ইতিহাসের ফাঁদে আটকা দেশ

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম:   বিভিন্ন সমাজব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হতে হতে মানবসভ্যতা আজ তার বর্তমান রূপ গ্রহণ করেছে। একেবারে গোড়ার প্রাগৈতিহাসিক যুগে ছিল আদিম সাম্যবাদী সমাজ। তার পর পর্যায়ক্রমে এসেছে দাস সমাজ, সামন্তবাদী সমাজ ও পুঁজিবাদী সমাজ। এখন সূচিত হয়েছে পুঁজিবাদী সমাজ থেকে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের ক্রান্তিকালীন যুগ। পূর্বেকার সময়ের মতো এবারও এই উত্তরণকালীন পর্ব হয়তো দুই-তিন শতাব্দীকাল ধরে বিস্তৃত হবে। তবে ইতিহাস বলে, এটিই হলো ‘ইতিহাসের ধারা’। সেই ‘ইতিহাসের ধারার’ পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করলে এখন বাংলাদেশ বলতে গেলে এক অন্তহীন ‘অচলায়তনের’ পরিস্থিতির মধ্যে আটকে আছে। সমাজব্যবস্থার বিবর্তনের এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার বিবেচনায় দেশ বর্তমানে এক ধরনের ‘ইতিহাসের ফাঁদে’ বন্দি হয়ে আছে।

‘অচলায়তনের’ কথায় আপত্তি জানিয়ে অনেকে বলার চেষ্টা করে থাকেন, কোথায় অচলায়তন? কত দিক দিয়ে দেশ তো লক্ষণীয়ভাবে এগোচ্ছে। এ বিষয়ে তাদের কাছে নানা পরিসংখ্যানেরও অভাব নেই। অভাব নেই ‘উন্নয়নের’ প্রমাণস্বরূপ নানা সূচকের। এগুলো হাজির করে তারা বলতে চাচ্ছে, দেশ তো এগোচ্ছে। ‘অচলায়তনে’ আটকা পড়াটি তবে কোথায়?
প্রথমে ‘উন্নয়নের’ পরিসংখ্যানের বিষয়টির দিকে নজর দেওয়া যাক। এ কথা জানা থাকা দরকার যে, পরিসংখ্যানকে খুবই প্রতারণাপূর্ণভাবে অপব্যবহার করা যায়। ধরা যাক মাথাপিছু আয়ের হিসাবের কথা। জানা যায়, বর্তমানে মাথাপিছু আয় সোয়া লাখ টাকার পরিমাণকে ছাড়িয়ে গেছে। এ কথা থেকে এ রকম একটি ভুল ধারণা হতে পারে যে, প্রতিটি নাগরিকের বার্ষিক আয় বেড়ে এখন সোয়া লাখ টাকার ওপরে উঠে গেছে। যদি তাই হতো তা হলে আমরা হয়তো বলতে পারতাম যে, বাংলাদেশ এখন ‘সোয়া লাখ টাকার ওপরের আয়ের’ মানুষের দেশে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু তেমনটি মোটেও ঘটেনি।

৯৯ শতাংশ মানুষের আয় মাত্র যৎসামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু হয়তো দেড়-দু’শ ব্যক্তির প্রত্যেকের হাতে শুধু সোয়া লাখ নয়, সোয়া লাখ কোটি টাকার মতো করে সম্পদের পাহাড় জমানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। শুধু এই দেড়-দু’শ ব্যক্তির আয় যোগ করে তা থেকে গড় হিসাব কষে দেখানো সম্ভব যে, ১৬ কোটি মানুষের মাথাপিছু আয় সোয়া লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। সে জন্য অধিকাংশ মানুষের আয় বাড়ার প্রয়োজন হয়নি। ‘মাথাপিছু আয়’ আর ‘প্রত্যেকের আয়’Ñ এ দুটি বিষয় এক বিষয় নয়। ‘মাথাপিছু আয়’ কত হলো, তাতে ৯৯ শতাংশ মানুষের কিছু একটা তেমন আসে যায় না। তাদের আগ্রহ ‘প্রত্যেকের আয়’ সোয়া লাখ টাকা হোক। কিন্তু তা হচ্ছে কই?

