আমাদের ক্ষমা করুন স্যার

যেই মানুষটা তাঁর লেখা বইয়ের মাধ্যমে আমাদের সুন্দর একটি শৈশব দিয়েছিলেন, যেই মানুষটা আমাদের ভাবতে শিখিয়েছেন দেশকে নিয়ে, ভালোবাসতে শিখিয়েছেন দেশের মানুষকে, যেই মানুষটা আমার মতো তরুণ লেখকদের লেখালেখি করার মূল অনুপ্রেরণা, যেই মানুষটা আমাদের সবার অভিভাবক, সেই মানুষটিই যখন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকে, এই দৃশ্যটি যে আমাদের জন্য কতোটুকু কষ্টের তা ভাষায় প্রকাশ করার মত না। আজ শুধু আমাদের জাফর স্যার অসুস্থ না, আজ পুরো বাংলাদেশ অসুস্থ। মানুষরূপী পশুরা শুধু আমাদের মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারকে আঘাত করে নি, তারা আমাদের পুরো বাংলাদেশকে আঘাত করেছে। বাংলাদেশের এই বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে বার বার যখন দেশটি হোঁচট খায়, তখন এই শ্বেতশুভ্র চুল-মোচওয়ালা মাটির মানুষটিই অভিভাবক হয়ে সবার আগে কথা বলে ওঠে। যেন দেশের সব সমস্যাই তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত সমস্যা। দেশকে কতোটুকু আপন করে নিলে এমনটি করতে পারে, যারা তাঁকে আক্রমণ করেছে, তারা কি তা জানে? এমন মানুষটিকে শেষ করে ফেলে তারা কি আমাদের বাংলাদেশকে শেষ করতে চেয়েছিল? এই লাইনটি লিখতে আমার প্রচুর হাত কাঁপছে, তবু ক্ষোভের তীব্রতা আমাকে লিখতে বাধ্য করছে।

এই ঘটনার সাথে যারা জড়িত তারা আর যাই হোক, আমি নিশ্চিত তারা এই দেশের সবচেয়ে বড় শত্রু, কারণ তারা দেশের উন্নতি চায় না। আমাদের ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের হাত ধরে যখন এ দেশের শিক্ষার্থীরা তথা বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে তখন তারা তা সহ্য করতে পারছে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিরা তাদের পরাজয় নিশ্চিত জেনে যেমন আমাদের অনেক বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে, আমাদের দেশকে মেধাশূণ্য করে, আমাদেরকে যেমন অনেক পিছিয়ে দিয়েছিল, ঠিক সেই রকমভাবে স্বাধীন এই দেশকে পিছিয়ে দিতেই আজ আমাদের জাফর স্যার এর উপর হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে এই দেশ বিরোধী কিছু মানুষ। আমি জানতে চাই না তাদের ধর্ম, আমি জানতে চাই না তাদের দল। আমি যখন নিশ্চিত তারা দেশের উন্নতি চায় না, তখন আমি চাই তাদের এমন শাস্তি হোক, যেন দেশের উন্নতির পথের অন্তরায় হয়ে কখনোই কেউ দাঁড়ানোর সাহস না পায়।

অনেক কষ্টে এদেশের স্বাধীনতা আমরা এনেছি। এখন চাই সুন্দর করে দেশটিকে এগিয়ে নিতে। চাই জাফর ইকবাল স্যারের মত মানুষেরা যেন প্রাণখুলে দেশের জন্য কাজ করে যেতে পারে। এসব মানুষকে রক্ষার জন্য শুধু সরকার না, কাজ করতে হবে আমাদের। তাঁরা তো আমাদের জাতীয় সম্পদ। এসব মানুষের জন্যই তো আমরা সুন্দর একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি। এসব মানুষের জন্যই বাংলাদেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন অলিম্পিয়াডের মাধ্যমে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে চলছে। তারপরও যখন এমন একজন মানুষকে হত্যার চেষ্টা করা হয় ও আমরা তাঁকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হই, যেই মানুষটি অপারেশন থিয়েটারে যাওয়ার আগে শুধু একটি কথাই বলে, “আমাকে হত্যার চেষ্টাকারী লোকটিকে কেউ মারধর কর না”, তখন আমাদের লজ্জানত শিরে বলতেই হয়, “আমাদের ক্ষমা করুন জাফর স্যার। আমরা শুধু ব্যথিতই না, আমরা লজ্জিত।”

শাহ জালাল জোনাক – তরুণ লেখক ও কলামিস্ট।