শহীদ শব্দ নিয়ে বিতর্ক

সাইফুল ইসলাম: তিরিশ লাখ মানুষের রক্ত আর দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ। পাকিস্তানি হানাদার ও তার দোসররা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হত্যা-নির্যাতন করেছে বাঙালিদের। সেই দেশের সিরাজগঞ্জ জেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে প্রশ্ন উঠেছে, স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মাহুতি দেওয়া হিন্দু বা অন্য ধর্মাবলম্বীরা কি শহীদ? অবাক হওয়ার মতো কথা হলেও এ প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

ঘটনাটা একটু খোলাসা করেই বলা যাক। ‘পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তার দোসরদের হাতে নিহতদের শহীদের মর্যাদ দাও’- শ্লোগানকে সামনে রেখে সম্প্রতি গঠিত হয়েছে সিরাজগঞ্জের গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটি। এই কমিটি হানাদার বাহিনী ও তার দোসরদের হাতে নিহতদের তালিকা করছে। ওই তালিকায় নিহতদের নামের পাশে ‘শহীদ’ লিখে টাঙিয়ে দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট এলাকায়। এমনি একটি তালিকা টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে সিরাজগঞ্জ শহরের পাশ্ববর্তী শিয়ালকোল বাজারে। তালিকায় সাতজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং চারজন মুসলমান ধর্মাবলম্বী শহীদের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। সে তালিকা দেখতে ভীড় করছে অনেকেই। কিন্তু তালিকা দেখে স্বানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শিয়ালকোল গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটির সভাপতি আবুল হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শহীদুল আলমের কাছে কেউ কেউ প্রশ্ন করছেন, নিহত হিন্দুদের নামের পাশে ‘শহীদ’ লেখা হবে কেন? তাদের নামের পাশে লেখা উচিত ‘স্বর্গীয়’। এ নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। এ প্রশ্নের উত্তর অবশ্য দিচ্ছেন আবুল-আলম ও তাদের কর্মীরা। তারা জবাব দিচ্ছেন, পাকিস্তানিরা বাঙালিদের হত্যা করেছে, তাদের সামনে কোনও ধর্মের বাছবিচার ছিল না। তাই যারাই পাকিস্তানিদের হাতে নিহত হয়েছেন তারা সবাই শহীদ।

শুধু শিয়ালকোল এলাকায় নয়, শহরের পাশ্ববর্তী কালিয়াহরিপুর ইউনিয়নের তেতুলিয়া প্রাইমারি স্কুলের দেয়ালে লেখা হয়েছে ১৪ জন শহীদের নাম। তালিকায় ১২ জনের নামের পাশে ‘শহীদ’ লেখা হয়েছে এবং বাকী দুই জন হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়ায় তাদের নামের পাশে লেখা আছে ‘স্বর্গীয়’। নাম ফলকটি ২০০৪ সালে উন্মোচন করেন বিএনপি-জামায়াত জোটের তৎকালীন মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। এ থেকে বোঝা যায়, ‘শহীদ’ সম্পর্কিত এ প্রচার-প্রচারণাটি দীর্ঘদিনের এবং রাজনৈতিক।

দীর্ঘ সামরিক শাসন, স্বৈরশাসন, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ নিয়েই শুধু নয়, বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে আরও অনেক কিছু নিয়ে। গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটির অন্যতম কর্মী মঞ্জুর আলম শাহীন জানালেন, মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা সম্পর্কে অনেকেরই বদ্ধমূল ধারণা যে, হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাই পাকিস্তানিদের হাতে বেশি মারা পড়েছে। পাকিস্তানি ও তার দোসররা হিন্দুদেরই বেশি নির্যাতন করেছে, মুসলমানদের নয়। কারণ হিন্দুরাই পাকিস্তানিদের জাত শত্রু। এ কারণে তারা দেখে দেখে হিন্দুদের হত্যা করেছে। আর তিরিশ লক্ষ শহীদ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টাতো আছেই। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেরই অনেকে বলে বেড়ান যে, ওই সব গোনাগুনতির দরকার নাই, তাহলে শহীদের সংখ্যা কমে যাবে। অথচ মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে যত অস্বচ্ছতা থাকবে ততই বিভ্রান্তি ছড়ানোর সুযোগ পাবে স্বাধীনতা বিরোধীরা।

রাজনৈতিক কর্মী মনিরুজ্জামান খান আরও স্পষ্ট করে বললেন, এসব প্রচার-প্রচারণার মধ্যে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিভান্তি ছড়ানোর চেষ্টা আজও অব্যাহত। একটু ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখুন, এসব কথার মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতা বিরোধীরা প্রমাণ করার চেষ্টা করছে যে, পাকিস্তানিদের একটি নীতি-নৈতিকতা ছিল। সে নীতির জন্যই তারা ‘পূর্ব পাকিস্তান’ থেকে হিন্দুদের তাড়ানোর চেষ্টা করেছে। মুসলমানদের দু’এক জনের গায়ে যদি হাত তুলেও থাকে তা না জানা ভুলের জন্য ক্ষমার যোগ্য। আর হিন্দুরা তো ‘বিধর্মী’, তাই পুর্ব পাকিস্তান থেকে হিন্দুদের তাড়ানোর চেষ্টা অন্যায় নয়। আর এ চেষ্টায় হিন্দুরা মারা পড়বে এটাই তো স্বাভাবিক। এ ভাবেই চাষবাস হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা, ভণ্ডুল হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা।

লেখক: সাংবাদিক