ভিসির বাসভবনে হামলা পরিকল্পিত

নিউজ ডেস্ক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ভিসির বাড়িতে নজিরবিহীন তাণ্ডবের ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করতে তদন্ত শুরু করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরই মধ্যে ক্যাম্পাসের ভেতরে ও প্রবেশপথের সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করে তা বিশ্নেষণ করছে পুলিশ। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ভিসির বাসার হামলাকারীদের নাম-পরিচয় সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। তবে তারা সিসিটিভি দেখে কারও কারও মুখ শনাক্ত করে পরিচয় জানার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট সূত্র বলছে, হামলার আগেই নীলক্ষেত মোড়সহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রবেশপথ হয়ে অনেককে ঢাবি এলাকায় ঢুকতে দেখা গেছে। তাদের পরিচয় বের করারও কাজ চলছে। তবে ভিসির বাসার সামনের কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি। হামলাকারীরা সেখানকার সিসিটিভি ও তার প্যানেল বোর্ড ভাংচুর করে। কিছু পুড়িয়েও দিয়েছে তারা। হামলার ধরন ও অন্যান্য আলামত বিশ্নেষণ করে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ভিসির বাসায় তাণ্ডবের ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত। যারা হামলার আগে-পরে গুজব ছড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়েছে, তাদের শনাক্ত করছে সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধ বিভাগ।

এদিকে ভিসির বাসায় ভাংচুরের ঘটনায় গতকাল মধ্যরাতে শাহবাগ থানায় মামলা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ ছাড়া পুলিশের বিশেষ বিভাগের (এসবি) এক সদস্যের গাড়ি পোড়ানো ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে আরও তিনটি পৃথক মামলা করা হয়েছে। তদন্ত-সংশ্নিষ্ট একাধিক সূত্র সমকালকে এসব তথ্য জানায়।

গতকাল রাতেও ভিসির বাসায় তাণ্ডবের ঘটনায় মামলা দায়েরের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে বৈঠক করেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ওই বৈঠকের পরই মামলা করা হয়। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে ছাত্র মৃত্যুর গুজবসহ নানা অপপ্রচার চালিয়েছে তাদের বিরুদ্ধেও দু-একদিনের মধ্যে মামলা হওয়ার কথা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক একেএম গোলাম রব্বানী সমকালকে বলেন, যারা ভিসির বাসায় হামলা করেছে তাদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি। হামলাকারীরা মুখোশধারী সন্ত্রাসী। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মামলায় মুখোশধারীদের আসামি করা হয়েছে।

এদিকে, মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ভিসির বাড়িতে হামলায় যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারা জড়িত, তা খুঁজে বের করতে গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে। অনেক জিনিস ওই বাসা থেকে খোয়া গেছে। নীলক্ষেতের রাস্তা দিয়ে অনেক সন্ত্রাসী ঢুকেছিল। এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে, তা না হলে ছাত্ররা মুখোশ পরেছে কেন? কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে যারা ফেসবুকে গুজব ছড়িয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও মামলা হবে।

ঢাবি উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান বলেন, দুর্বৃত্তরা চেয়েছিল একটি লাশের রাজনীতি করতে। রক্তের রাজনীতি করতে। হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে রক্তপাত ঘটিয়ে একটি বিভীষিকাময় পরিবেশ সৃষ্টি করে বিশ্ববিদ্যালয়কে অচল করা, সরকারকে অচল করা, অস্থিতিশীল একটা পরিবেশ সৃষ্টি করার টার্গেট ছিল তাদের। আলামত দেখে এটাই মনে হয়েছে। এর সঙ্গে কোটার সংস্কার আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নেই।

ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে হামলাকারী হিসেবে কারও নাম-পরিচয় জানা যায়নি। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি পাওয়া না গেলেও ক্যাম্পাসের অন্যান্য এলাকার ফুটেজ সংগ্রহ করে তা বিশ্নেষণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া টেলিভিশনে প্রচারিত ফুটেজও দেখা হচ্ছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন বলেন, হামলার ধরন দেখে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, ভিসির বাসায় হামলা পূর্বপরিকল্পিত। পুলিশের রমনা বিভাগের ডিসি মারুফ হোসেন সরদার বলেন, হামলাকারীদের শনাক্ত করতে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। পুলিশের অপর এক কর্মকর্তা জানান, রবি ও সোমবারের ঘটনায় যাদের আটক করা হয়েছে তাদের সবাইকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ।

বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান রাজু বলেন, যতদূর জানি এখনও অনেকে পুলিশি পাহারায় চিকিৎসা নিচ্ছে। আর যারা ভিসির বাসায় হামলা করেছে তারা বহিরাগত সুযোগসন্ধানী। আন্দোলনকে বানচাল করতেই তারা ন্যক্কারজনক ওই ঘটনা ঘটিয়েছে।

সিসিটিভি ও কলরেকর্ড ভরসা পুলিশের: তদন্ত সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, পুলিশ প্রথমে ভিসির বাসায় হামলাকারীদের শনাক্ত করতে চায়। এরপর তারা বের করবে তাদের মধ্যে কারা ক্যাম্পাসের ছাত্র আর কারা বহিরাগত। ক্যাম্পাসের সব প্রবেশপথ এলাকার সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্নেষণ করে দেখা হচ্ছে। রোববার গভীর রাতে নিউমার্কেট মোড়সহ কয়েকটি এলাকা দিয়ে কয়েকশ’ লোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঢুকেছিল। তাদের ব্যাপারে অনুসন্ধান চলছে। ঘটনাস্থল ও এর আশপাশের এলাকায় যারা

নিরাপত্তারক্ষীর দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের সঙ্গেও কথা বলেছে পুলিশ। ভিসির বাসায় হামলাকারীদের মধ্যে কারও কারও গায়ে ‘ঢাকা কলেজ’ লেখা টি-শার্ট ছিল। এ ছাড়া কেউ কেউ ভেতরে ঢুকে অশ্রাব্য ভাষায় গালমন্দ করতে শুরু করে। রাত সোয়া ১টায় পূর্বদিক থেকে একদল মিছিল নিয়ে এসে হামলা করে। ভিসির বাসভবনের দেয়াল টপকে হামলাকারীরা ওপরে উঠে সিসি ক্যামেরা ভেঙে তারপর তাণ্ডব শুরু করে। হামলার আগে মেয়েদের একটি মিছিল ভিসির বাসার সামনে গেলেও তারা ভেতরে ঢোকেনি। হামলাকারীদের মধ্যে ৭০-৮০ জন হাতে লাঠিসোটা নিয়ে ভেতরে ঢুকেই আলোবাতি ভেঙে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে।

ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসাইন মঙ্গলবার বলেন, ভিসির বাসায় হামলার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি, নজিরবিহীন তাণ্ডব চালানো হয়েছে। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা উপস্থিত হলে হামলাকারীদের অনেকে পেছন দিক দিয়ে পালিয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, আন্দোলন এখন ঢাবি ছাত্রদের হাতে নেই। বহিরাগত যারা আন্দোলনের নামে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে, তাদের শনাক্ত করার দায়িত্ব পুলিশের।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজবের ছড়াছড়ি: কোটা সংস্কারের আন্দোলন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা ধরনের গুজবের ছড়াছড়ি চলছে। শত শত পেজ তৈরি করে সেখানে নানা উস্কানিমূলক বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। ৩০-৪০ পেজ শনাক্ত করা হয়েছে, যেখানে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। বিভিন্ন সময় পুলিশ অভিযান চালিয়েছে- এমন অনেক ছবি কপি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে।

যারা এ ধরনের বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশ। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, আবু বক্কর সিদ্দিকি নামে আহত এক শিক্ষার্থীর অজ্ঞান অবস্থার ছবি তুলে মারা যাওয়ার গুজব ছড়ানো হয়। এটি বেশি ছড়ায় ইমরান এইচ সরকারের ভেরিফায়েড পেজের মাধ্যমে। পরে অবশ্য আরেকটি স্ট্যাটাসে ইমরান লিখেন, ‘একটা ভালো খবর হলো, একজন মারা যাওয়ার যে গুজবটা ছড়িয়ে পড়েছিল, এখনও তার সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে অনেকের অবস্থা বেশ খারাপ। সবাই দোয়া করবেন, আল্লাহ যেন সবাইকে বাঁচিয়ে রাখেন।’

গোয়েন্দারা বলছেন, ভিসির বাসায় হামলাকারী ও তাদের ইন্ধনদাতাদের শনাক্ত করাই তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। হামলায় ছাত্রশিবিরসহ কোনো সুযোগ সন্ধানী গ্রুপের সংশ্নিষ্টতা রয়েছে কি-না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।