প্রশ্নপত্র ফাঁসের সকল দরজা-জানালা বন্ধ, তবু শঙ্কা

নিউজ ডেস্ক : এক দিন পর সারা দেশে এবং বিদেশি কেন্দ্রে একযোগে শুরু হবে উচ্চমাধ্যমিক পাবলিক পরীক্ষা। ধারাবাহিক ঘটে যাওয়া প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধে সম্ভাব্য সব ধরনের উদ্যোগ, কৌশল নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর পরও আশঙ্কা প্রশ্ন ফাঁস হবে না তো। এমন শঙ্কা শিক্ষা প্রশাসন, শিক্ষক, এমনকি ১৩ লাখ পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকের মনে। নীতিনির্ধারকরাও বলছেন, সব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রশ্নফাঁসকারীরা যদি সব পদক্ষেপের বাইরে গিয়ে নতুন কোনো কৌশলে প্রশ্ন ফাঁস করে, সে ক্ষেত্রে কী করার আছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষা শুরুর আধা ঘণ্টা আগে পরীক্ষার্থীদের নিজ আসনে বসা; সব প্রশ্নের সেট কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া; পরীক্ষা শুরুর ২৫ মিনিট আগে প্রশ্নের সেট কোড লটারির মাধ্যমে নির্ধারণ; কোচিং সেন্টার বন্ধ; প্রশ্নের প্যাকেটে বিশেষায়িত টেপ ব্যবহারসহ অন্তত আটটি কৌশল নেওয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এসব উদ্যোগের কারণে এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের সব দরজা-জানালা বন্ধ।
এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ২ এপ্রিল শুরু হয়ে ১৩ মে পর্যন্ত চলবে তত্ত্বীয়, এর পর ১৪ থেকে ২৩ মে চলবে ব্যবহারিক পরীক্ষা।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার দিন সকালে নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। অন্তত ১৭টি বিষয়ের পরীক্ষার মধ্যে ১২টির নৈর্ব্যত্তিক প্রশ্নের ‘খ’ সেট ফাঁস হয়। প্রতিদিন পরীক্ষার ২০ মিনিট, ৩০ মিনিট ও ৪০ মিনিট আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্নফাঁসের খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। প্রতিদিনের প্রশ্নফাঁসের খবরে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ কারণে এ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ পদত্যাগ করার গুজব ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। বিষয়টি নিয়ে ইমেজ সংকটে পড়ে সরকার। এমন অভিজ্ঞতা থেকে মন্ত্রণালয়ের কাছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা প্রশ্নফাঁসহীন অনুষ্ঠিত হওয়া একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরীক্ষা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, কিছু সংকট আমরা মোকাবিলা করছি। আগের থেকে আরও বেশি কঠোর অবস্থান নিয়েছি। অনেক বেশি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। অনেক বেশি পদ্ধতি ও কৌশল অবলম্বন করছি। সেদিক থেকে আমরা আশা করতে পারি এবার প্রশ্ন ফাঁস হবে না। তবে প্রশ্নফাঁসকারীরা যদি সব পদক্ষেপের বাইরে গিয়ে নতুন কোনো কৌশলে প্রশ্নফাঁস করে, সে ক্ষেত্রে আমাদের কী করার আছে।
ফেসবুকে প্রশ্নফাঁসের প্রসঙ্গে নাহিদ বলেন, ফেসবুকে আগে দেওয়া স্ট্যাটাস এডিট করে প্রশ্নফাঁসের বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়, যাতে দেখানো হয় প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। এগুলো করা হচ্ছে সরকারের বিরুদ্ধে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে। কিছু শক্তি এর পেছনে কাজ করছে। তারা সরকারের ভাবমূর্তি, জনপ্রিয়তা ও সাফল্যকে চাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এটা করে।
অভিভাবকরা নিজের সন্তানকে ভালোভাবে লেখাপড়া করানোর পরামর্শ দিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস বা ফাঁসের গুজবের পেছনে না ছোটার আহ্বান জানান শিক্ষামন্ত্রী।
