বইমেলার স্মৃতি, খাপছাড়া ভাবনা

নিউজ ডেস্ক: বইমেলা এখন বাংলাদেশের অন্যতম অসাম্প্রদায়িক উৎসবগুলোর একটি। বায়ান্নোর ভাষা শহীদদের স্মরণ ও বইমেলাকে উপলক্ষ করে এ উৎসবে প্রতিবছরই সংযুক্ত হচ্ছে নানা মাত্রা। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা পরিগঠনের একটা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় বইমেলার সময়। বইয়ের বাইরেও জীবন ও সংস্কৃতির নানান শাখায় ফেব্রুয়ারি এবং বইমেলা এখন উচ্চারণে-সঞ্চারণে প্রবাহিত এক জীবন বোধ। সামগ্রিকভাবে বইমেলাকে আমি এভাবেই অনুভব করতে ভালোবাসি।

একনাগাড়ে ১২ বছর আষ্টেপৃষ্টে এই বইমেলার ভেতরের মানুষ ছিলাম। পাণ্ডুলিপিকে বইয়ে রূপান্তর ও উপস্থাপনের আনন্দযজ্ঞ এবং বিনিয়োগ ফেরত আনার উৎকণ্ঠার মধ্যেও বইমেলাকে উপলক্ষ করে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মিথষ্ক্রিয়া, বিনিময় এবং মানবিক বিনির্মাণের পাথর ঘষা আগুন উদযাপনেই আনন্দ অনুভব করতাম। এই আনন্দ ও একাত্মতা ব্যক্তিগতভাবে আমার এক বড় অর্জন।

বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে আমরা যে বৈপ্লবিক পরিবর্তনগুলোর স্বপ্ন দেখি- দায়িত্বশীল রাষ্ট্র ব্যবস্থা, সামাজিক সাম্য, কথা বলা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা, প্রতিটি মানুষের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থান- অনেক বেশি রোমান্টিক হলেও এটা অস্বীকার করার উপায় নাই, আমাদের এক ধরনের ভাবনা তৈরি হয়েছিলো যে, বইমেলার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠা সচেতনতা একদিন হয়তো বাংলাদেশকে সেই রাজনৈতিক সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যাবে। কিন্তু নানান ঘটনা-দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোর রাজনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতায় বইমেলাকেন্দ্রিক ভাবনাগুলো নিজের অজান্তেই একটা শীতঘুমের দিকে চলে গেছে। যেন দখল হয়ে গেছে আমাদের স্বপ্ন বপনের মাঠ।

বইমেলায় যেবার প্রকাশক হিসেবে আমার অভিষেক, সেবারই মেলা থেকে বেরুবার পথে আক্রমণের শিকার হন হুমায়ূন আজাদ। হত্যার উদ্দেশ্যে তার ওপর হামলা হলেও ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যান তিনি। পরে ২০১৩ সালের শুভ-অশুভ দ্বন্দ্বের প্রতিক্রিয়ায় বইমেলার সময়ে রাজিব হায়দারকে দিয়ে যে হত্যাযজ্ঞ শুরু হয় আমাদের প্রাণের বইমেলা, স্বপ্নের বইমেলা আজও সে জায়গা থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। বরং দিন দিন অশুভ শক্তির কাছে গণতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা-মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সব ধরনের সম্ভাবনাকে যেন বন্ধক ও বিসর্জন দেয়া হচ্ছে।

বইমেলা প্রাঙ্গণে লুকিয়ে ছাপিয়ে নয়; একেবারে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছে লেখক অভিজিত রায়কে। বই প্রকাশের জন্য প্রকাশনার স্টল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। প্রকাশক-লেখককে ৫৭ ধারার মামলায় জেলবন্দি করা হয়েছে। এসবই বইমেলা নিয়ে আবেগ ও স্বপ্ন থেকে আমাদেরকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। যদিও বইমেলা থেমে নেই। বইয়ের প্রকাশও বন্ধ নেই। কিন্তু স্বাধীনভাবে লিখতে পারার যে স্বতস্ফূর্ততা, সেই জায়গা থেকে তো লেখকদের সরে আসতে হয়েছে। প্রকাশকদের সরে আসতে হয়েছে প্রকাশ করার স্বাধীনতা থেকে। এক অদ্ভুত সেলফ্‌ সেন্সরশিপের মধ্য দিয়ে লেখালেখি ও প্রকাশনায় আর যত যা-ই থাকুক- যে প্রাণের কথা বলি আমরা সেই প্রাণ তো আর থাকে না।

নিষ্প্রাণ লেখক জীবন, সংকটের প্রকাশক জীবন আর কেবল জীবনের সলতে জ্বালিয়ে রাখার সংস্কৃতির জীবন- দেশ, জাতীয়তা, গণতন্ত্র বা মানবাধিকারের সংরক্ষণ ও বিকাশে ইতিবাচক কোনো প্রভাব ফেলার সুযোগ রাখে না। ফেলে আসা বইমেলা নিয়ে আমার ভাবনাগুলো এখন এরকমই অসংলগ্নতায় ভরা আর খাপছাড়া।

আহমেদুর রশীদ চৌধুরী, লেখক: ‘শুদ্ধস্বর’ প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী