বদলে যাওয়ার বহু ইতিহাসের সাক্ষী মমতা

নিউজ ডেস্ক: বদলে যাওয়ার বহু ইতিহাসের সাক্ষী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জাতীয় কংগ্রেস ঘরানার নেত্রী হওয়া সত্ত্বেও তিনি কংগ্রেস ভেঙে নতুন দল তৃণমূল কংগ্রেস গড়েন। আবার এই তৃণমূল কংগ্রেস কখনো বিজেপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট বা এনডিএতে যোগ দিয়েছে। যোগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায়ও। আবার কখনো যোগ দিয়েছে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক জোট বা ইউপিএতে। হয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও।

তবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে মমতা আজও পশ্চিমবঙ্গের একচ্ছত্র নেত্রী। তিনিই শেষ করে দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের ৩৪ বছরের বাম শাসন, বাম দলকে। শেষ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের জাতীয় কংগ্রেসকে। কিন্তু শেষ করতে পারেননি বিজেপিকে। এখন ধীরে ধীরে বাড়ছে বিজেপির প্রভাব। শক্তি অর্জন করছে এই রাজ্যে। তাই বিজেপিকে ঠেকাতে আর বাম দলকে শায়েস্তা করতে মমতা নতুনভাবে অবতীর্ণ হয়েছেন রাজনৈতিক মঞ্চে। কাছাকাছি আসছেন জাতীয় কংগ্রেসের।

এই লক্ষ্যে মমতা এবার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর পুরোনো দল কংগ্রেসের দিকে। আগামী মাসেই পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত নির্বাচন আর আগামী বছর লোকসভা নির্বাচন। এই নির্বাচনে জয়ী হতে হলে মমতাকে বদলাতে হবে। মমতা জানেন, কংগ্রেস যদি আলাদাভাবে লড়ে বা সিপিএমের সঙ্গে জোট গড়ে নির্বাচনে লড়ে, তাতে আখেরে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাদের দল—তৃণমূল। তাই কংগ্রেসকে যেকোনো মূল্যে সিপিএম বা বাম দলের সংস্রব ত্যাগ করাতে হবে এবং ভেড়াতে হবে তৃণমূলের দিকে। এতে করে এ রাজ্যে বাম দলের আসন একেবারে কমে যাবে। কংগ্রেস-তৃণমূল জোটের আসন বাড়বে। এই লক্ষ্যে মমতা ফের নিজেকে বদলে ফেলছেন।

দিল্লিও চাইছে তৃণমূল-কংগ্রেস জোট হোক। সোনিয়ারও ইচ্ছে তা-ই। কিন্তু রাজ্য নেতৃত্বে এ নিয়ে আবার ভিন্নমত রয়েছে। তাই এখন এত দিন কংগ্রেসের সঙ্গে থাকা তৃণমূলের অহি-নকুল সম্পর্কের ইতি টেনে তৃণমূল কংগ্রেস চাইছে কংগ্রেসের সঙ্গে সখ্য গড়তে। এই লক্ষ্যে তাদের প্রথম উদ্যোগে সফল হয়েছে। মমতা পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যসভার শূন্য ৫টি আসনের মধ্যে একটি আসনে সমর্থন দিয়েছেন কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতা ও আইনজীবী প্রার্থী অভিষেক মনু সিংভিকে। অথচ এ আসনে কংগ্রেস-বাম দলও লড়লে জিতত তাঁদের প্রার্থী। কিন্তু কংগ্রেস-বাম দল প্রার্থিতা নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছতে না পারার সুযোগে দিল্লির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মমতার সঙ্গে কথা বলে প্রার্থী করেন অভিষেক মনু সিংভিকে। মমতাও কলকাতার প্রকাশ্য সমাবেশে কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে চমক দেন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে। তাই তো কংগ্রেসের সঙ্গে বৈরিতার পথ ভুলে এখন তিনি বিজেপিকে পরাস্ত করতে কংগ্রেসের হাত ধরেছেন।

