নিদান

এম.এস প্রিন্স
এ জীবনে যত গুলো দিন গত হয়েছে গড়ায়ে কালের স্রোতে
সে গুলির হিসাব কষিতে দাগ কাটিয়াছে মনে আজিকে নিশীথে।
কষিতে গিয়া পিছু ফিরে চোখ তোলে দেখি ক্ষণের গত যত যোনি
সব গুলির কাছেই আমি ঋণি।
দৈর্ঘের বা গুণের হিসাবে কেমনে জীবনকে বড় করিয়া চিত্তে ধরিব
পাপিষ্ট মিজান আমারে তো সোভা করিয়া খোঁপাতে গুজিব।
কী আছে মূল্যবোধ এতে যদি না ঋণ শোধে জগতে-
এক-খান কবিতা নাই লিখিতে পারি মানবের কল্যাণার্থে?
এই ভাবিতে ভাবিতে হৃদি সবে ধরিল উপরের বাঁশির সুর
অমনি এক রূপসি আসি হাঁপাইতে হাঁপাইতে বলিল- শুনোন হুজুর
‘বিশ ঘরের বসতি আমারি চারিধারে
সাক্ষি মানিব কে আছে বিশ্বস্ত ঊনিশ ঘরেই তো মারে।’
তাঁর কথা শুনিয়া গৃহাভিমুখ থেকে চিন্তাশক্তি ধীরে ধীরে বাড়ায়ে- জগতে
মানুষ মানুষ ঠিকই তবে কিছু মানব রূপে দানব রয়েছে বলি সান্ত্বনা দিতে।
আমার কথায় মৃদু হাসিয়া দীর্ঘশ্বাসে বলিল যা, তার বিশেষ যে কয়টি বাণী
বর্ণনা করিতেছি তারো সামান্য কিছু কাহিনী।

প্রকৃত নাম নিধি
দু’সন্তানের মাঝে বড়, যদি বা কভু হতে হয় তাদেরও প্রতিনিধি
এই আশে রাখা নামের গল্প পাল্টে কেন নতুন নামকরণ হইল নিদান
সে বর্ণনায় আসে তাঁর জীবনে বাঁচা এখন শিখর কাটা বৃক্ষের সমান।
কারণ বাবার বন্ধু রতন বাড়ি আসায় সম্পর্কের মোহে এককালে মায়
পাড়ি দিল তারে লয়ে জীবনের কথা ভাবিয়া বিয়া করিল আবার বাবায়।
সতিনের ঝি কয়ে কত গালি কত মার নীরবে সয়ে নিল মুখ বুঝে
অবশেষে বাবা(দুলন) আলাদা বাড়ি-ঘর করে দিল তাঁরে সুখের খোঁজে।
কাম কাজ নাই বসিয়া খাওয়া আরো যত নির্যাতন তবু মায়ের না থামে
তাই জন্ম আজন্মা পাপ কয়ে আলাদা করিয়া নিল বাঁধিয়া সব ফ্রেমে।
সহায় সম্পত্তি না দিতে পারিলেও মাঝে মাঝে গোপনে বাবা তাঁরে
দিবসের মায়নায় যা পারে দেয় লুকায়ে ধরা তরে ।
এতে ভর করে চলিতে পারে তা কিন্তু না, ছোট ভাই তারি ঘাড়ে বসে
গগন তলে স্বর্গের হাসি হাসে।
এক দিন তাও জানিতে পারিয়া বন্ধ করিল সৎ-মায় বাবা দেয় না কিছু
অবণীতে মানুষ আমি এই ভাবিয়া বলিল- ‘করিব না কারো কাছে মাথা নিচু
নিজের শ্রমে যাই পাই তাই দিয়া চালাব সংসার যদি পারি দিব তাদেরও’
আমার কাছে আসিবার কালে দেখি এলোচুলে কাকের বাসা তেল পড়েনি বৎসরেও।
মুখ খানা শুকায়ে কাঠ
তাকায়ে বুঝিলাম তবু চোখ সতেজ তা’র দ্বারাই সার্থক জীবন নাটকের মাঠ।
এইখানে কত কারুকার্য কত বা কী
আরো কিছু দিবে তাঁরে এই আশে খোদা আরশে রাখেনি আর বাকি।
যাহোক কাজের আশে বাড়ি বাড়ি গ্রামে গ্রামে ঘুরে
অল্প বয়সী মেয়ে চুরি বা ছেলে-পুলের লগে আরো কত সন্দেহে সবাই দিল ফিরে।
পথে নামে শেষে একমুঠো ভাতের আশে নিশি কুটুমের বেশে
শরীর ব্যবসা আরো নানা অপকর্মের কথা বলে পড়শীরা পেদায় সন্দেহের বশে।
কী মুখে ফিরায়ে আনিবে বাবা বাড়ি পড়শী শুধু না, সৎ-মায়েও কয়-
‘জন্মতে আর এই কাজেই তার পরিচয়।’
সহিবার নয় তবু সয়ে লুকায়ে কয়েকটা টাকা দিয়া বাবা ‘যা চলে শহরে’
বলিল জীবন সাজতে ওখানে গিয়া সবুজ তৃণের নূরে।
বাবার কথায় শহরে আসে সঙ্গে আদুরে ছোট ভাই কিরণ
বাঁচিবার আশে প্রথম পরিচয়ে সব কয়ে দেখাইতে চাহিল সহজ তোরণ।
এ মুহূর্তে কী দেখাইব সঠিক পথের সন্দান দিই পরে দু’দিন
আমার কথার পুষ্পমালা শুনিয়া ভাবনায় তাহার চেহেরা হইল মলিন।
আর কোনো কিছু না বলিয়া গেল চলে
চলিবার কালে দেখি নয়নের কোণে ছলছল করিতেছে জলে।

দু’দিন পরে কাজের সন্দান লয়ে বাসতে গিয়া দেখি নিদানেরে
না ফেরার দেশে চলিয়াছে মাটির পিঞ্জর কেবল রয়েছে পড়ে।
কিরণ কাঁদিতেছে পাশে বসে আপনার কথা ভাবি
মাথায় হাত বোলায়ে বলিলাম, ’এ আঁধার ঝাড়িয়া ফেল নিয়তি সবি।’
আমার কথায় জল মুুছে কহিল, বোনে বলিল মরিবার কালে
‘যারে সব কয়েছি সে সতিত্ব নেয় যদি আঘাত করি দুর্বলতার মূলে?’
জবাবে কী বলিব হায়রে জগতময়
কী বোঝাইতে গিয়া কীই-বা হইল? আমারে কী এমনি মনে হয়!
যাহোক তাহারে সমাধি দিয়া পরে
মাইক্রো গ্যারেজে কিরণেরে কাজে লাগায়ে বাসাতে আসিয়াছি ফিরে।