অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়ন না হলে সত্যিকার উন্নয়ন সম্ভব নয়: মেনন

স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশের দলিত জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ এবং করণীয়সমূহ আলোচনার উদ্দেশ্যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং ক্রিশ্চিয়ান এইড এর সহয়তায় নাগরিক উদ্যোগ, আরডিসি এবং বিডিইআরএম এর যৌথ আয়োজনে ২৫ মার্চ, ২০১৮ সকাল ১০ ঘটিকায় স্পেকট্রা কনভেনশন সেন্টার (কুইন্স হল), বাড়ি নং-১৯, রোড নং-৭, গুলশান-১, ঢাকা-এ ‘দলিত জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নঃ চ্যালেঞ্জ এবং করণীয় বিষয়ক সংলাপ’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংলাপ এ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনাব রাশেদ খান মেনন, মাননীয় মন্ত্রী, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জনাব ইসরাফিল আলম, মাননীয় সংসদ সদস্য, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ; অড্রে মাইলট, সেকেন্ড সেক্রেটারি, টিম লিডার, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বাংলাদেশ; প্রফেসর ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা, সাম্মানিক সদস্য, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, বাংলাদেশ; প্রফেসর ড. মেসবাহ কামাল, চেয়ারপার্সন, রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট কালেকটিভ (আরডিসি); জনাব আব্দুর রাজ্জাক হাওলাদার, কর্মসূচি পরিচালক, হিজড়া এবং বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠী জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি, সমাজসেবা অধিদফতর; জনাব সাকেব নবী, কান্ট্রি ডিরেক্টর, ক্রিশ্চিয়ান এইড, বাংলাদেশ। সংলাপ সঞ্চালনা করেন জাকির হোসেন, প্রধান নির্বাহী, নাগরিক উদ্যোগ।

সংলাপে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ দলিত নারী ফেডারেশন এর সভাপতি মনি রানী দাস। মাঠ পর্যায়ের অর্জনসমূহ আলোচনা করেন কনসালটেন্ট রাবেয়া রওশন। তিনি “দলিত জনগোষ্ঠীর অধিক অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নের মাধ্যমে তাদের দৃশ্যমান মানবাধিকার ও সেবা প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করণ” প্রকল্পের কর্মএলাকা নওগাঁ, জয়পুরহাট, খুলনা ও যশোর জেলার ৭টি উপজেলার ২৫টি ইউনিয়নের দলিত জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক ও মানবাধিকার অবস্থার উপর আলোকপাত করেন।

তিনি তাঁর ধারণাপত্র পাঠের সাথে সাথে সরকারীভাবে দলিত জনগোষ্ঠীর পরিসংখ্যান, শিক্ষানীতিতে দলিত শিক্ষার্থীদেও অন্তর্ভূক্তি, বিভিন্ন আইনে অনগ্রসর উল্লেখ থাকলেও সুনির্দিষ্টভাবে দলিত শব্দ ব্যবহার, সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে দলিত শিশুদের নিয়ে বেশি বেশি কাজ করা উচিত বলে সুপারিশ করেন। এরপর আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ স্মারক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করেন।

প্রফেসর ডঃ মেসবাহ্ কামাল তার বক্তব্যে বলেন, দলিত জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি জরুরী। সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান হলে তাদের সমস্যা ও সংকট নিয়ে কাজ করার পথ তৈরী হবে। একইসাথে আগামী বাজেটে দলিত জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখার দাবী জানান। বৈষম্য বিলোপ আইনের প্রয়োজনীয়তার দিকে আলোকপাত করে তিনি অনতিবিলম্বে আইনটি পাস করার জন্য আইন মন্ত্রনালয়সহ সংশ্লিষ্টদের আন্তরিক হওয়ার আহবান জানান।

নিজ এলাকায় দলিত জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সমস্যা ও সমাধানে ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন, নওগাঁর আত্রাই উপজেলার সাহাগোলা ইউনিয়নের দলিত মানবাধিকার রক্ষাকর্মী (ডিএইচআরডি) দিনেশ কুমার পাল, দায়িত্বপালন করতে গিয়ে নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার বিষয় তুলে ধরেন যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার দরাজহাট ইউনিয়নের ডিএইচআরডি স্মৃতি রানী, সফলতার গল্প শোনান জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের সিবিও সদস্য সেতাবী রানী রবিদাস।