প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, পরীক্ষা শুরুর ২৫ মিনিট আগে লটারি করে কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মোবাইলে এসএমএস করে কোন সেট প্রশ্নে পরীক্ষা হবে তা জানানো হবে। পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট আগে পরীক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলকভাবে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে হবে। বিশেষ কারণে কেউ ব্যর্থ হলে কেন্দ্র সচিব তার রোল নম্বরসহ বিস্তারিত লিখে রাখবেন। সঙ্গে সঙ্গে বোর্ডে তা জানাবেন। পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন বা ডিজিটাল ডিভাইস বহনে নিষেধাজ্ঞাও আগের মতোই বহাল থাকছে। কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কেউ মোবাইল ফোন বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন না। কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এমন মোবাইল ফোন ব্যবহার করবেন, যা দিয়ে ছবি তোলা যায় না।
এ বছর ১০টি বোর্ডের অধীনে ১৩ লাখ ১১ হাজার ৪৫৭ পরীক্ষার্থী অংশ নেবে। গত বছর অংশ নিয়েছিল ১১ লাখ ৮৩ হাজার ৬৮৬ জন। গত বছরের চেয়ে পরীক্ষার্থী বেড়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৭৭১ জন। পরীক্ষার্থী বৃদ্ধির হার ১০ দশমিক ৭৯ ভাগ। সাধারণ আটটি বোর্ডের অধীনে ১০ লাখ ৯২ হাজার ৬০৭ পরীক্ষার্থী অংশ নেবে। মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে ১ লাখ ১২৭ জন ও কারিগরি বোর্ডের অধীনে ১ লাখ ১৭ হাজার ৭৫৪ জন। বিদেশি কেন্দ্রে ৯৬৯ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেবে। এবার ৮ হাজার ৯৪৩টি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ২ হাজার ৫৪১টি কেন্দ্রে পরীক্ষা দেবে।
রাজধানীর ভিকারুন্নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের কয়েকজন অভিভাবক শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, গত পরীক্ষার কারা প্রশ্ন ফাঁস করবে, এর মূলহোতাদের সরকার গ্রেপ্তার কিংবা শাস্তি দিতে পারেনি। প্রতিটি দিন বাচ্চাদের নিয়ে একটা দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছি। এ পরীক্ষায় কী হবে, এখনো শঙ্কার মধ্যে আছি।
সুষ্ঠু পরিবেশে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে গঠিত জাতীয় মনিটরিং এবং আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে বিভিন্ন উদ্যোগের তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পরীক্ষা মানে আমার কাছে এক ধরনের আতঙ্ক। সব শক্তি, সব ব্যবস্থা নেওয়ার পরও আমরা নিশ্চিত হতে পারি না যে, পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হবে। বর্তমান প্রক্রিয়ায় কারো পক্ষে শতভাগ নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব না যে প্রশ্নপত্র ফাঁস হবে না। আবার প্রশ্নফাঁস ঠেকানো সম্ভব না, তা-ও বলব না। ফাঁস রোধে যত ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন নেওয়া হয়েছে। আশা করি, অতীতে যে ক্ষতি হয়েছে, তা আর হবে না।
জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা রয়েছে সব সেট প্রশ্নপত্র কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। প্রতিটি বিষয়ের প্রশ্নপত্র সেটের জন্য একটি খাম ব্যবহার করা হবে। খামটি সিলগালা নয়, খাম থাকবে একটি বিশেষায়িত সিকিউরিটি টেপ দিয়ে আটকানো। জেলা প্রশাসকরা পরীক্ষা শুরুর আগে যে কোনো দিন ট্রেজারিতে এ কাজ সম্পন্ন করবেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার বা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ওই সিকিউরিটি টেপ লাগাতে হবে। ট্রেজারি থেকে কেন্দ্রে প্রশ্ন নেওয়ার জন্য একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বা দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকবেন। ট্রেজারি বা থানা থেকে কেন্দ্র সচিবসহ পুলিশের পাহারায় কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র নিতে হবে। ম্যাজিস্ট্রেট বা দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, কেন্দ্র সচিব ও পুলিশ কর্মকর্তার উপস্থিতি ও স্বাক্ষরে প্রশ্নপত্রের প্যাকেট খুলতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে। কোনো কারণে অপারগ হলে আগের দিন জেলা প্রশাসককে জানাতে হবে।