মূকাভিনয়ের ইতিকথা : সাইফউদ্দিন শোভন

মূকাভিনয়ের ইতিকথা : সাইফউদ্দিন শোভন

সৃষ্টির প্রারম্ভ থেকেই মূকাভিনয়ের উৎপত্তি। কারণ পৃথিবীতে মানুষ যখন প্রথম ভুমিষ্ট হলো, তখন মানুষের কোনো ভাষা ছিল না। হয়তো শব্দ উচ্চারণের ৰমতা তার ছিল, কিনসেই শব্দ ভাষায় প্রয়োগ করার ৰমতা মোটেই ছিল না । মানুষ তখন নানা রকম অঙ্গ ভঙ্গির দ্বারা একের ভাষা অপরকে বোঝাতে চেষ্টা করতো। মনের ভাব প্রকাশ করতো হাত নেড়ে ও চোখের ইশারায়।

তখন নানা মানসিক ভাবাবেগ বা অবসা যথা-

ভয়, আনন্দ, উত্তেজনা, আবেগ, যন্ত্রণা, উলৱাস, ব্যঙ্গ, রাগ, ঘৃণা ইত্যাদি পূর্বে মানুষ চোখের ভাষায় প্রকাশ করতো। এই ভাষাটা হলো মূক ভাষা। মূক ভাষার প্রতিশব্দ  Gesture, এটা লাতিন Gevtus থেকে এসেছে। Gevtus হচ্ছে To move or to act, To convey a feeling or a mimitic expression through the action of head and eyes. এই যদি হয় gesture language-এর definition, তাহলে বলতে হবে এটা প্রাচীনতম মূকাভিনয়কেই বলা হচ্ছে। Mime (মিম) হচ্ছে ফরাসী শব্দ। সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে gesture language-কে modify করে সুন্দর করা হলো। এইভাবে modify হতে হতে যেটা দাঁড়ায় সেটাই হলো performing arts (বিশেষত: acting and dancing) ।

খৃষ্টীয় সপ্তম ও অষ্টম শতকে বুদ্ধের নাটকনামে একপ্রকার নাটক প্রচলিত ছিল, যাতে বৌদ্ধ ভিৰুকরা বিভিন্ন ভঙ্গীতে বুদ্ধের নীতি, রীতি এবং আদর্শ দর্শকদের সামনে মূকাভিনয়ের মাধ্যমে প্রচার করতো।

দৰিণ ভারতে ছিল লোকগাথা। এতে প্রথমে দুকলি গেয়ে দেওয়া হতো প্রারম্ভিক হিসাবে। তারপর বিভিন্ন চরিত্র এসে তাঁদের সেই গানের ভাবার্থটি মূকাভিনয়ের সাহায্যে বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করতেন। মূকাভিনয় শিল্পকলারই একটি অঙ্গ, সৃজনীমূলক অভিনয় যদি সত্যি আমাদের আবেগ প্রকাশ করে এবং অপরকে সেই বোধগম্যতায় সাহায্য করে, তাহলে একথা নিশ্চিতর্বপে বলা যায় যে, মূকাভিনয় বাস্তবিকই শিল্পকলারই একটি অঙ্গ। কারণ অভিনয়ের বিশেষ বিশেষ মুহুর্ত ও ভাব প্রকাশের জন্য মূকাভিনয় একান্ত অপরিহার্য, কখনো কখনো বা একমাত্র উপজীব্য। এও দেখা যায় যে, বিশেষ বিশেষ ভাব বা রসের শৈল্পিক  র্বপায়নে মূকাভিনয়ই একমাত্র বা অমর হয়ে ওঠে। যে কথ্য ভাষার প্রয়োগে নাটক ও অভিনয় জীবন্ত হয়ে ওঠে, কোনো কোনো মুহুর্তে সেই ভাষার ভাব প্রকাশের অপ্রতুলতা ধরা পড়ে। তখন দেখা যায় সামান্য কোনো নীরব ভঙ্গিমার মাধ্যমেই হয়তো ভাষার চেয়েও বেশী ভাবপ্রকাশ সম্ভব হয়। বসত: অভিনয় ও শিল্পকলায় বিভিন্ন নিয়মকানুন প্রবর্তন করেছেন যিনি সেই মহর্ষি ভরতমুনির নাট্যশাস্ত্রপড়লে বোঝা যায়, অভিনয় শিল্পকলায় মূকাভিনয় এর সান কত বেশী।

