সারাদেশে বদলি নিয়ে বড় চাপে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়

 

নিউজ ডেস্ক : নির্বাচনকে সামনে রেখে স্বাভাবিক রদবদল নিয়ে বড় ধরনের চাপে পড়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। বিশেষ করে মাঠ প্রশাসনে কাউকে বদলি করেও তা কার্যকর করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে অপছন্দের কর্মকর্তাদের ‘বিএনপি-জামায়াতপন্থি’ তকমা দিয়ে অকারণ বদলির রাজনৈতিক চাপও আসছে। এ সব নিয়ে মন্ত্রণালয় রীতিমত গলদঘর্ম অবস্থা।

সূত্র জানায়, গত ৫ এপ্রিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৩৩টি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (এডিসি) শূন্য পদে সমসংখ্যক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) নিয়োগ দেয়। কিন্তু গতকাল বুধবার পর্যন্ত খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, একজন নির্বাহী অফিসারও ঊর্ধ্বতন ওই পদে যোগ দেননি। অথচ আদেশ অনুযায়ী গত ১২ এপ্রিলের মধ্যে তাদের পূর্বতন কর্মস্থল ত্যাগ করে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেয়ার কথা ছিল।

সাধারণভাবে একজন কর্মকর্তা বিশেষ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে দুই বছরের বেশি সময় একই কর্মস্থলে না রাখার বিধান চালু রয়েছে। তদুপরি যারা পদোন্নতি পান তারা কিছুতেই পুরনো কর্মস্থলে থাকতে পরেন না। কিন্তু এবারই ব্যাপকহারে এই বিধান অকার্যকর হতে দেখা যাচ্ছে। জানতে চাইলে এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

গত ২৯ জানুয়ারি মোহাম্মদ সানোয়ার হোসেনকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসাবে বদলি করা হয়। কিন্তু তার বদলি বাতিলের চাপের কারণে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় দুই মাসেরও বেশি সময় পর গত ৫ এপ্রিল তা বাতিল করে। আর সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও প্রভৃতি জেলায় বদলি করা ইউএনওদের প্রতি জারিকৃত আদেশও গতকাল বাতিল করা হয়েছে। ৫ এপ্রিল যেসব জেলায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয় সেগুলো হচ্ছে শরিয়তপুর, চাঁদপুর, জামালপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা, ফরিদপুর, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সুনামগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, বরগুনা, ঝালকাঠী, পটুয়াখালী, বান্দরবান, রাজবাড়ী, বরিশাল, পাবনা, মেহেরপুর ও চট্টগ্রাম। এর মধ্যে একই জেলায় একাধিক কর্মকর্তাকে বদলিপূর্বক নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের একজন এমপি তার অধিক্ষেত্রের এক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বদলি করার জন্য ওই কর্মকর্তার বাবাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ‘বিএনপিপন্থি’ বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পরিচয় দেন। এই কথায় বিশ্বাস করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তাকে বদলি করে। কিন্তু গতকাল মন্ত্রণালয় থেকে খোঁজ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানতে পারেন, ওই কর্মকর্তার পিতা কিশোরগঞ্জের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং তাদের পরিবার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। মন্ত্রণালয় বলছে, এভাবে প্রায়ই কর্মকর্তাদের ঘাড়ে বিএনপি-জামায়াতের পরিচয় চাপিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অসন্তোষ সৃষ্টি করানো হয়। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরে তা আবার সংশোধন করতে হচ্ছে। এই কর্মকর্তার বদলি আদেশও বাতিল হবে বলে জানানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মাঠের প্রশাসনে নিয়োজিত কর্মকর্তারা এমনভাবে স্থানীয় দলীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন যাতে করে পেশাদারিত্বমূলক প্রশাসনের অস্তিত্ব আর থাকছে না। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে অসাধু উদ্দেশ্যে ওইসব কর্মকর্তাকে নিজের স্থানে টিকিয়ে রাখতে অন্যায় আবদার ও ক্ষেত্রবিশেষে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।

একজন কর্মকর্তার জন্য উচ্চতর পদে পদোন্নতি পাওয়া বা সেই পদে যোগ দেয়াটা তার জন্য কাঙ্ক্ষিত ও গৌরবের। কিন্তু সেই গৌরবের কথা না ভেবে অজানা মোহে কর্মকর্তারা ক্ষমতাবানদের দিয়ে নিচের পদে টিকে থাকার উল্টো তদবির করাচ্ছেন। একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড পদের ক্ষেত্রেও। অনেক এসিল্যান্ডকে পদোন্নতি দেয়া হলেও তারা নির্বাহী অফিসারের পদে যোগ দিয়ে নতুন কর্মস্থলে যেতে অনীহা প্রকাশ করছেন। নিচের পদে থাকার জন্য তদবিরও করছেন।

সচিবালয়ে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অনেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগের চিত্রও প্রায় একই রকম। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় স্বেচ্ছাধীন আইনী প্রক্রিয়ায় কাউকে কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগে বদলি করতে পারছে না। করলেও অনেক কর্মকর্তা বদলিকৃত পদে যোগ দিতে পারছেন না। কিছু দিন পর তা বাতিল করতে হচ্ছে। একই কর্মকর্তাকে একটি কর্মস্থল থেকে বদলি করার প্রচেষ্টাও সফল হচ্ছে না।