বৃদ্ধাশ্রম থেকে এক মায়ের চিঠি!

 


সাত রাজার ধন,হিরা,মানিক,রতন, জাদু, নয়ন আমার! অনেক দিন হলো তোমাকে দেখিনি।আমার আদর ও ভালো-বাসা নিও! তুমি কেমন আছ? তোমার কাছে জানতে চাওয়া আজ বড়ই নিরার্থক! আজ কাল তুমি অনেক ব্যস্ত থাকো দেশের সেরা মানুষের মাঝে এক জন! সফল মানুষের মাঝেও তুমি এক জন! সভা,সেমিনার,পার্টি, নিয়ে মহাব্যস্ত মানুৃষ।

হয় তো বা চিঠিটা পড়ার সময় হবে না! এমনকি লেখা গুলোর অর্থ মনোযোগে আসবে না। তাই আমার ছোট্ট দিদা মনিকে দিয়ে পড়ে নেবে, সে তোমাকে বুঝিয়ে দেবে! জাদু,মানিক আমার জীবনের দ্বার প্রান্তে দাড়িয়ে আমি আজ বড় একা,বড় অসহায় ! এখানে আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে, মনের কষ্টে বুক ভেঙ্গে যায়! তোমার কাছে আমার শেষ চাওয়া! আমার মৃত্যুর পর (বিয়ের সময়ে, তোমার বাবার দেওয়া) শেষ চিহ্ন একটি নাকফুল, যা আমি অতি যত্নে রেখেছি বিক্রয় করে আমার কাফনের কাপড় কিনে দিও! আর আমার লাশটা তোমার বাবার কবরের পাশে দাফন কর! এতে তোমার কোন অর্থ খরচ হবে না, মুল্যবান কিছু সময় নষ্ট হবে মাত্র!

আজ থেকে পাঁচ বছর আগে তুমি যখন এই বৃদ্ধাশ্রমে আমাকে নিয়ে এসেছিলে তখন আমার বয়স ছিল ৭৫ (পঁচাত্তর) বছর। বর্তমানে আমার বয়স ৮০(আঁশি) বছর।পাশের ঘরের রহিমা( ছদ্দনাম)আমার সুখ দেখে, আমার প্রতি হিংসা করে। সে বলে আমি না কি শ্রেষ্ঠ মা শ্রেষ্ঠ সন্তান জন্ম দিয়েছি! তোমার দামী গাড়ী, বাড়ী,কোটি কোটি টাকার সম্পদ, শিল্প কল-কারখানা সবই আছে। আর তার সন্তানের একটি থাকার ঘর ছাড়া কিছুই নাই,লেখা পড়াও জানা নাই।সারা দিন যা রোজগার করে তা দিয়েই সংসার চালায় এবং প্রায় এসে দেখা করে!

আমার জন্য তোমার কেমন লাগে জানিনা! তুমি আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝতে না।আমি যদি কখনও তোমার চোখের আড়াল হতাম মা, মা বলে চিৎকার করতে আর সারা বাড়ি খোঁঁজা-খুুুজি করতে।মাকে ছাড়া কারও কোলে তুমি যেতে না।তুমি যখন খুব ছোট,তোমার বয়স পাঁচ বছর তখন তোমার সারা শরীরে ঘাঁ হয়েছিল, পঁচা দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল,শরীর থেকে মাংস খঁসে পড়ছিল,কেউ ভঁয়ে তোমার চার পাশ দিয়ে হাঁটছিল না। তোমার বাবা আর আজকের বৃদ্ধাশ্রমের তোমার এই মা, রাতের পর রাত, জেগে থেকে তোমাকে সুস্থ্য করে তুলে ছিল! তোমার সারা শরীরে এখনও দেখ,সে ঘাঁয়ের ক্ষত আছে।এগুলো তোমার মনে থাকার কথা নয়। তুমি এক মুহূর্ত আমাকে না দেখে থাকতে পারতে না।রাতের বেলায় তোমার মাথায় হাত,না বুলিয়ে দিলে তুমি ঘুমাতে পারতে না। এখন তোমার কেমন ঘুম হয় বাবা?
আমার কথা কি তোমার একবারও মনে হয় না?তোমার প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই।আমার কপালে যা লেখা ছিল তা হয়েছে।
আমার জন্য তুমি কোনো চিন্তা কর না।
আমি খুব ভালো আছি।কেবল তোমার ঐ চাঁদ মুখখানি দেখতে আমার খুব মন চায়।
তুমি ঠিক মতো খাওয়া-দাওয়া করবে।
আমার আদরের প্রিয় দিদা-ভাই, দিদা-মণি,
বৌ-মার প্রতি যত্ন নিও।আমার কথা জিজ্ঞেস
করলে তাদের বলো আমি অনেক ভালো আছি!

আমি দোয়া করি,তোমাকে যেন আমার
মত, বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে না হয়! কোন এক জ্যোস্না ভরা রাতে আকাশ পানে তাকিয়ে জীবনের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে একটু ভেবে নিও।তাহলেই বিবেকের কাছে উত্তর পেয়ে যাবে।তোমার ছোট বেলার একটি ছবি আমার কাছে রেখে দিয়েছি।ছবিটা দেখে মনে মনে ভাবি এটাই কি আমার সেই খোকা! বৃৃৃৃদ্ধাশ্রম থেকে এভাবে বেদনা ভরা একটি খোলা চিঠি, ছেলের উদ্দেশ্যে লিখেছেন আমিনা খাতুন নামে (ছদ্মনাম) এক বৃদ্ধা “মা”।

লেখক: সাংবাদিক ও সমাজকর্মী মো:জাহিদুল ইসলাম জাহিদ,ময়মনসিংহ।