পাশ্চাত্য দেশসমুহে মূকাভিনয় সন্মানীয় স্নেহচ্ছায়ায় তার নিজের আসন প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। এই শিল্পের উৎকর্ষ সাধনের জন্য এখনও এই সমস্ত দেশে চেষ্টার অন্ত নেই। কিনআমাদের দেশ  সনাতন এই শিল্পকলার যথেষ্ট সমাদর হয়নি। যদিও মূকাভিনয় আমাদের দেশের অতি প্রাচীন ও ঐতিহ্যমন্ডিত এক শিল্প মাধ্যম।এই প্রসঙ্গে বলা যায় যে, অভিনয় শিল্পের অন্যতম অঙ্গ হলো নিখুঁত অভিব্যক্তি কারণ সুখ-দু:খ আনন্দ-বেদনাকে বিশেষ বিশেষ অভিব্যক্তির মাধ্যমে যতখানি প্রকাশ করা সম্ভব, ততখানি প্রকাশ আর কোনো কিছুর মাধ্যমেই সম্ভব নয়।তাই সব অভিনেতাকে শিৰা নিতে হয়, কেমন করে মঞ্চে চলতে হবে, কথা বলতে হবে, অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে হবে। অভিনেতার নিজস্ব কাজটুকু ছাড়াও মঞ্চের অন্যান্য চরিত্র, দৃশ্যপট, সঙ্গীত, আলো প্রভৃতি সাহায্য করে অভিনয়ের সমগ্রতাকে। আর মূকাভিনয় হলো অভিব্যক্তি প্রকাশের মাধ্যম। কোনো কথা না  বলে কেবলমাত্র মুখ চোখ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নানা ভঙ্গির মাধ্যমে নাটকের অন্তর্গত বিভিন্ন চরিত্রের বিভিন্ন বক্তব্যকে নির্বাক অভিব্যক্তির সাহায্যে প্রকাশ করে মূকাভিনয়।

মৌন অভিব্যক্তির দ্বারা মানুষের অন্তরের আবেগ ও উৎকন্ঠা, সুখ, দু:খ, উলৱাস ও আতঙ্ককে জীবন্ত করে তোলার এবং শুধুমাত্র অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নি:শব্দ সঞ্চালনের দ্বারা গতিশীল জীবনের কোনো র্বপ ও আকার ফুটিয়ে তোলার যে শিল্পকৌশল তাকেই বলে mime বা মূকাভিনয়। সাধারণত: ব্যালের সঙ্গে এই মূকাভিনয়ের অবিচ্ছেদ্য যোগ আছে। চলচ্চিত্রের প্রথম যুগে এই মূকাভিনয়ের মাধ্যম ছাড়া আর কোনো উপায়ই ছিল না । আইজেনস্টাইনের ব্যাটল শিপ পটেমকিন”, ‘অক্টোবরকিংবা স্ট্রাইকঅবিস্মরণীয় নির্বাক সৃষ্টি। আর একালের অন্যতম মহৎ শিল্পী চার্লি চ্যাপলিন যিনি নীরব ভাষার কথায় আমাদের হাসি কান্নায় ভরিয়ে রাখেন।

এককভাবে মুকাভিনয় আধুনিক কালের ব্যাপার। হয়তো বিবর্তনের ধারা হিসেবে উলেৱখ করা যেতে পারে ধ্রূপদী গ্রীক নাটকের কথা যেখানে মুখোশ নৃত্যের মাধ্যমে নাটকীয় বক্তব্য উপসিত করা হতো, কিংবা ষোড়শ শতকের ইতালীয় কোম্মেদিয়া দেলৱা আর্তে নাটকের মধ্যে। উনবিংশ শতকের  সম্পূর্ন মুকাভিনয়ের নাটক হলো এল.এন.ক্যান্টের প্রোত্তিগ। যদিও  ঐ  ধরনের নাটকের  সংখ্যা খুব কম।

এই উনবিংশ শতকেরই প্রথম দিকে মুকাভিনয়ের শ্রেষ্ঠ শিল্পী ছিলেন দেবুরোনামক ফরাসী অভিনেতা। পরবর্তীকালে বিশেষ করে ফ্রান্সেই এই শিল্পকৌশল আরো পরিণতি লাভ করে। এই ফ্রান্সেই বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে জন্মগ্রহণ করেন প্রখ্যাত এতিয়েন দ্যক্রএবং আরো পরে জ্যালুই বারোমার্সে মার্সো। মার্সোই হলেন বর্তমান পৃথিবীর সর্বাগ্রগণ্য মূকাভিনেতা।

