বাংলাদেশের উন্নয়ন ভাবনা

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: বিদেশি শাসনের নিগড়ে আর্থ-সামাজিক শোষণ-বঞ্চনা আর বণ্টনবৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার বাঙালির ঐতিহাসিক মুক্তির সংগ্রাম দীর্ঘদিনের পথপরিক্রমায় ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক অধিকার অর্জনে চূড়ান্ত বিজয়ে বিভূষিত হয়। সমতটের এই ভূখ- ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে প্রকৃতির মিশ্র সহযোগিতাপ্রাপ্ত একটি দেশ। কর্কট ক্রান্তিরেখার ওপর বাংলাদেশের অবস্থান হয়েও মাথার ওপর হিমালয় পর্বত এবং পায়ের নিচে বঙ্গোপসাগর থাকায় বাংলাদেশ মরুভূমি নয় বরং মৌসুমি বায়ুম-ল ও নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়াবলয়ের কারণে সুজলা সুফলা। প্রকৃত অর্থে ‘এমন দেশটি (অন্য) কোথাও খুঁজে পাওয়ার নয়। ছিলও না। এ কারণেই দেশটির প্রতি বিদেশি বর্গি, হার্মাদ, হায়েনার আধিপত্যের আকাক্সক্ষা অতীতে প্রবল ছিল তো বটেই, হাজার বছরের ঔপনিবেশিক শাসন তার প্রমাণ। দেশটির আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থা ব্যবস্থায় বিদেশিদের বিদ্যমান আগ্রহ ও ভূমিকা সে নিরিখেই।

গাঙ্গেয় বদ্বীপ বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের বিচিত্র খেয়ালেরও শিকারÑ বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, সিডর, আইলা, গোর্কির গোলকধাধায় এর জীবনায়ন অর্জনে ঘটে থাকে নানা দুর্বিপাক। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে জলবায়ুর পরিবর্তন আর পরিবেশ দূষণের কবলে পড়ে হিমালয়ও এখন এ দেশটির জন্য আশীর্বাদের পরিবর্তে ক্রমেই হয়ে উঠছে অকাল বন্যা আর খরার কারণ। এসবের প্রভাবে এ দেশের জনগণ, তাদের মূল্যবোধ, কর্মস্পৃহা এবং জীবনযাত্রা প্রকৃতির এই মিশ্র স্বভাবসিদ্ধ। এ দেশের জনগণ সরলমনা, ভাবুক, কিছুটা পরিশ্রমী এবং অল্পে তুষ্ট। শারীরিক গঠন খাদ্যাভ্যাসের কারণে কঠোর ও দীর্ঘস্থায়ী কায়িক পরিশ্রমে অপারগ এ দেশের জনগণ প্রকৃতির খেয়াল-খুশির ওপর একান্তভাবে নির্ভরশীল। সঞ্চয়ের অভ্যাস তাই কম। এ দেশের অর্থনীতিও তাই প্রকৃতির এই মিশ্র স্বভাবে প্রভাবিত।

বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনীতি রাষ্ট্র্রীয় সীমানা ভূ-রাজনৈতিক অবকাঠামো অবস্থানের দ্বারাও বিশেষভাবে প্রভাবিত। বাংলাদেশের ৭৫ ভাগ সীমান্ত ভারতীয় উন্মুক্ত ভূমি, নদী ও পাহাড়ে পরিবেষ্টিত, ৫ ভাগ সীমান্ত মিয়ানমারের সঙ্গে পাহাড়িপথ এবং বাকি ২০ ভাগ সীমান্ত বিশ্বের সেরা ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনসহ সমুদ্র উপকূল-বঙ্গোপসাগরবিধৌত। বৃহতের পাশে ক্ষুদ্র একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পক্ষে স্বাধীন স্বয়ম্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা কিংবা মুক্তবাজার অর্থনীতির নির্দেশনা ও প্রতিযোগিতা মোকাবিলায় এবং স্থানীয় শিল্পের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণে যেসব প্রতিকূলতা সচরাচর ঘটে থাকে বাংলাদেশ তার থেকে ব্যতিক্রম নয় কোনোদিক দিয়েই।

বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিপ্রধান। বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের শতকরা ২৯ ভাগ আসে কৃষি ও তদসংশ্লিষ্ট খাত থেকে। সমতল ভূমির মোট জমির ৯২ ভাগ ব্যবহার হয় কৃষিকাজে আর কৃষিকে অবলম্বন করে জীবিকা নির্বাহ করে ৬৪ ভাগ মানুষ। কৃষি খাতে দেশের সিংহভাগ ভূমি ব্যবহৃত এবং এ খাতেই কর্মসংস্থানের অন্যতম উৎস। এ প্রেক্ষিতে কৃষিব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ, উচ্চফলনশীল শস্যের উৎপাদনে সহায়তাকারী বীজ, উপকরণ, সার ইত্যাদি সরবরাহ, কৃষককে সহজ শর্তে মূলধন জোগান এবং তার উৎপাদিত পণ্য ন্যায্যমূল্যে বিপণন ব্যবস্থা তদারকি করে কৃষিব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং কৃষি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদারকরণের মাধ্যমে কৃষিকেই দেশের জিডিপির অন্যতম জোগানদাতা হিসেবে পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে কৃষিনির্ভর শিল্প প্রতিষ্ঠা এবং কৃষির উন্নয়নকামী পদক্ষেপ; নদীমাতৃক দেশে পানিসম্পদের সদ্ব্যবহার এবং নদীশাসন ও নৌযোগাযোগ; জনবহুল জনপদের জনশক্তিকে সম্পদে রূপান্তর এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দেশীয় কাঁচামালের উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করে দেশজ সম্পদের সমাহার ঘটিয়ে উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণে স্থানীয় সঞ্চয়ের বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ, ব্যক্তি তথা বেসরকারি খাতের বিকাশ, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সম্ভাবনার বিকাশ বাংলাদেশের অর্থনীতি উন্নয়নের অন্যতম, বাঞ্ছিত ও কাক্সিক্ষত উপায়। স্বয়ম্ভর স্বদেশ এবং এর অর্থনীতির ভিত গড়তে সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণের যৌক্তিকতা এভাবেই উঠে আসে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণ এবং অনিষ্টকারী প্রভাব ও আক্রমণ থেকে রক্ষা করে কৃষিব্যবস্থাকে সম্ভবত নিরাপদ সাফল্যের দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ আশানুরূপ হলেই বাংলাদেশের সমৃদ্ধি সাধনে অনিশ্চয়তা ও ভবিতব্যের হাতে বন্দিত্বের অবসান ঘটবে। গবেষণার মাধ্যমে উচ্চফলনশীল শস্যের উৎপাদনে প্রযুক্তির বিবর্তন ঘটাতে হবে, শুধু রাসায়নিক সার ব্যবহার করে সাময়িকভাবে উৎপাদন বাড়ানোর ফলে জমির উর্বরাশক্তির অবক্ষয় ঘটতে থাকলে আখেরে চরম বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। খাদ্যশস্যের বর্তমান চাহিদা মেটাতে গিয়ে বিশেষ করে কৃষি এবং সার্বিকভাবে পরিবেশের ভবিষ্যৎ যাতে বিপন্ন না হয় সেদিকে লক্ষ রাখা বাঞ্ছনীয়। বাংলাদেশের নদীশাসনের উদ্যোগকে কার্যকর তথা পানিপ্রবাহ যথাযথ রেখে নদীর নাব্য বজায় রাখা আবশ্যক হবে। পানি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নেওয়া হলে কৃষিকাজ তো বটেই, সুপেয় পানির অভাবসহ পরিবেশ বিপন্নতায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারাতে পারে বাংলাদেশ। অপরিকল্পিতভাবে চিংড়ি চাষের মাধ্যমে কৃষিজমির যথেচ্ছ ব্যবহার দুঃসহ পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে। নৌপথে যোগাযোগের যে নেটওয়ার্ক নদীমাতৃক বাংলাদেশের, তা অত্যন্ত স্বল্পব্যয়ের হওয়া সত্ত্বেও উপযুক্ত পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের অভাবে সেটিও ক্রমেই হাতছাড়া যাতে না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি দেওয়া ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই। দ্রুত এবং সহজ যোগাযোগের উপায় হিসেবে সড়ক নেটওয়ার্কের তুলনামূলক উপযোগিতার বিষয়টি বিবেচনায় আসার অর্থ এই হতে পারে না যে, নৌপথ বিলুপ্তির মাধ্যমে তা বাস্তবায়িত হতে হবে। নৌপথের ন্যায্য বিকাশ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি ছাড়াও মৌসুমি বলয়ে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্যও অতিজরুরি। মাছ-ভাতের বাঙালির প্রধান দুই উপজীব্যের অস্তিত্ব ও বিকাশও তো দেশের অগণিত খাল-বিলের নাব্যের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশে প্রকৃত বিনিয়োগ ক্ষেত্র হলো কৃষি। এই কৃষি থেকে খাদ্য (ভাত, মাছ, সবজি ও শর্করা), বস্ত্র, বাসস্থানের সব ব্যবস্থা হয়। কৃষি খাতকে টেকসই করে তোলার মাধ্যমে অপরাপর সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণও স্বাভাবিক হতে পারে। বাংলাদেশের স্বয়ম্ভর উন্নয়ন ভাবনা এই চিন্তা-চেতনাকে অবলম্বন করে হওয়ার আবশ্যকতা অনস্বীকার্য।