কিন্তু কেন মমতা ফের হাত ধরলেন কংগ্রেসের? এ নিয়ে রাজনীতিতে বিতর্কের অভাব নেই। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, পশ্চিমবঙ্গে এখন বিজেপি বাড়ছে। বিজেপি শক্তিশালী হচ্ছে। ধর্মীয় আবেগ দিয়ে মানুষকে টানছে। সাম্প্রদায়িকতার উসকানিতে বিজেপির পতাকাতলে সমবেত করাচ্ছে। বিজেপির এ বাড়বাড়ন্তে দুশ্চিন্তা বেড়েছে মমতার, পশ্চিমবঙ্গের অসাম্প্রদায়িক লোকজনের। কারণ, বাম দলের মেরুদণ্ড এর মধ্যে ভেঙে গেছে। সে তুলনায় বাড়ছে বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি। এসব হিসাব করেই মমতা বুঝেছেন, বিজেপিকে হটাতে একদিকে যেমন কংগ্রেসের হাত ধরতে হবে, অন্যদিকে বাম দলকে এই রাজ্য থেকে হঠাতে কংগ্রেস-বামজোটকে ভেঙে দিতে হবে। এতে করে এক ঢিলে দুই পাখি মারা যাবে। কংগ্রেসকে পাওয়া যাবে তাদের জোটে। বাম দলকে এই রাজ্যপাট থেকে বিতাড়িত করা যাবে সহজে। এই লক্ষ্য নিয়ে মমতা ফের বদলে ফেলেছেন নিজেকে।

মমতার বদলে যাওয়ার ইতিহাস নতুন নয়; বহু পুরোনো। ১৯৯৭ সালে তিনি কংগ্রেস ভেঙে গঠন করেছেন তৃণমূল কংগ্রেস। ১৯৯৯ সালে তিনি যোগ দেন বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএতে। হয়ে যান ভারতের রেলমন্ত্রী। আবার ২০০১ সালে তিনি এনডিএ ছাড়েন। ২০০৪ সালে আবার এনডিএতে যোগ দেন। হয়ে যান কেন্দ্রীয় কয়লা ও খনিমন্ত্রী। আবার ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে লোকসভার ৪২টি আসনের মধ্যে একটি আসনে জেতে মমতার তৃণমূল কংগ্রেস। সেই আসনটি মমতার নিজের। এই ঘটনার পর মমতা বুঝতে পারেন, এনডিএর সঙ্গে তাঁর জোট মেনে নিতে পারেনি এ রাজ্যের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং প্রগতিশীল মানুষ। এরপরই তিনি ঘুরে যান এনডিএর সংস্রব থেকে। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে মমতা জোট করেন কংগ্রেসের সঙ্গে। কংগ্রেস-তৃণমূল জোট ছিনিয়ে নেয় ২৫টি লোকসভার আসন। বামফ্রন্ট পায় মাত্র ১৫টি আসন। এরপরেই ২০০৯ সালেই মমতা ইউপিএ জোটের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং সরকারের রেলমন্ত্রী হন। এর আগে অবশ্য মমতা ১৯৯১ সালেও কংগ্রেসের নরসীমাহ রাওয়ের মন্ত্রিসভায় মানবসম্পদ উন্নয়ন, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পান।

তবে এ কথাও ঠিক, পশ্চিমবঙ্গে জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের অহি-নকুল সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই। কেউ কারও ছায়া মাড়ান না কার্যত। দুই মেরুতে অবস্থান এ দুই দলের। একসময় তৃণমূল নির্বাচনী জোট করেছিল বিজেপি এবং জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গেও। সেসব ঘটনা এখন অবশ্য অতীত। আর রাজনীতিতে শত্রু বলে কোনো কথা নেই। আজ যে বন্ধু, কাল সে শত্রু হয়ে যেতে পারে। রাজ্য কংগ্রেস এখনই চাইছে না তৃণমূলের সঙ্গে জোট বাঁধতে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এখনো কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে সুসম্পর্ক নেই। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের চাপে কংগ্রেস শেষ পর্যন্ত তৃণমূলের সঙ্গে আঁতাত করলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না।

আর এবার? দেশজুড়ে এখন চলছে বিজেপির পক্ষে এবং বিপক্ষের হাওয়া। বিজেপির যেমন উত্থান ঘটছে, ঠিক তেমনি জনপ্রিয়তায় ভাটাও শুরু হয়েছে। বিজেপির ঘাঁটি মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, গুজরাট, মধ্য প্রদেশে, উত্তর প্রদেশ ও বিহারে স্থানীয় সরকার, সাংসদ ও বিধায়ক পদে উপনির্বাচনে কংগ্রেসের পক্ষে হাওয়া ঘুরেছে। কংগ্রেসের আসন বাড়ছে। কমছে বিজেপির। আর এটা বুঝেই ভবিষ্যতে দিল্লি দখলের স্বপ্ন নিয়ে মমতা এবার কংগ্রেসের হাত ধরতে চাইছেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সিপিএম বিধায়ক সুজন চক্রবর্তী বলেছেন, ‘দেখি, ওদের সম্পর্কটা এবার কত দিন থাকে?’