স্মরণীয় গানের বরণীয় বই

আখতার হুসেন

আসলাম আহসান বাংলাদেশের সিনেমার স্মরণীয় গান ১৯৫৬-২০১৬ শিরোনামের বইটিতে নিছক গান সংকলন ও সম্পাদনা করেই ক্ষান্তি দেননি। তাঁর লেখা ‘প্রসঙ্গ কথা’ পাঠ করে এ বইয়ের প্রস্তুতিতে তাঁর যে ধীমানতা ও কঠোর শ্রমের পরিচয় পেয়েছি, তাতে করে নির্দ্বিধায় বলা যায়, আসলাম আহসান একজন প্রকৃত গবেষকের মর্যাদা পাওয়ার অধিকারী।

বইটির ‘ভূমিকা’ লিখেছেন প্রখ্যাত গীতিকার মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান। আসলাম আহসানের বইয়ের মুখবন্ধস্বরূপ ‘প্রসঙ্গ কথা’ও সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এ লেখাটি থেকেই আমরা জানতে পারছি তাঁর পরিশ্রম সম্পর্কে। তিনি জানাচ্ছেন, ‘বহু সিনেমার আজ আর কোনো হদিস নেই। আমাদের দুর্ভাগ্য মুখ ও মুখোশ—যা দিয়ে আমাদের পূর্ণাঙ্গ সবাক সিনেমার যাত্রা শুরু, সেটাই অবিকৃতভাবে সংরক্ষণ করা যায়নি। শুরুর দিকে প্রকাশিত সিনেমার গানের ৭৮ আরপিএম রেকর্ডের বড় একটা অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। তার ওপর আছে তথ্যের অপ্রতুলতা ও বাণীর শুদ্ধতার সংকট। এতসব প্রতিকূলতার মধ্যেও কাজে হাত দিতে হলো দায়িত্ববোধের তাড়না থেকে।’

গবেষকের দেওয়া তথ্যসূত্রেই আমরা জানতে পারছি, ‘প্রাথমিকভাবে তিন হাজার গানের তালিকা প্রণয়ন করা হয়। চূড়ান্ত বাছাইপর্বে নির্বাচিত হলো ৫৬০টি প্রতিনিধিত্বশীল গানের বাণী।’ এই স্বীকারোক্তির পাশাপাশি গবেষক নিজেই প্রশ্ন তুলছেন, এই সংকলনভুক্ত গানগুলোই কি বাংলাদেশের সিনেমার সব সেরা গান? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি নানা দৃষ্টান্ত তুলে ধরে যে বক্তব্য পেশ করেন, পাঠকের মনে তা সত্যিই চিন্তার উদ্রেক না করে পারবে না।

আসলাম আহসান আমাদের জানাচ্ছেন, গানের বিন্যাসে কালানুক্রমিতার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। সচেতনভাবে বর্জন করা হয়েছে নকল সুরের গান। তবে এ-ও বলেছেন, অজ্ঞতাসারে দুয়েকটি নকল গান এই সংকলনে ঢুকে থাকতে পারে।
আমাদের চলচ্চিত্রে গাওয়া গান নিয়ে লেখা বই সত্যিকার অর্থেই দুর্লভ। লেখককে তাই তথ্যসূত্র হিসেবে প্রথমত ব্যবহার করতে হয়েছে মূল চলচ্চিত্র, দ্বিতীয়ত গানের রেকর্ড। বিংশ শতকের ছয় থেকে আট দশক পর্যন্ত সিনেমার গানের রেকর্ড বের হতো ছবি মুক্তির আগেভাগে, নতুবা পরে। ব্যবসায়িক বিচার থেকে যেসব গানকে জনপ্রিয় বলে মনে করা হতো, সেগুলোই রেকর্ডে ধারণ করা হতো। কিন্তু এরপর থেকে সিনেমার গানের রেকর্ড বের না হওয়ায় বহু ভালো গান বিলুপ্তির গর্ভে লীন হয়ে গেছে।

লেখক জানাচ্ছেন, বর্তমানে এ ক্ষেত্রে আশার আলো দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে সম্প্রতি ‘বিলুপ্তপ্রায় স্বর্ণালি অতীতের’ বেশ কিছু ছবি এবং হারিয়ে যাওয়া বহু গানের সন্ধান পাওয়া গেছে। এই সূত্র থেকেও অনেক গান সংগ্রহ করে আলোচ্য বইয়ে সংকলিত করেছেন লেখক।

এখানেই তিনি থেমে থাকেননি। বাংলাদেশের সিনেমায় গাওয়া গানের একটি পূর্ণাঙ্গ ডেটাবেইস তৈরির সুপারিশও করেছেন। ভারতে এ কাজটি কীভাবে এগিয়ে চলেছে, তুলে ধরেছেন সে-সংক্রান্ত তথ্যাদিও।
এ বইয়ের পাঠ সব বিচারেরই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত ‘বাংলাদেশের সিনেমার গান: একটি বিশ্লেষণ’ শিরোনামে ৩৭ পৃষ্ঠার যে নিবন্ধটি এখানে আছে, তাতে তুলে ধরা হয়েছে সিনেমার নেপথ্য সংগীতের সূচনাকালের ইতিহাস। শুরু থেকে নির্দিষ্ট কালপর্ব পর্যন্ত কারা ছিলেন এর কুশীলব, তুলে ধরা হয়েছে তার বিবরণও। এর সঙ্গে আছে সেই সব কুশীলবের দুর্লভ কিছু ছবি। সিনেমার পোস্টারও।

তারপরই শুরু হয়েছে সে অধ্যায়টি, যার শিরোনাম ‘স্মরণীয় গান’। এখানে স্থানে পেয়েছে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার ৫৫০টি গান। মুক্তি পায়নি এমন সিনেমার ১০টি গান ঠাঁই পেয়েছে ‘মুক্তি না পাওয়া সিনেমার গান’ অধ্যায়ে।
বইয়ের শেষে আছে তথ্যসূত্র ও টীকা, পরিশিষ্ট, সিনেমার বর্ণনানুক্রমিক সূচি ও গানের প্রথম লাইন।
বইটির পাঠ পাঠককে বিরল অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করবে। করে তুলবে স্মৃতিমেদুরও।