পহেলা বৈশাখ সর্বজনীন হওয়াটা বড় অর্জন

নিউজ ডেস্ক: সব্যসাচী হাজরা। মেধাবী চিত্রশিল্পী ও প্রচ্ছদশিল্পী, যার হাতে রঙের আঁচড়ে একটি বইয়ের মলাটে ফুটে ওঠে সম্পূর্ণ বইয়ের অবয়ব। বাংলা নববর্ষ নিয়ে তিনি কথা বলেছেন সমকাল অনলাইনের সঙ্গে। এ সময় তিনি তার শৈশবে-কৈশোরের খুলনায় কাটানো নববর্ষ ও ঢাকায় আসার পরের পহেলা বৈশাখ নিয়ে কথা বলেন।

প্রথমে সব্যসাচী হাচরা স্মৃতিচারণ করেন তার শৈশবের বাংলা নববর্ষ নিয়ে। বলেন, আমার শৈশব-কৈশোরে আমি গ্রাম বা মফস্বলে থাকতাম। তখনকার পহেলা বৈশাখ ছিল একেবারেই মেলাকেন্দ্রিক। তখন এতো পোশাক-আশাকের হিড়িক ছিল না। বাসাতে আয়োজন কিছু হতো— যেমন, সাধ্য মতো ভালো রান্নাবান্না, ঘরদোর গোছানো, এসব। তবে সেসব এতো আড়ম্বরপূর্ণ কিছু না। আমরা পহেলা বৈশাখ বিষয়টা জানতাম না। তখন হালখাতা হতো। পহেলা বৈশাখের দিন গনেশ পূজার আয়োজন হয়। বাজারের বড় বড় দোকানে পূজা হতো, সেখানে গেলে রসগোল্লা দিত। মূল বিষয় ছিল ওই হালখাতা। এটার উদ্দেশ্য ছিল দোকানের পুরনো বছরের হিসাব চুকিয়ে ফেলা। ওখানে একমাত্র খাবার ছিল ওই রসগোল্লা। খুলনা বড়বাজার ছিল বিখ্যাত। এখানে বড় বড় দোকান-স’ মিলে হালখাতা হতো। এ উপলক্ষে দোকান একটু সাজানো হতো।

পাশাপাশি শৈশবের মেলার স্মৃতিচারণ করেন তিনি। বলেন, আমি তো তখন ছিলাম ছোট। আমাদের ছোটদের জন্য প্রধান আকর্ষণ ছিল বৈশাখী মেলা। তখন মেলায় কিছু জিনিস পাওয়া যেত, হয়তো একটু ভঙ্গুর ছিল, যেমন, মাটির পুতুল, কাগজের খেলনা। এখনকার মতো চাইনিজ আইটেম তখন মেলায় ছিল না। ওই মেলায় যাওয়া, নাগরদোলায় চড়া, মাটির এটা-সেটা কেনা, বাতাসা, মোয়া ইত্যাদিই ছিল মেলার আনন্দ ও আকর্ষণ।

বর্তমানে পহেলা বৈশাখে সারাদেশে যে বিশাল আয়োজন— এ বিষয়ে গুণী এই শিল্পী বলেন, এখানে দু’টি ব্যাপার আছে। পরিবর্তন তো কিছু হবেই। আমি ছয়-সাত বছর আগে পহেলা বৈশাখে একবার খুলনায় গেলাম। দেখলাম ওখানে খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। পরিবর্তনটা ঢাকাতেই বেশি। এখন যেটা হয়েছে, ধনী-গরীব সবার মধ্যে উৎসবটা ছড়িয়ে পড়েছে। আমার-আপনার বাসায় যিনি কাজ করেন, তিনিও হয়তো পহেলা বৈশাখে ছুটি নেন, নতুন পোশাক কেনেন। তার মানে বিষয়টা সর্বজনীন হয়েছে, সবার মধ্যে উৎসবটা ছড়িয়ে পড়েছে। আরেকটা বিষয়, ইউনেস্কো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে তাদের ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে— এটাও একটা সুখবর। মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-আদিবাসী সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের এমন সর্বজনীন উৎসব খুব কম দেশেই আছে। সারাদেশে নতুন পোশাক পরে উৎসবমুখর পরিবেশে একটা দিন উদযাপন হচ্ছে— এটা ইতিবাচক।

তবে অনেক সময় পহেলা বৈশাখে করপোরেট সংস্কৃতির একটা আঁচ পাওয়া যায়— এটা দৃষ্টিকটু। এখন অনেকটা চোখসওয়াও হয়ে গেছে। আমরা যখন চারুকলায় ছিলাম তখন চেষ্টা করেছি এবং এখনও চেষ্টা করা হয়, কোনো স্পন্সর ছাড়া মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজন করার; নিজেদের জিনিস নিজেরা বিক্রি করে সেটা করার। কিন্তু করপোরেটরাও তো ওত পেতে থাকে। চেষ্টা করে যেখানে পারা যায় ঢুকে পড়ার। তবে সেটা মূল বিষয়কে ছাপিয়ে খুব অল্পই। মূল বিষয়টা অনেক বড়। এই যে উৎসবটা সর্বজনীন হলো এবং সেটা ছড়িয়ে পড়লো এটা আমাদের একটা বড় জায়গা। আর আমাদের চোখের সামনেই তো উৎসবটা এতো বড় হলো।

পহেলা বৈশাখ বলে এখনও চোখ বন্ধ করলে কী দেখেন— এমন প্রশ্নে সব্যসাচী হাজরা বলেন, আমি এখনও ওই মেলাটাই দেখি; শৈশবের। খুবই জনাকীর্ণ। অতো আড়ম্বর নেই। কিন্তু সবকিছুর মধ্যে একটা মায়া।