‘উন্নয়নের’ যে মডেল ধরে গত চার দশককাল এ দেশ পরিচালিত হচ্ছে তাতে অল্পকিছু মানুষ কল্পনাতীত পরিমাণে সম্পদশালী হয়ে উঠেছে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে শুধু তার ছিটেফোঁটা মাত্র এসে পৌঁছাতে পেরেছে। ফলে বৈষম্য বেড়েছে। সে বৈষম্য ক্রমাগত আরও কুৎসিত রূপ ও বিপজ্জনক মাত্রা পেয়ে চলেছে। শাসকশ্রেণি ও তার পক্ষের প-িতরা তত্ত্ব দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছেন, ‘উন্নয়নের’ স্বার্থেই কিছু লোকের হাতে সম্পদের পাহাড় জমতে দেওয়া উচিত। চুরি-বাটপারি-দুর্নীতি-লুটপাট যে পন্থায়ই তা করা হোক না কেন এবং তাতে বৈষম্য যতই বৃদ্ধি পাক না কেন, ‘উন্নয়নের’ স্বার্থে তা করতে দিতে হবে। তাদের মতে, এসব নাকি হলো ‘উন্নয়নের প্রসববেদনা’। এই বেদনা সহ্য করতে হবে। তবে এই তথাকথিত ‘উন্নয়নের প্রসববেদনা’ কেবলই শুধু ৯৯ শতাংশ মানুষকে কেন সহ্য করতে হবে, ‘সৌভাগ্যবান’ ১ শতাংশ কেন তা থেকে মুক্ত থেকে শুধু ‘উন্নয়নের ফসলটুকু’ রাজার হালে উপভোগ করবেÑ সে প্রশ্নে তারা একেবারেই নিশ্চুপ।

তাদের কথা হলো, কিছু ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত এই সম্পদ নাকি এক সময় ‘চুইয়ে পড়ে’ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিচের তলার ব্যাপক গরিব জনগণের হাতে পৌঁছাবে। অর্থাৎ ১ শতাংশ তাদের পাওনার চেয়ে লাখ-লাখ গুণ বেশি পেতে থাকবে নগদ-নগদ, আর অবশিষ্ট ৯৯ শতাংশের ক্ষেত্রে তা থাকবে বাকি। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই বাকি হলো শুভঙ্করের ফাঁকি। এটিই হলো পুঁজিবাদের নয়া-উদারবাদী বাজার-মৌলবাদভিত্তিক তথাকথিত উন্নয়ন মডেল। বিশ্বসাম্রাজ্যবাদ ও বহুজাতিক করপোরেট পুঁজির ওপর নির্ভরশীলতা ও বেপরোয়া লুটপাটতন্ত্র হলো এই মডেলের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। চার দশক ধরে বাংলাদেশ এই একই অর্থনৈতিক দর্শন ও ‘উন্নয়ন’ মডেলের ‘অচলায়তনে’ বন্দি হয়ে আছে। দেশকে আজ ‘মুক্তবাজার ব্যবস্থার’ নামে সাম্রাজ্যবাদনির্ভর লুটেরা ব্যবস্থা তথা পুঁজিবাদী নয়া-উদারবাদের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার ‘অচলায়তনে’ আটকে রাখা হয়েছে।