ফরাসী বিপৱবের কালে যখন মানুষের মূখ বন্ধ করে দেওয়া হলো, তখন মুকাভিনয়ের প্রচলন খুব বেশী হয়েছিল, কারণ মুখের কথা বন্ধ করলেও মূকাভিনয় বন্ধ করা যায়নি। এই মূকাভিনয়ের মাধ্যমেই গ্রামে গঞ্জে, শহরে ফরাসী দেশের বিৰোভকে জাগিয়ে তোলা হয়েছিল,বিৰোভকারী জনসাধারণ এই “Mime” এর মাধ্যমে বিৰুব্ধ ও অনুপ্রাণিত হয়ে ফরাসী বিপৱবকে সাফল্যের পথে নিয়ে গিয়েছিল। মূকাভিনয় সর্বসাধারণের জন্য। তাই এই শিল্পে কান্নার অভিনয় দেখে  সকলেই কেঁদে ওঠে, বা হাস্যকর ভঙ্গি দেখে সকলেই হেসে ওঠে। এই শিল্প লোকের মনে এমন ভাবে নাড়া দেয় যে, পরবর্তীকালে এটি অনেক বৈপৱবিক গণচেতনা ও সংস্কৃতির সংগঠনমূলক কাজে লেগেছিল।

আমাদের দেশে মূকাভিনয় একক শিল্প মাধ্যম হিসেবে খুব প্রচলিত ছিল না । ভারতবর্ষে প্রথম একক মুকাভিনয়ের চেষ্টা চলে ১৯৫৬ সালে। ১৯৫৮ সালে থিয়েলো সুলৱা”,ইনি ওয়েষ্টবেঙ্গল একাডেমি অব ডান্সড্রামাতে ( জোড়াঁসাকুর ঠাকুরবাড়ি) প্রথম একক মুকাভিনয়  পরিবেশন করেন। তারপর ১৯৬০ সালে নিউ এম্পায়ারে মার্সে মার্সোরঐতিহাসিক আবির্ভাব ঘটে। তারপর এলেন জার্মানির রলফ শারও রাশিয়ার ইউ.এন.জুরী। এইসব শিল্পীদের অপূর্ব অভিনয়নৈপুণ্যে এবং সর্বসঞ্চারী  এই অদ্ভুত নি:শব্দ ভাষায়, আর আবেগ প্রকাশের আশ্চর্য শক্তিতে অভিভুত হয়ে গেল সমস্ত দর্শক সমাজ। হৃদয়স্পর্শী এই নীরব ভাষা দর্শকরা দেখলো, বিশ্বের সমস্ত সাধারণ মানুষ এক।তারা সকলেই একইভাবে আনন্দ বেদনায় আন্দোলিত হয়।

ইদানিং ভারতবর্ষে, ইংল্যান্ডে, আমেরিকায়, রাশিয়াতে, জার্মানীতে, অস্ট্রিয়া ও ফ্রান্সে মূকাভিনয় চর্চা বেশ দ্র্বতগতিতে এগিয়ে চলেছে। একটি ঘটনা: ১৯৩৬ সালে হিটলারের জার্মানীতে হিটলার পার্ষদ গোয়েবেল্‌্‌স্‌এক নাচের আসরে মূর্তিমান কালাপাহাড় হয়ে এসে সে নাচ বন্ধ করে দিয়েছিল, ঘোষণা করেছিল,“There is room for only one movement in Germany-the National Socialist movement” সেই সর্বগ্রাসতন্ত্রে নাচের ছন্দ, তার মুভমেন্ট, অবান্তর বিবেচিত হয়েছিল। অথচ আমরা জানি মানুষের জীবনে condition reflex এর দাম কতখানি। আমরা যে অভিনয় করি তা মানুষের জীবনকেই চিত্রিত করি মঞ্চে। আমরা একটা দৃশ্যকে দৃষ্টিগ্রাহ্য করতে অভিনেতাদের দিয়ে মঞ্চে বিন্যাস করি, ছবি তৈরী করি, গতিসঞ্চার করি, একটা ছন্দে বাঁধবার চেষ্টা করি। সেই সঙ্গে মূক নাট্যায়নও করতে হয়। বেশীর ভাগ মানুষ দেখার ব্যাপারটাকে গুর্বত্ব দেয়-শোনা অপেৰা। এই সত্যটাকে নাট্যানুষ্ঠানে মনে রাখতেই হয়। সাধারণ ভাবে প্যানটোমাইম Pantomime বলতে আমরা বুঝি-বাক্য ব্যবহার না করে ক্রিয়া। মঞ্চাভিনয়ে এই ক্রিয়া হল মুখের বিভিন্ন অভিব্যক্তি, শরীরের বিভিন্ন ভঙ্গি এবং মঞ্চে গতিসঞ্চার। এ সবই আহরণ করা হয় জীবন থেকে। অভিনীত চরিত্রের বৈশিষ্ট তার অবস, সময় এবং পরিপার্শ্ব বোঝাবার জন্যই এসব করা হয়। সংলাপ ব্যতিরেকে যদি এই ক্রিয়া দ্বারা সে প্রকাশ পায় তা হলে সেই ক্রিয়া মূক অভিনয়। আমরা সিগারেট ধরাই, বই তাক থেকে নামিয়ে পড়তে বসি, বিছানার চাদর কিংবা আনলায় কাপড় গুছিয়ে রাখি, জানলা বন্ধ করি মঞ্চে । এগুলি মূক ক্রিয়া। কিনকোন চরিত্র কী অবসায় সে কাজগুলি করছে সেটা আলাদা আলাদা ভাবেই প্রকাশ করতে হয়।

