রাশিয়ার মতো চীনও বড় বিপদ মনে করছে আমেরিকা

নিউজ ডেস্ক : আমেরিকার জন্য রাশিয়ার মতো চীনও বিপদ বলে বিবিসি’তে এক সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেছেন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র প্রধান মাইক পম্পেও। বলেন, পশ্চিমে চীন যেভাবে গোপনে প্রভাব বিস্তার করছে তাতে দেশটিকে নিয়ে রাশিয়ার মতো উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ তো আছেই, এমনকি রাশিয়ার তুলনায় চীন আরো বড় বিপদ হতে পারে।

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, চীন আমেরিকার বাণিজ্য তথ্য চুরি এবং স্কুল ও হাসপাতালগুলোতে তাদের প্রভাব বাড়াচ্ছে। এখন তারা ইউরোপ ও ব্রিটেনের দিকেও হাত বাড়িয়েছে। গোপন তৎপরতা চালাতে চীনের আরো বড় পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থনীতির দিক থেকে রাশিয়া এবং চীনের কথা উল্লেখ করে পম্পেও বলেন, দুই দেশের অর্থনীতির সমীকরণ নিয়ে একটু ভেবে দেখুন, রাশিয়ার চেয়ে এক্ষেত্রে চীনের পদচারণাই বেশি। পশ্চিমী সমাজে দুই দেশের প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতার তুলনা করে তিনি বলেন, ওই লক্ষ্য বাস্তবায়নে রাশিয়ানদের চেয়ে চীনারা অনেক বেশি এগিয়ে। বাজার দখলের দিক দিয়ে চীন রাশিয়ার চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে। বেইজিং বাজারে ঢোকার চেষ্টায় আমেরিকান কোম্পানিগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করছে বলেও সাক্ষাৎকারে অভিযোগ করেন সিআইএ প্রধান পম্পেও।

চীনের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে এ বছরের শুরুর দিকে সিআইএ’র একজন সাবেক কর্তাকে গ্রেফতার করা হয়। ওই কর্তা গ্রেফতার হওয়ার আগের দু’বছরে প্রায় ২০ তথ্যদাতাকে হত্যা কিংবা কারাবন্দি করতে হয়েছে। সম্প্রতি কয়েকবছরে এটি আমেরিকার গোয়েন্দাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। 

পম্পেও বলেন,পশ্চিমী দুনিয়ার উপর চীনের প্রভাব বিস্তার প্রতিরোধে পশ্চিমী দেশগুলো একজোট হয়ে আরো বেশি কাজ করতে পারে। আমেরিকার তথ্য চুরির জন্য চীনা গোয়েন্দারা আমেরিকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে। তারা চীন সরকারের হয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে কাজ করছে।

এছাড়াও পম্পেও জানান, উত্তর কোরিয়াও আমেরিকার জন্য একইরকম বিপদ। কয়েক মাসের মধ্যেই তারা আমেরিকায় পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
আলোচনায় ইরান প্রসঙ্গেও কথা বলেন পম্পেও। বলেন, সিরিয়ার ব্যাপারে ইরান ও রাশিয়ার চেয়ে আমেরিকা কমই নাক গলিয়েছে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ রাশিয়া ও ইরানের সহযোগিতাতেই এখনও ক্ষমতায় আছে বলে পম্পেও উল্লেখ করেন।

আমেরিকার অন্তর্বর্তী নির্বাচনকেও রাশিয়া টার্গেট করতে পারে, ধারণা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার আমেরিকায় চলতি বছরের শেষদিকে হতে যাওয়া অন্তর্বর্তী নির্বাচনেও রাশিয়া হস্তক্ষেপ করতে পারে বলে ধারণা করছেন মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) প্রধান মাইক পম্পেও। বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, আমেরিকা ও ইউরোপের ক্ষতি করতে মস্কোর চেষ্টা কমেছে এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সিআইএ প্রধানের শঙ্কা, উত্তর কোরিয়া কয়েক মাসের মধ্যে আমেরিকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব পালনে উপযুক্ত নন, আলোচিত বই ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি : ইনসাইড দ্য ট্রাম্প হোয়াইট হাউস’- এ বলা সাংবাদিক মাইকেল উলফের এ ভাষ্যকে ‘আবোলতাবোল’ বলেও উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি।

মস্কো ও ট্রাম্প অস্বীকার করলেও মার্কিন গোয়েন্দাসংস্থাগুলি ২০১৬-র প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের বিষয়ে অভিযোগ করে আসছে। ওভাল অফিসে বসার পর প্রথম বছরের পুরোটাই ট্রাম্পকে এ অভিযোগ মোকাবেলা করতে হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে ক্রেমলিনের সঙ্গে রিপাবলিকান শিবিরের সংযোগ এবং সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে মার্কিন কংগ্রেস ও বিচার বিভাগে তদন্তও চলছে।