‘উন্নয়নের’ প্রসববেদনায় কাতর জনগণ যেন বিদ্রোহ না করে বসতে পারে সে জন্য রাজনীতির ক্ষেত্রেও একটি তত্ত্ব হাজির ও কার্যকর করা হচ্ছে। তা হলোÑ ‘উন্নয়ন আগে, গণতন্ত্র পরে।’ তারা বলতে চাচ্ছেন, জনগণকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে ‘উন্নয়নের’ তিতো ওষুধ খাওয়াতে হলে তাদের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাক্সক্ষার সবকিছুর প্রতি সব সময় গুরুত্ব দিলে চলবে না। জনগণকে তাদের মন খুলে সব সময় সব কথা বলতে দেওয়া যাবে না, চিৎকার করতে দেওয়া যাবে না, কাঁদতে দেওয়া যাবে না। ‘উন্নয়নের’ স্বার্থে সবাইকে নীরবে সব কষ্ট হজম করে যেতে হবে। সব অন্যায় সহ্য করে যেতে হবে। গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকারকে খর্ব করে রাখতে হবে। অন্যথায় অবাধে লুটপাটের কারবার চলবে কীভাবে? আর অবাধ লুটপাট না চললে ১ শতাংশের হাতে বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভূত হবে কীভাবে? এবং তা না হলে তাদের তথাকথিত ‘উন্নয়ন’ হবে কীভাবে?

এই পুঁজিবাদী ‘উন্নয়ন মডেলের’ সঙ্গে দেশি-বিদেশি লুটেরাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ সরাসরি জড়িত। শোষকশ্রেণি তথা সাম্রাজ্যবাদ ও দেশীয় লুটেরা ধনিক শ্রেণি দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এমন একটি অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সমাজ ও রাষ্ট্রকে পরিচালনা করছে যার দ্বারা যেন তার মাধ্যমে তাদের শোষণ প্রক্রিয়া স্থায়ীভাবে চালু থাকে। প্রচার-প্রচারণা, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় গণমাধ্যম, শিক্ষাব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক জগৎ, ‘সিভিল সোসাইটির’ নামে তারা সমাজের একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী, ভাড়াটিয়া দালাল, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয় ইত্যাদি সব উপাদানকে সে উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে। তাদের শোষণব্যবস্থা স্থায়ীভাবে বলবৎ রাখার কাজে তারা সমাজের এসব কাঠামোকে নিযুক্ত করছে। এ জন্য তারা বিপুল অর্থ ব্যয় করছে।

দেশের বড় দুটি বুর্জোয়া দল তথা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলই এই শোষণ ও বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক নীতিতে দেশ চালাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাই এ দুটি দল যেন দেশের রাজনৈতিক পরিম-লে একচ্ছত্র প্রাধান্য বিস্তার করে রাখতে পারে সে জন্য শোষকশ্রেণি দেশে একটি দ্বিমেরুকরণভিত্তিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে। বিকল্প হয়ে ওঠার সম্ভাবনাপূর্ণ অন্য সব দল যেন প্রান্তস্থিত হয়ে থাকে, তার ব্যবস্থা করেছে। এমতাবস্থায় দেশে বাম-গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তি গড়ে তোলা এখন একটি প্রধান কর্তব্য হয়ে উঠলেও সে কর্তব্য পালন কঠিন করে তোলা হয়েছে। ফলে বাম-গণতান্ত্রিক শক্তির দৃশ্যমান উপস্থিতিও সহসা উদয় হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রেও এক ধরনের ‘অচলায়তন’ বিরাজ করছে।

দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিগুলো যেন কোনোভাবে সাম্রাজ্যবাদ ও লুটেরা ধনিক শ্রেণির প্রভাবের বাইরে না যেতে পারে সে জন্য তারা দেশে এক ধরনের ‘নিয়ন্ত্রিত নৈরাজ্যের’ অবস্থা সৃষ্টি করে রেখেছে। দুটি বুর্জোয়া দলের মধ্যে স্থায়ী সংঘাত জিইয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছে। এর পাশাপাশি জামায়াত-হেফাজতের মতো সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধ জঙ্গি শক্তিকে তারা লালন-পালন করছে। বিভিন্ন উগ্র সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গি শক্তিকে তাদের ষড়যন্ত্রের স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে ব্যবহার করছে। বুর্জোয়া দল দুটির গণবিরোধী কাজ ও রাজনৈতিক দেউলিয়াপনার সুযোগ নিয়ে এসব অপশক্তি জনগণকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হচ্ছে। তারা একদিকে সাম্প্রদায়িকতার সামাজিকীকরণ ঘটিয়ে চলেছে ও সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্ঘাত চালিয়ে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে। এ অবস্থার নিরসনেরও লক্ষণ নেই। এটিও ‘অচলায়তনের’ একটি নিদর্শন।

