নিউইয়র্কে স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উৎযাপন

বাপসনিঊজ, নিউইয়র্ক: ২৬ মার্চ ২০১৮ প্রতি বছরের ন্যায় এবারও যথাযোগ্য মর্যাদায় জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্য দিয়ে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস ২০১৮ উদযাপিত হয়েছে। সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে স্থায়ী মিশনে জাতীয় পতাকার আনুষ্ঠানিক উত্তোলন এবং স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী প্রদত্ত বাণী পাঠের মধ্য দিয়ে দিবসটির কর্মসূচি শুরু হয়।

বিকেল ৬টায় মিশনের বঙ্গবন্ধু মিলনায়তনে বিদেশী অতিথিদের জন্য দিবসটি উপলক্ষে অভর্থ্যনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির সেফ দ্য ক্যাবিনেট রাষ্ট্রদূত ফ্রান্টিসেক রুজিক্কা, জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব ফিল্ড সাপোর্ট এর আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল অতুল খারে, অষ্ট্রেলিয়া, ভারত, ব্রাজিল, কানাডা, সৌদিআরব, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, কুয়েত, ফিলিপাইন, বেলজিয়াম, দক্ষিণ আফ্রিকা ও কিউবাসহ প্রায় শতাধিক দেশের স্থায়ী প্রতিনিধি/উচ্চপর্যায়ের কূটনীতিক এবং জাতিসংঘ ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দ অনুষ্ঠানটিতে অংশগ্রহণ করেন।

এর আগে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। খবর বাপসনিঊজ। আমন্ত্রিত বিদেশী মেহমানদের স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য রাখেন জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন। তিনি বলেন, “এবারের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন আমাদের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ কারণ আমরা জাতীয়ভাবে উন্নয়নের বেশ কিছু মাইলফলক অর্জন করেছি। প্রথমবারের মতো এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন এরমধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এই অর্জন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণের পথে একটি বড় পদক্ষেপ। ইতোমধ্যেই আমরা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ শুরু করেছি। আগামী মাসে ফ্লোরিডার কেপ কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপন করা হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১”।

রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার, মাথাপিছু আয়ের ক্রমবৃদ্ধি, দারিদ্র্য সীমা হ্রাস, বৈদেশিক মুদ্রার রির্জাভ বৃদ্ধি ও রপ্তানী আয় বৃদ্ধিসহ নানাবিধ ইতিবাচক অর্থনৈতিক উপাত্ত তুলে ধরেন। রাষ্ট্রদূতের বক্তৃতায় উঠে আসে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন, পদ্মাসেতু ও অন্যান্য মেগা প্রকল্পসমূহের বাস্তবায়ন; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন, জলবায়ু পরিবর্তনে সক্ষমতা বিনির্মাণ এবং আইসিটি সহ ডিজিটাল বাংলাদেশে বিনির্মাণে আমাদের সাফল্যের কথা।

রাষ্ট্রদূত বলেন, “জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কৌশলের সাথে এজেন্ডা ২০৩০ কে একীভূত করে আমরা দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ড বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। আমাদের অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়ন পরিকল্পনা এমনভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে যাতে কোন নাগরিক পিছিয়ে না থাকে”।

বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিক্রমা সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত মাসুদ বলেন, “যুদ্ধবিদ্ধস্ত একটি দেশ থেকে আজকের এই উত্তরণের অন্তরালে রয়েছে সঙ্কট মোকাবিলা করে উন্নয়নের অদম্য স্পৃহা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের ঘুরে দাড়ানোর উপাখ্যান আর এটি সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্নদর্শী নেতৃত্বের কারণে”। তিনি বাংলাদেশের এই সাফল্যের জন্য জাতিসংঘসহ সকল উন্নয়ন অংশীদারদের ধন্যবাদ জানান।

রাষ্ট্রদূত বলেন, “আমরা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে আমাদের অংশগ্রহণের ৩০ বছর পূর্ণ করছি। এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমরা শান্তি বিনির্মাণ, টেকসই শান্তি, অভিগমন ও জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত জাতিসংঘের কর্মকান্ডে সুদৃঢ় ভূমিকা রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ”। বাংলাদেশ এক মিলিয়নেরও বেশি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে মর্মেও উল্লেখ করেন রাষ্ট্রদূত মাসুদ।

সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত করার আকাক্সক্ষার কথা পূর্ণব্যক্ত করেন রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি মিরো লাইচ্যাক এর বক্তব্য পাঠ করে শোনান তাঁর শেফ দ্য ক্যাবিনেট (Chef de Cabinet) রাষ্ট্রদূত ফ্রান্টিসেক রুজিক্কা (František Ružička)। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ আজ বিস্ময়কর অগ্রগতির পথে। বাংলাদেশের এই সাফল্য বিশ্ববাসীর জন্য একটি শুভ বার্তা। গর্বের বিষয়”।

বাংলাদেশের নাগরিকদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “ইতোমধ্যেই আপনারা পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু করেছেন। নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপন করতে যাচ্ছেন। এগুলো নি:সন্দেহে আপনাদের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন লক্ষ্য ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ অর্জন করতে সাহায্য করবে”। এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনকে তিনি একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে আখ্যা দেন।

এলডিসি গ্রুপের চেয়ার হিসেবে টেকনোলজি ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় ভূমিকাসহ জাতিসংঘে বাংলাদেশের তাৎপর্যপূর্ণ অবদানের কথা তিনি স্মরণ করেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের ৩০ বছর পূর্তির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে আপনারা এই দীর্ঘ সময়ে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বকে পূর্ণ করতে ব্যাপকভাবে সহযোগিতা করেছেন”। তিনি শান্তিরক্ষী মিশনে দায়িত্বরত অবস্থায় নিহত শান্তিরক্ষীদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন।

শেফ দ্য ক্যাবিনেট রাষ্ট্রদূত ফ্রান্টিসেক রুজিক্কা আরও বলেন,“সমৃদ্ধি অর্জনের অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য আপনাদের অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও দৃঢ় অধ্যবসায়েরই ফসলই আজকের এই সাফল্য”। বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে যাবে মর্মে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রায় জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সবসময়ই সাথে থাকবে মর্মে তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

বিদেশী মেহমানগণের সকলেই বাংলাদেশের অব্যাহত অগ্রযাত্রা, বিশেষ করে এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনের অসামান্য সাফল্যের জন্য বাংলাদেশ সরকার ও জনগণকে ধন্যবাদ জানান। তাঁরা প্রত্যাশা করেন আগামী দিনে সকল চ্যালেঞ্জ সফলতার সাথে মোকাবিলা করে বাংলাদেশ উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হবে।

অনুষ্ঠানটিতে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান, জেনোসাইড-৭১ ফাউন্ডেশন, যুক্তরাষ্ট্র-এর সভাপতি ড. প্রদীপ রঞ্জন কর, মুক্তিযোদ্ধা মুকিত চৌধুরীসহ যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা, সংস্কৃতি কর্মী, নাট্যকার, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যুক্তরাষ্ট্র শাখার নেতা-কর্মী ও বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশী নাগরিক উপস্থিত ছিলেন।

প্রিন্স, ঢাকা