ভার্জিনিয়ার ল্যাঙ্গলিতে সিআইএর সদরদপ্তরে বিবিসির সঙ্গে কথা বলেন পম্পেও। সাক্ষাৎকারে পম্পেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অধীনে সিআইএ-র দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে, সে সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা দেন। ‘আমরা বিশ্বের সেরা গোয়েন্দা সংস্থা। আমরা বের হই এবং মার্কিন জনগণের হয়ে যেকোনো ভাবে হোক তথ্য চুরি করি। আমি আবারও (সিআইএকে) সামনের পায়ে দাঁড় করাতে চাই,’ বলেন তিনি। দায়িত্ব পালনের বছরখানেকের মাথায় সিআইএর প্রধান বলছেন, তার লক্ষ্য গোয়েন্দা সংস্থাটির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত ও ভারমুক্ত করা। সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা থাকার কথা স্বীকার করলেও পম্পেও বলছেন, তার দৃষ্টিতে রাশিয়া এখনো আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী; ইউরোপের দেশগুলিতে মস্কোর হস্তক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগের কথাও জানান তিনি। ‘তাদের কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্য মাত্রায় হ্রাস পেয়েছে এমনটা দেখছি না,’ বলেন তিনি।

নভেম্বরের অন্তর্বর্তী নির্বাচনেও রাশিয়াকে নিয়ে উদ্বেগ আছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে সিআইএ প্রধান বলেন, অবশ্যই। আমার ধারণা তারা এটা করার চেষ্টা করে যাবে, তবে আমি আত্মবিশ্বাসী আমেরিকা একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে সমর্থ হবে। আমরা এমন এক পদ্ধতিতে ফিরে যেতে চাই যেন আমাদের নির্বাচনে তাদের প্রভাব বড় না হয়ে ওঠে।

রাশিয়ার ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের পাল্টা জবাব দিতে আমেরিকা কাজ করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মস্কোর হস্তক্ষেপে বিষয়ে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থাগুলির দাবিকে প্রায়ই উড়িয়ে দেন ট্রাম্প, সিআই প্রধান কি এই দু’য়ের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করছেন? উত্তরে পম্পেও বলেন, আমি সংযোগ টানছি না, সত্য টানছি।

সিআইএপ্রধান হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে প্রতিদিন ব্রিফ করার দায়িত্ব পম্পেওর। দু’জন ওয়াশিংটন ডিসিতে থাকলে প্রায়দিনই এ ব্রিফ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সাম্প্রতিক ঘটনা ও কৌশলগত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা চলে। বিদেশ সফর কিংবা বিদেশি নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের আগে ব্রিফিংয়ে প্রেসিডেন্টকে এমনভাবে ব্রিফ করা হয় যেন তিনি তথ্যগত সুবিধা আদায় করে নিতে পারেন। ‘তিনি খুব মনোযোগী, আমরা যেসব তথ্য তাকে দিই সেসব বিষয়ে তার আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়।’ একই আলোচনায় মাইকেল উলফের লেখা ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি : ইনসাইড দ্য ট্রাম্প হোয়াইট হাউস’ বইতে ট্রাম্পের মানসিক সুস্থতা নিয়ে করা দাবিও উড়িয়ে দেন তিনি।

‘এটা ভিত্তিহীন। আমি বইটি পড়িনি, ইচ্ছাও নেই। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিতে প্রেসিডেন্টের নজর ও উপলব্ধি নেই এই ধরনের দাবি মিথ্যা ও বিপজ্জনক। এ ধরনের আবোলতাবোল কিছু লেখার জন্য কেউ সময় ব্যয় করেছে এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি দুঃখ দিয়েছে,’ বলেন তিনি। বিদেশ নীতি নিয়ে ট্রাম্পের করা বিভিন্ন ট্যুইট ও খোলামেলা বক্তব্যেও আপত্তি দেখছেন না সিআইএ প্রধান। উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে ট্রাম্পের ধারাবাহিক ট্যুইট দেশটির শীর্ষ নেতা কিম জং উনকে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে বলেও মনে করেন তিনি। ‘যখন আপনি দেখেন প্রেসিডেন্ট এ ধরণের ভাষা ব্যবহার করছেন এবং এর অনেক দর্শকও আছে, আমি আপনাকে নিশ্চিত করতে পারি, আমেরিকা যে এই ইস্যুকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে কিম জং উন সে বার্তা পাচ্ছেন বলেই আমি নিশ্চিত করতে পারি।’

পিয়ংইয়ং ইস্যুতে আমেরিকার কূটনৈতিক সফলতা আছে বলেও দাবি করেন তিনি। রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সাম্প্রতিক ভোটকে ইঙ্গিত করে পম্পেও বলেন, চীন উত্তর কোরিয়ার কাছ থেকে সরে আসছে। তবে এখনও এই বিষয়ে বেইজিংয়ের আরো অনেক কিছু করার আছে বলেও মন্তব্য তার।