যদি ‘অচলায়তনের’ এই বন্দিদশা থেকে নিষ্কৃতি পেতে হয় তা হলে প্রশ্ন আসে, সেই শিকল ভাঙার কাজ শুরু করতে হবে কোথা থেকে, কীভাবে? শিকল ভাঙার কাজটি খুবই জটিল ও কঠিন। কারণ শোষকদের কাঠামোগত সিস্টেমটাই এমনভাবে গড়া যে, সে সিস্টেমের বৈরী উপাদানকে গোটা সিস্টেমের মধ্যে ধারণ করেই তারা তাদের শোষণব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে সক্ষম। কিন্তু সবকিছুকেই একভাবে বা অন্যভাবে সিস্টেমের মধ্যে ধারণ করতে সক্ষম হলেও ব্যাপক জনগণের স্বার্থকে পরিপূর্ণভাবে ধারণ করার ক্ষমতা এই সিস্টেমের নেই। সে কারণে একমাত্র এই বঞ্চিত জনগণই হয়ে উঠতে পারে ‘অচলায়তনের’ শিকল ভাঙার প্রধান কারিগর। সেই জনগণের প্রাণশক্তি ও শিকড় রয়েছে তৃণমূলে। ‘অচলায়তনের’ শিকল ভাঙার কাজটি সূচনা করার ভিত্তি তাই রচিত হতে পারে প্রধানত তৃণমূল থেকে ও জনগণের দ্বারা। এ কারণে তৃণমূলের কাজ ও জনগণের মাঝে কাজকে গুণগত নতুন মাত্রায় প্রসারিত করার মাঝেই নিহিত রয়েছে বিদ্যমান ‘অচলায়তন’ ভাঙার চাবিকাঠি।

ইতিহাস এ কথাই বলে যে, শেষ বিচারে ‘জনগণ এবং একমাত্র জনগণই ইতিহাস নির্মাণ করে।’ তবে জনগণ তা সব সময় সচেতনভাবে করে না। যুগ যত এগিয়েছে, ইতিহাস নির্মাণে জনগণের ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে তাদের সচেতনতার গুরুত্বও তত বেড়েছে। বাংলাদেশে বিদ্যমান ‘অচলায়তন’ ভাঙতে হলে সেই সচেতনতা গড়ে তোলা বিশেষভাবে প্রয়োজন। অগ্রসর চেতনাসম্পন্ন মানুষদেরই তৃণমূলের জনগণের মাঝে সেই চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিতে হবে।

এ কথা অবশ্য ঠিক যে, বিশেষ বিশেষ সময়ে ওপর থেকে সূচিত কোনো উদ্যোগ মুহূর্তে বিশাল গণজাগরণ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। কিন্তু সে জন্য হাঁ করে চুপচাপ বসে থাকাটি হবে অর্থহীন। শুধু তাই নয়, নিশ্চুপ বসে বসে শুধু অপেক্ষায় সময় কাটালে ‘অচলায়তনের’ শিকড় আরও শক্তভাবে গেড়ে বসতে থাকবে। তাই তৃণমূলে জনগণের মাঝে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়াটি এখন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

‘ইতিহাসের ধারায়’ দেশকে এগিয়ে নিতে হলে তৃণমূলে জনগণের মাঝে এ ধরনের লাগাতার কাজ কাউকে না কাউকে করতেই হবে। এ কাজ না করলে চিরস্থায়ীভাবে ‘অচলায়তনে’ আটকা পড়ে থাকতে হবে। দেশের প্রকৃত বামপন্থি দলগুলোকে এ ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শন করতে হবে। এসব কাজের জন্য বুর্জোয়াদের ওপর নির্ভর করা যায় না। কোন দুঃখে তারা ‘নিজের খেয়ে’ এ ধরনের ‘প-শ্রম’ করবে? দেশের বামপন্থি দল ও শক্তি-ব্যক্তিরাই এ ক্ষেত্রে ভরসা।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি