মোবাইল টাওয়ারের অদৃশ্য দূষণ

আলম শাইন: ঊনবিংশ-একবিংশ শতাব্দীর মধ্যে জন্মগ্রহণ করতে পেরে আমরা গর্বিত। কারণ এ সময়েই আমরা পেয়েছি রেডিও থেকে শুরু করে হালের থ্রি-জি কিংবা ফোর-জি মোবাইল ফোন। আর ফাইভ-জি তো হাতের নাগালের কাছেই প্রায়। বিজ্ঞান এবং বৈজ্ঞানিকের সমন্বয়ে আমরা যা পেয়েছি তা সত্যিই বিস্ময়কর বটে। আমাদের প্রাপ্তির ছোট্ট উদহারণটি হচ্ছে, বিজ্ঞানের কল্যাণেই মানুষ পৃথিবী ছেড়ে মহাশূন্যে পঁইপঁই করে ঘোরার সুযোগ পেয়েছে। এটি মানবজাতির জন্য বিশাল এক প্রাপ্তি। এ প্রাপ্তি অস্বীকারের কোনো জো নেই। আমরা ঋণী তাই বিজ্ঞানের কাছে।

প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয় বিজ্ঞানের আশীর্বাদে মানবজাতির গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে যেমনি তেমনি আয়ু হ্রাসও পাচ্ছে দ্রুত। বিজ্ঞানের অধিক হিতকর কাজে এক ধরনের অদৃশ্য দূষণের কবলে পড়ে বিভিন্ন ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মানুষ মৃত্যুর পথে দ্রুত পা বাড়াচ্ছেন। যা খুব সহজেই টের পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ এ দূষণ হচ্ছে সম্পূর্ণ অদৃশ্য দূষণ। যে দূষণ খালিচোখে নজরেও পড়ছে না। এমনকি অনুভবও করা যাচ্ছে না, কারণ এটি থাকছে একেবারেই অদৃশ্য। এর প্রতিক্রিয়াও দীর্ঘমেয়াদি। আর সে দূষণটি হচ্ছে ‘তড়িৎ চৌম্বকীয় দূষণ’। যার উৎস অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি এবং আধুনিক সুবিধাদি ভোগের ফলাফলের কারণ। এসব যন্ত্রপাতি বা সুবিধাভোগের কারণে মানুষ লিউকোমিয়া, ব্রেইন টিউমার এবং ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন ব্যাপকহারে। এ ছাড়াও এ দূষণের ফলে স্বায়ুতন্ত্রে সমস্যা, অবসন্নতা, স্মরণশক্তি লোপ, হজমে বিপাক এবং অল্প বয়সের মধ্যে বৃদ্ধ হতে বাধ্য হচ্ছে।

তড়িৎ চৌম্বকীয় দূষণের শিকার শুধু এ দেশের মানুষই হচ্ছেন না, হচ্ছেন সমগ্র বিশ্ববাসীই। তবে বেশি শিকার হচ্ছেন তারা-ই যারা তড়িৎ বিকিরণ ক্ষেত্রে কর্মরত রয়েছেন। যেমন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কর্মরত টেকনিশিয়ান, বিদ্যুতের লাইনম্যান, টেলিফোন বা সেলফোন টাওয়ারের ইলেকট্রিশিয়ান, ইলেকট্রিক রেলওয়ের অপারেটরা। এতদসব পেশার লোকেরা অন্যান্য পেশায় কর্মরত লোকের তুলনায় দশ গুণ বেশি লিউকোমিয়াসহ ব্রেইন টিউমারে অক্রান্ত হচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব পাবলিক হেলথ-এর গবেষক ‘সুসান প্রিন্সটন মার্টিন’ ব্যাপক গবেষণা করে এর সত্যতা যাচাই করেছেন। তিনি জানিয়েছেন,‘তড়িৎ চৌম্বকীয় বিকিরণে শিশুরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে শিশুর মানসিক বিকাশে যেমনি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি শারীরিক বর্ধনশীলেও সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