মানুষের গতি বা চলা, হাঁটা, বলা সবটাই তার প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হয়। আমি পোশাকের আলমারী খুলতে যাচ্ছি কিংবা রান্নাঘরের মিট্‌সেফ্‌্‌ খুলতে যাচ্ছি, এ যাওয়ার উদ্দেশ্য দুরকম-তাই যাওয়াটাও আলাদা হবে। ৰুধার্ত ছেলেটি মিট্‌সেফ্‌্‌ খুলতে পারে আবার এক লোভী ছেলে মিট্‌সেফ্‌্‌ খুলতে পারে-দুৰেত্রে মূক নাট্যায়ন দুরকম হবে। দর্শক যেন বুঝতে পারে এই দুই ভিন্ন উদ্দেশ্য।

সাধারণ নাচে যে মুদ্রা ব্যবহার হয় সেই মুদ্‌্রার ভাব ও ভঙ্গি বুঝতে হলে সেই মুদ্রার আলফা-বিটা জানা প্রয়োজন। তা না হলে মুদ্রার অর্থ বোঝা যায় না। কিনমূকাভিনয়ে যে মুদ্রা ব্যবহার হয় সাধারনত: দৈনন্দিন জীবনে ও সচরাচর আমরা যেভাবে বাস্তবে হাত পা সঞ্চালন করি ঠিক সেইভাবেই করা হয়। বিশেষ করে ইলিউসানের(illusion) দিকে নজর রাখা হয় যাতে করে সমস্ত ব্যাপারটা জীবন্ত হয়ে ওঠে। যেমন এক গৱাস জল এনে দেওয়া, হাতে গৱাস নেই শুধু অঙ্গভঙ্গি ও হাত সঞ্চালনের দ্বারা বোঝা যাবে যে ঐ গৱাসে কতটা জল আছে, গৱাসটা কাঁচের না পিতলের। ভর্তি গৱাসে জল এনে কাউকে খেতে দিলে তখন যে ভাবে ভঙ্গি হবে এবং খাওয়ার পর খালি গৱাস যখন হাতে নেওয়া হল তখন দর্শক অনুভব করবে গৱাসটা খালি, সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত illusion এর সৃষ্টি হবে। মূকাভিনয় এর কাহিনী বসর মুহুর্তটিকে ঠিক ভাবে জীবন্ত করে তুলতে হবে। Illusion গুলিকে জানতে হবে অঙ্গ-ভঙ্গি সঞ্চালনের দ্বারা যাতে করে requisition, set-setting এর কোন রকম অভাব দর্শক অনুভব না করতে পারে। সমস্ত ঘটনাটি জীবন্ত হতে হবে অঙ্গ সঞ্চালনের দ্বারা। মনে রাখতে হবে Illusion না আসা পর্যন্ত মূকাভিনয় শিল্পের সৃষ্টি হয় না।

লেখক: বাংলাদেশের বিশিষ্ট মূকাভিনয় শিল্পী। বাংলাদেশ মাইম এন্ড ফিজিক্যাল থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক।

Mobile: 01715063956

E-mail: shyf60@gmail.com