আয়োজকদের পক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ক্রিশ্চিয়ান এইড বাংলাদেশ এর কান্ট্রি ডিরেক্টর সাকেব নবী বলেন, সরকার ইতিমধ্যেই অনেক কাজ করেছেন। আগামীতেও যাতে অব্যহত থাকে, এমনটাই প্রত্যাশা সবার। ডিএইচআরডিদের কাজের ভূয়সী প্রসংশা করে নিজ সমাজে কাজ করার অপার সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি তাদের নিয়ে এই পদ্ধতিতে কাজ করতে আহবান জানান।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন বিভিন্ন প্রসংশনীয় উদ্যোগ ও চলমান কর্মসূচির বিষয়ে আলোকপাত করে জনাব আব্দুর রাজ্জাক হাওলাদার, কর্মসূচি পরিচালক, হিজড়া এবং বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠী জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি, সমাজসেবা অধিদফতর বলেন, অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কল্যানে আমরা যথেষ্ট আন্তরিক।

প্রফেসর ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা, সাম্মানিক সদস্য, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, বাংলাদেশ বলেন, নারী ও দলিত নিয়ে আমাদের কাজ অব্যহত রাখতেই হবে। এবিষয়টি স্থানীয়, জাতীয় এমনকি নিজ পরিবার-সমাজে চর্চা করতে হবে। তিনি সমাজসেবা অধিদপ্তরে দলিত শব্দ বাদ দিয়ে অনগ্রসর লেখার কারনে দলিতরা বঞ্চিত হচ্ছে উল্লেখ করে আবারও দলিত শব্দ ব্যবহার করার উপর জোর দেন। তিনি আরও বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন একা কিছু করতে পারবেনা। আলাদা করে দলিত কমিশন দরকার যেখানে দলিতরাই পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন।

আয়োজনে মাঠ পর্যায়ে কর্মরত দলিত মানবাধিকারকর্মীগণ ছাড়াও দলিত নেতৃবৃন্দ, সরকারি, বেসরকারি, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

অড্রে মাইলট, সেকেন্ড সেক্রেটারি, টিম লিডার, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বাংলাদেশ বলেন, পিছিয়ে পড়া ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশে দলিতদের সুরক্ষায় বৈষম্য বিলোপ আইন জরুরী। সরকার যাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেন তার জন্য আহবান জানান।

উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন বিডিইআরএম এর সাধারণ সম্পাদক বিভূতোষ রায়, ডিএইচআরডি চন্দন কুমার বাঁশফোর, ইউনাইটেড ন্যাশন এর মানবাধিকার বিষয়ক কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন, বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস্ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এর নির্বাহী পরিচালক মাহাবুল হক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা সৈয়দা দিলরুবা আক্তার প্রমুখ।

সংসদ সদস্য জনাব ইসরাফিল আলম বলেন, ১০ কোটি থেকে শুরু হলেও বর্তমান অর্থ-বছরে ২৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এটি অনেকটাই আশাব্যঞ্জক খবর। তবে আরও বাড়ানো উচিত।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, “ অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়ন না হলে সত্যিকার উন্নয়ন সম্ভব নয়। কাউকে পিছিয়ে ফেলে নয়। আমাদের সবাইকে নিয়েই এগুতে হবে। বর্তমান মন্ত্রনালয়ে দায়িত্ব নেওয়ার ফলে আমার আরও অনেকবেশি জানার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ২০০৮ সালে উত্থাপিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় নিয়ে আসা শুরু হয়। আমি অর্থমন্ত্রীর সাথে আলাপ করে জেনেছি আগামীতে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়বে। দলিত বাদ দিয়ে অনগ্রসর শব্দ ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন এতে করে কর্মসূচির কোন ব্যতয় ঘটার কথা নয়।

তবে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলে সুবিধাভোগীদের সমস্যায় পড়তে হতে পারে। মূলত উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার পথে ‘দলিত’ শব্দটি স্ববিরোধী ও দৃষ্টিকটু বিধায় ‘অনগ্রসর’ শব্দটি ব্যবহার করতে হয়েছে। ২০০৪ সালে প্রতিবন্ধি জড়িপ হলেও অনেক প্রতিবন্ধি বাদ পড়ে গেছে। তেমনিভাবে আমরা চেষ্টা করবো অনতিবিলম্বে এই অনগ্রসর জনগোষ্ঠীদের একটি জড়িপ করতে পারি কিনা। বৈষম্য বিলোপ আইন প্রণয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই সময়ের মধ্যে আমরা হয়তো সফল হতে পারবো না। কেননা এটি অনেক লম্বা একটি প্রক্রিয়া। তবে আগামীতে এবিষয়ে ভালো খবর আসবে।”

এরপর সমাপনী বক্তব্য রাখেন নওগাঁর আত্রাই উপজেলার আহসানগঞ্জ ইউনিয়নের দলিত মানবাধিকার রক্ষাকর্মী স্বপন কুমার দাস। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিডিইআরএম এর সভাপতি সুনীল কুমার মৃধা।