পরিসংখ্যান মোতাবেক জানা যায়, বর্তমান বিশ্বের শতাধিক কোটির বেশি মানুষ তড়িৎ চৌম্বকীয় বিকিরণের শিকার হচ্ছেন। বিশেষকরে যারা সেলফোন ব্যবহার করছেন তাদের প্রত্যেকেই এ দূষণের কবলে পড়ছেন। আর যুব সম্প্রদায় তড়িৎ দূষণের শিকার হচ্ছে বহুগুণ বেশি। সেলফোনে তারা প্রতিনিয়ত গান শুনছে হেয়ারফোন কানে ঠেসে ধরে, খেলছে গেমও। তার ওপর আবার অনবরত কথা বলে যাচ্ছে প্রিয়জনদের সঙ্গেও। ফেসবুকের কথা বাদই দিলাম। এতে করে ফোনসেটের অদৃশ্য তরঙ্গ যে তাদের কর্ণ প্রদাহসহ ব্রেইন টিউমার সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে তা তারা ঘুণাক্ষরেও টের পাচ্ছে না। এ চিত্র শুধু আমাদের দেশেই নয়, সমগ্র বিশ্বের তরুণ সমাজের মাঝেই এটি পরিলক্ষিত হচ্ছে।

সেলফোনের তড়িৎ চৌম্বকীয় বিকিরিণ নিয়ে এ পর্যন্ত বহু গবেষণাও হয়েছে। ফলাফল বরাবরই একই রকম, মোটেই সন্তোষজনক নয়। সম্প্রতি ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব মেডিসিন ও কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং-এর গবেষণায় দেখা যায়, সেলফোন থেকে বের হওয়া মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশন মানুষের মস্তিষ্কের ডিএনএ অণুকে ৫০ শতাংশ খণ্ডিত করছে। যার ফলে মানুষের স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়ে যাচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে। গবেষণায় আরো দেখা যায়, যারা নিয়মিত সেলফোন ব্যবহার করেন তাদের প্রত্যেকেই তড়িৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গের শিকার হচ্ছেন। বিশেষকরে চোখ, মুখ, নাক, গলা এমনকি মস্তিষ্কে দারুণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করছে। ক্ষতিগ্রস্ত করছে চোখের নরম টিস্যুকেও। সমীক্ষায় জানা যায়, দশ বছরের বেশি সময় ধরে যারা সেলফোন ব্যবহার করছেন তাদের ব্রেন টিউমার হওয়ার আশঙ্কা অন্যদের চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশি।

২০১০ সালে সুইডেন মেডিকেল ইনস্টিটিউট প্রায় এগারো হাজার সেলফোন ব্যবহারকারীর ওপরে এক সমীক্ষা চালিয়েছেন। সমীক্ষার ফলাফল থেকে জানা যায়, ‘সেলফোন ব্যবহারের ফলে ব্যবহারকারী তড়িৎ চৌম্বকীয় দূষণের শিকার হয়ে নিয়মিত ক্লান্তিবোধের পাশাপাশি মাথাব্যথা রোগে ভুগছেন’। এ গবেষণার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানী এবং চিকিৎসকরাও। তারা তৎসঙ্গে সতর্কবাণী জুড়ে দিয়ে বলেছেন যে, ‘তড়িৎ চৌম্বকীয় বিকিরণের কারণে শিশুদের দেহকোষ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে এবং তৎসঙ্গে জেনেটিক ড্যামেজও ঘটছে। ভয়ঙ্কর এ দুর্যোগের খবরের ওপর ভিত্তি করে ইউনিভার্সিটি অব পিটসবার্গ ও ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. রোনাল্ড হেবারম্যান গবেষণা করে তার সংস্থার প্রায় তিন হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তড়িৎ চৌম্বকীয় বিকিরণের ব্যাপারে সতর্ক করে দেন। তিনি সবাইকে জানিয়ে দেন সেলফোন শরীর থেকে যেন খানিকটা দূরত্বে রাখা হয় এবং অবশ্যই যেন তা শিশুদের নাগালের বাইরে রাখা হয়।

গত দশক ধরেও আমরা জেনে এসেছি শুধুমাত্র পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তার ফলেই এ ধরনের অদৃশ্য দূষণ ঘটছে। উপরোক্ত বিষয়ের কারণে যে তড়িৎ চৌম্বকীয় দূষণ ঘটতে পারে তা আমাদের অনেকেরই অজানা ছিল। আমরা আধুনিক যন্ত্রপাতির সুবিধা ভোগের আনন্দে এতোটাই বুঁদ ছিলাম যে এটি মানবজাতির জন্য প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়াবে তা হয়তো ঘুণাক্ষরেও কেউ ভাবেনি আগে, অথচ এই ভাবনাটা এখন ভাবতে হচ্ছে আমাদের প্রতিনিয়ত। সেই ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের বলতে হচ্ছে যে, সেলফোন বন্ধ করে নয় বরং উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে তড়িৎ চৌম্বকীয় দূষণের কবল থেকে বিশ্ববাসীকে মুক্ত করতে সচেষ্ট হোন।

লেখক: আলম শাইন, কথাসাহিত্যিক, বন্যপ্রাণী বিশারদ ও পরিবেশবিদ।