিন.
আমার ব্যক্তিগত ধারণা কোটা সংস্কারের আন্দোলন জনপ্রিয় হয়েছে যতটা না কোটা ইস্যুতে তার চেয়ে সরকার বিরোধিতার ইস্যুতেই বেশি। বিভিন্ন কারণে সরকার এবং সরকার সমর্থকদের বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। সরকার এবং আওয়ামী লীগ হাইকমান্ডকে কোটা আন্দোলনের পোস্টমর্টেম করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে তো ছাত্রলীগের একচ্ছত্র আধিপত্য। ছাত্রদল, শিবিরতো হল ছাড়া। তাহলে কীভাবে কোটা আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল? ছাত্রলীগ কী করল? এটা কি প্রমাণ হলো না যে, ছাত্রলীগ আর সরকার বা আওয়ামী লীগকে কোনো ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে না, বরং বিপদ বাড়াতে পারে। ছাত্রলীগ যে এখন গণবিচ্ছিন্ন একটি পরগাছা সংগঠনে পরিণত হয়েছে- এটা বোঝার জন্য আর কালক্ষেপণের দরকার নেই। অতীত ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বর্তমান ছাত্রলীগ বহন করছে না। ছাত্রলীগ এখন এক লজ্জা ও কলঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের অপকর্ম-কুকর্ম মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। সব ধরনের অপরাধমূলক কাজের সঙ্গেই ছাত্রলীগের নাম জড়িয়েছে। ছাত্রলীগ নামধারী দুর্বৃত্তদের বাড়াবাড়িতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা অতিষ্ঠ। ডাকসু ও হল সংসদগুলোর নির্বাচন হয় না। ছাত্রদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও সৃজনশীলতা চর্চার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ নেই। তাদের সমস্যার কথা, সুবিধা-অসুবিধার কথা শোনার কেউ নেই। সব মিলিয়ে যে গুমোট পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তারই বিস্ফোরণ ঘটেছে কোটা আন্দোলনে।

ছাত্রলীগের পক্ষে সাফাই না গেয়ে ছাত্রলীগকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এ ক্ষেত্রে শক্ত অবস্থান নিতে হবে। দুষ্টের দমনে দৃঢ়তা দেখালে তিনি কিছুই হারাবেন না কিন্তু পাবেন অগণিত মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও নিঃশর্ত সমর্থন। কিন্তু ছাত্রলীগ নামের আপদ সঙ্গে রাখলে বিপদও কাছ ছাড়া হবে না।

চার.
গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি লাভবান হয়েছিল। কোণঠাসা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ঘাতক-দালালরা। কিন্তু এবারের ‘কোটা’ আন্দোলন সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করল মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার। কারণ আন্দোলনের বর্শাফলকটার টার্গেট ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা, বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোটা। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে যারা পরিচিত তারা যখন এই কোটার বিরুদ্ধে কাছা খুলে নামেন তখন রাজাকার-আলবদর এবং ওই ধারার সমর্থকরা বিপুল উৎসাহে মাঠে নেমে পড়েছেন। যত রকম কুযুক্তি আছে তার সবই তোলা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোটা রাখার বিরুদ্ধে। সামাজিক প্রচার মাধ্যম সয়লাব ওই সব অপলাপে।

সে জন্যই আমার মনে হয়, কোটা আন্দোলনের নেতা-সংগঠকদের ব্যাপারে একটু বিস্তারিত খোঁজখবর নেয়া দরকার। এরা কারা? এরা কোন রাজনৈতিক মতে বিশ্বাসী? এদের পারিবারিক ঠিকুজিও জানা দরকার। পরিবারের রাজনৈতিক ধারার বাইরে সাধারণত অনেকেই যেতে পারেন না। কেউ গেলেও যান বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে। কোটা আন্দোলনকারীদের মধ্যে কেউ যদি ছাত্রলীগেরও থাকেন তাহলে তার ব্যাপারেও খোঁজ নেয়া দরকার। কারণ তিনি শফিউল আলম প্রধান মার্কা ছাত্রলীগ কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়া দরকার। মুসলিম লীগ নেতা এবং আইয়ুব খানের কাছের মানুষ জমিরউদ্দিন প্রধানের ছেলে শফিউল আলম প্রধান স্বাধীনতার পর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। তার পরিণতি কি হয়েছিল? মহসিন হলে সাত খুনের ঘটনা ঘটিয়ে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার।

আমার ধারণা, কোটা আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধ, আওয়ামী লীগ এবং সর্বোপরি শেখ হাসিনাবিরোধী বৃহত্তর ঐক্যের একটি ড্রেস রিহার্সাল হয়ে গেল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যদি আবারো ক্ষমতায় যেতে পারে, তাহলে দেশে আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনীতি চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। তাই শেখ হাসিনাকে আর ক্ষমতায় আসতে না দেয়ার একটি বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে কোনো কোনো মহল তৎপর আছে বলেই আমার ধারণা। তারা পানি ঘোলা করার কোনো সুযোগই হাতছাড়া করবে না। সেজন্যই মনে হয় কোটা আন্দোলনের একটি পরিপূর্ণ ব্যবচ্ছেদ হওয়া খুবই জরুরি।

বিভুরঞ্জন সরকার : কলাম লেখক।