দেশীয় শিল্প সম্ভাবনাকে উপযুক্ত প্রযতœ প্রদানের মাধ্যমে স্বয়ম্ভর শিল্প ভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব। দেশজ কাঁচামাল ব্যবহার দ্বারা প্রয়োজনীয় ফিনিশড প্রডাক্ট তৈরিতে দেশের শিল্প খাতকে সক্ষম করে তুলতে হবে এবং এর ফলে বিদেশি পণ্যের ওপর আমদানিনির্ভরতা তথা মহার্ঘ বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি ব্যয় হ্রাস পাবে। শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগে আর বৈদেশিক সাহায্যের ব্যবহারে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রত্যাশিত অগ্রগতির হিসাবসংক্রান্ত তুলনামূলক সারণিগুলোর সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান ও সম্পর্কের শুমার ও বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশ অর্থনীতির অগ্রগতি ও গতিধারা শনাক্তকরণে অসুবিধা হয় না। দেখা যায়, আমদানি ও রপ্তানির পরিমাণ জিডিপির অংশ হিসেবে ক্রমেই বৃদ্ধি পেলেও রপ্তানির মিশ্র প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। অস্থিতিশীল ও ভিন্নমাত্রিক ট্যারিফ স্ট্রাকচারের প্রভাব পড়েছে বহির্বাণিজ্যে ভিন্ন অনুপাতে। এতে বোঝা যায়, বিশ্ববাজারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাংলাদেশের বহির্বাণিজ্য সাধারণ সূত্র অনুসরণ করতে দ্বিধান্বিত হয়েছে। উৎপাদন না বাড়লেও সরবরাহ বাড়ার প্রবণতায় মূল্যস্থিতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছে অভ্যন্তরীণ বাজারে। আবার ইনফরমাল বর্ডার ট্রেডের ফলে দেশজ উৎপাদনের বিপত্তি ঘটতেই পারে। ইনফরমাল ট্রেড বাংলাদেশের বহির্বাণিজ্যের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অদৃশ্য এক অন্ধগলি ও কালো গর্ত হিসেবে কাজ করেছে। বাংলাদেশের আমদানিকৃত সামগ্রী অন্য দেশে পাচার হয়েছে আবার কোনো কোনো বিদেশি পণ্যের অবৈধ প্রবেশ ঠেকাতে গিয়ে আরোপিত ট্যারিফে দেশি সামগ্রী উৎপাদন ব্যবস্থার স্বার্থের সঙ্গে সংঘাত হয়েছে।

লেখক: ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান