বাণিজ্যে গতি আনতে প্রয়োজন বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি

নিউজ ডেস্ক:  অর্থনীতিতে আমদানি রফতানি বাণিজ্যের গুরুত্ব বাড়ছে দিনে দিনে। কয়েক দশক আগেও বাংলাদেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের পরিমাণ এখনকার মত এতোটা ব্যাপক ছিল না। এখন আমদানি পণ্যের আইটেম যেমন বেড়েছে, পরিমাণও বেড়েছে অনেক। একইভাবে রফতানির কথা উল্লেখ করতে হয়। অতীতে পাট, চা, চামড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল আমাদের রফতানি বাণিজ্য। অথচ এখন বিশ্বের অন্যতম গার্মেন্টস পণ্য রফতানিকারক দেশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বাংলাদেশ। সারাবছরই গার্মেন্টস সামগ্রী রফতানি হচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। এর বাইরেও বিভিন্ন ধরনের পণ্যসামগ্রী এখান থেকে বিদেশে রফতানি হচ্ছে। মূলত পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ থাকায় বিভিন্ন স্থলবন্দরের মাধ্যমে সড়কপথে আমদানি রফতানি কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে। যদিও দেশের মোট আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের খুব সামান্য একটা অংশ সড়কপথে পরিবহণ সম্ভব হচ্ছে। তবে আমাদের আমদানি রফতানি বাণিজ্যের বড় একটা অংশ সমুদ্রপথে চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে বিদেশ যাচ্ছে এবং দেশে আসছে। আকাশপথে আমদানি ও রফতানি কার্যক্রম পরিচালিত হলেও সেটা খুব বেশি নয়। সমুদ্রপথেই আমাদের বেশির ভাগ আমদানি পণ্য দেশে আসছে বর্তমানে। এ ক্ষেত্রে দেশের দুটি প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম ও মংলার পাশাপাশি পায়রা সমুদ্র বন্দরকেও ব্যবহার করা হচ্ছে। আবার রফতানি ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্র বন্দর ব্যবহূত হচ্ছে। তবে চট্টগ্রাম বন্দরই দেশের আমদানি রফতানি বাণিজ্যে মূল নিয়ামক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু আমদানি রফতানি বাণিজ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা নিয়ে এখন বিভিন্ন মহল থেকে কথা উঠছে।

আমদানিকারক রফতানিকারকদের মধ্যে এ নিয়ে হতাশা, ক্ষোভ বাড়ছে দিনে দিনে। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কনটেইনারে আমদানি করা পণ্য হাতে পেতে গত দুই দশকের মধ্যে এখন সবচেয়ে বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, গতবছর গড়ে প্রতিটি কনটেইনারের পণ্য হাতে পেতে পেতে চারদিনের বেশি বা ১০৩ ঘণ্টা সময় লেগেছে। নতুন বছরের শুরুতেও এ অপেক্ষার সময় কমেনি। আমদানিকৃত পণ্য বুঝে পেতে সময় বেশি লাগায় ব্যবসায়ীরা দু’ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। প্রথমত আমদানিকারকরা দেরিতে কাঁচামাল হাতে পাওয়ায় কারখানায় উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। আবার যথাসময়ে পণ্য না পাওয়ায় বাজারজাতও করা যাচ্ছে না সময়মতো। দ্বিতীয়ত দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে খরচ বেড়ে যাওয়ায় জাহাজ কোম্পানিগুলো পরিবহণ ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। আমদানিকারকদের এ বাড়তি ভাড়া পরিশোধ করতে হয়, শেষ পর্যন্ত যা ভোক্তার কাছ থেকে আদায় করেন ব্যবসায়ীরা। অর্থাত্ বন্দর সুবিধার অভাবের বাড়তি খরচের দায় মেটাতে হচ্ছে ভোক্তাদেরই।

আমাদের বাংলাদেশে সমুদ্র ও বিমানবন্দরে পণ্য খালাসে ধীরগতির চিত্র ফুটে উঠেছে জাপানের বৈদেশিক বাণিজ্য সহায়তা সংস্থা জেট্রোর একটি জরিপে। যেখানে বলা হয়েছে, বন্দরে বাংলাদেশের মতো এতো বেশি সময় এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অন্য কোনো দেশে লাগে না। জেট্রোর জরিপ অনুযায়ী, দেশের বন্দরে একটি হাজার আসার পর গড়ে ২০ দশমিক ৪ দিন লাগে পণ্য খালাস করতে বিমানবন্দরে লাগে ৮ দশমিক ৭ দিন। দুই বন্দরের দিক থেকেই ১৮টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বাংলাদেশের। জেট্রোর জরিপে মূলত জাপানি কোম্পানিগুলোর মতামত উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ১৮টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে তাইওয়ান ও লাওস। তাইওয়ান সমুদ্র বন্দরে পণ্য খালাসে সময় লাগে ৫ দশমিক ৮ দিন। আর লাওসের লাগে ২ দশমিক ১ দিন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে আছে প্রতিযোগী দেশ কম্বোডিয়া, ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তানসহ অন্যরা।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জাপানের কোম্পানিগুলো সবচেয়ে বড় সমস্যার কথা বলেছে কাঁচামাল ও খুচরা যন্ত্রাংশ সংগ্রহকে। তাদের চোখে দ্বিতীয় সমস্যা অপর্যাপ্ত অবকাঠামো ও পরিবহণ সুবিধা। বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ কাঁচামাল সংগ্রহ করা যায়। বাকিটা আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদেরও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কাঁচামাল বিদেশ থেকে আনতে হয়। এর পাশাপাশি রফতানিতেও বন্দরের জন্য ভুগতে হচ্ছে। বাংলাদেশে উত্পাদিত পণ্যের মান এখন অনেক উন্নত হয়েছে। পণ্যের মান ও দামে আমরা পিছিয়ে নেই। কিন্তু সঠিক সময়ে পণ্য যদি ক্রেতার হাতে পৌঁছানো না যায় তাহলে এই প্রতিযোগিতা সক্ষমতার কোনো মূল্য নেই। সমুদ্রপথে ইতালি থেকে কোনো জুতা প্রস্তুতের কাঁচামাল আমদানি করতে সময় লাগে ৫৪ দিন। এই ব্যবসায় যেখানে ৬০ দিন সময়সীমার মধ্যে পণ্য ক্রেতার হাতে পৌঁছানোর কথা, সেখানে কাঁচামাল আমদানিতে এতো সময় লাগলে আর কিছুই করার থাকে না। গতবছর ২০১৭ সালে পণ্য আমদানি বেড়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরে অপেক্ষার সময় আরো বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময় জাহাজগুলোকে বন্দরে ভিড়তে ১৭ দিন সময়ও লেগেছে।

বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, বন্দরে কনটেইনারে পণ্য পরিবহণ বাড়লেও গত ১০ বছরে অবকাঠামো সুবিধা তেমন বাড়েনি। তৈরি হয়নি নতুন কোনো জেটি। এর ফলে বর্তমানে জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সীমিত অবকাঠামো ব্যবহার করে সেবার পরিধি বাড়াতে গিয়ে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। পণ্য খালাসে গতি আনতে নতুন যেসব জেটি নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, সেগুলো সময়মতো শেষ হচ্ছে না। গতবছর বেশি সময় ধরে সাগরে পণ্যবাহী জাহাজগুলো ভেসে থাকায় চট্টগ্রাম বন্দর রুটে ফিডার জাহাজ পরিচালনাকারীদের খরচ বেড়ে গেছে। বন্দরের প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে হিসাব করে দেখা যায় গত ২০১৭ সালে ফিডার জাহাজ পরিচালনাকারীদের বাড়তি খরচ হয়েছে ৫৩৩ কোটি টাকা।

২০১৬ সালে তা ছিল ৩২১ কোটি টাকা। ২০১৫ সালে ছিল মাত্র ৯৩ কোটি টাকা। এই খরচ কনটেইনার পরিবহণের ভাড়া বাড়িয়ে তুলে নেওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কনটেইনারে পণ্য আমদানিতে একক খাত হিসেবে শীর্ষে রয়েছে। ব্যবসায়ীরা মূলত কাপড়, সুতা ও অন্যান্য এক্সেসরিজ সামগ্রী আমদানি করেন কনটেইনারে। এই কাঁচামাল দিয়ে পণ্য উত্পাদন করে তা পরে বিদেশে রফতানি করা হয়। পোশাকের পরই অবস্থান বিভিন্ন শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সবার অভিমত হলো- চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা উন্নয়নে জেটি, যন্ত্রপাতি ও কনটেইনার রাখার টার্মিনাল সুবিধা বাড়ানো দরকার। গত ১০ বছরে বন্দরে পণ্য পরিবহণের চারটি টার্মিনাল নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এগুলোর মধ্যে একটিও নির্মাণ করা হয়নি। পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল ২০১৯ সালে, লালদিয়া বহুমুখী টার্মিনাল ২০২০ সালে ও বে-টার্মিনাল ২০২১ সালে চালুর কথা রয়েছে। এ তিনটি টার্মিনালের একটিও সময়মতো চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। জেটির পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতির দিক থেকেও পিছিয়ে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। বন্দরে জাহাজ থেকে কনটেইনার নামানোর বড় যন্ত্র ‘গ্যান্ট্রি ক্রেন’ কেনা হয়নি দীর্ঘদিনেও। এই আধুনিক যন্ত্র সংগ্রহের জন্য অনেকবার উদ্যোগ গ্রহণ করেও পারেনি বন্দর কর্তৃপক্ষ। ওদিকে বাংলাদেশের বন্দরে সময় বেশি লাগায় ব্যবসায়ীরা ভারতের বন্দর ব্যবহার করে পণ্য রফতানি প্রস্তাব দিয়েছে। এ অবস্থায় চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের সার্বিক উন্নয়ন কার্যক্রমকে জোরদারের বিকল্প নেই। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও মহলকে মনোযোগী হতে হবে।

দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যকে আরো গতিশীল ও ফলপ্রসূ করার ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দরসহ অন্য সমুদ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। দেশের দ্রুত অগ্রসরমাণ উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বন্দরের পণ্য লোড-আনলোড দ্রুতকরণ, গ্যান্ট্রিক্রেন ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সংখ্যা বাড়ানোসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার। বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতু চালু হলে মংলা ও পায়রা বন্দরের গুরুত্ব অনেক বেড়ে যাবে। সুতরাং ব্যবসা-বাণিজ্যসহ দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে সব বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো এবং সেবার মানোন্নয়নে কাজ করতে হবে সংশ্লিষ্ট সবাইকে।