জাতীয় পার্টির বক্তব্য মানুষের কাছে হাস্যকর: মওদুদ

নিউজ ডেস্ক: বর্তমান দশম সংসদকে স্বাধীনতার পর সবচেয়ে অকার্যকর ও হাস্যকর সংসদ বলে অভিহিত করেছেন সাবেক আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী এবং বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তিনি বলেন, বর্তমান সংসদের কোনো কার্যকারিতা ও জবাবদিহি নেই। এতে কার্যকর কোনো বিরোধী দলও নেই। আছে হাস্যকর বিরোধী দল।

যারা একই সঙ্গে সরকারের মন্ত্রিত্ব এবং বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে।

দশম সংসদের চার বছর পূর্তি উপলক্ষে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

মওদুদ আহমদ বলেন, বর্তমান সংসদ দেশের মানুষের জন্য কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। এই সংসদ কোনোভাবেই গণতন্ত্রের চর্চা করেনি। সংবিধানে যে নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে- সেই নির্বাচনের মাধ্যমে এ সংসদ গঠিত হয়নি। ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৪ আসনে ভোটারদের ভোট দিতে হয়নি। অর্থাৎ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি।

তিনি বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন সঠিক দায়িত্ব পালন করেনি। ইসির উচিত ছিল, ওই নির্বাচন স্থগিত করে দেওয়া।

সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির ভূমিকাকে কীভাবে দেখেন- এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, এটা একটা হাস্যকর বিষয়। নজিরবিহীনও বলা যেতে পারে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত এবং তার দলের এমপিরা মন্ত্রিসভায় থেকে সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। এর ফলে সংসদে সত্যিকার অর্থে কোনো বিরোধী দল নেই। এটা মূলত একদলীয় সরকার বলা যায়। এ জন্য জাতীয় পার্টির কোনো নেতা যদি সরকারের বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্য রাখেনও, সেটা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না।

এ সংসদকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় স্বীকৃতি দিয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, কূটনৈতিক কারণে বিদেশিরা সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। যারাই ক্ষমতায় থাকে তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক কারণে সম্পর্ক রাখতে হয়। এমনকি মার্শাল লর অধীনে সেনা সরকার থাকলেও ব্যবসা-বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে বাস্তবতার নিরিখে সেই সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে তারা বাধ্য হয়।

কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের (সিপিএ) ৬৩তম সম্মেলন হওয়া, স্পিকার ড. শিরীন শারমীন চৌধুরী এ সংগঠনের নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান এবং সাবের হোসেন চৌধুরী ইন্টারপার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ) সভাপতি নির্বাচিত হওয়া কি বর্তমান সংসদের সাফল্য নয়- এমন প্রশ্নের জবাবে বিশিষ্ট এ পার্লামেন্টারিয়ান বলেন, এগুলো সংসদের সাফল্য হিসেবে গণ্য হয় না। এগুলো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আর কিছু নয়।

কার্যকর সংসদ না হওয়ার পেছনে নির্বাচন বর্জনকারী দল হিসেবে বিএনপি কি দায়ী নয়- এমন প্রশ্নের জবাবে দলের নীতিনির্ধারক নেতা মওদুদ আহমদ বলেন, অকার্যকর সংসদের জন্য মোটেই বিএনপি দায়ী নয়। কারণ আমরা তো সব সময় বলে আসছি, কোনো দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশনের পক্ষে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা সম্ভব নয়। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ‘৯৬ সালে প্রবর্তিত হয়, তুমুল আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে।

যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই আন্দোলন সফল করতে ১৭৩ দিন হরতাল ডাকা হয়েছিল। আন্দোলনের মুখে বিএনপি সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচন দিয়েছিল। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করার পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তখন গর্ব করে বলেছিলেন, এই নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থার কারণে তারা ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণাটি ছিল তারই ‘ব্রেইন চাইল্ড’।

মওদুদ আহমদ বলেন, আজকে প্রধানমন্ত্রী যে ভাষায় কথা বলেন, একই ভাষায় তখন খালেদা জিয়া বলতেন- সংবিধানে নির্দেশিত ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন হওয়া উচিত। একটি নির্বাচিত সরকারকে অপসারণ করে একটি নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা সংবিধানসম্মত নয়। নির্বাচিত একটি দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়া উচিত।

মওদুদ বলেন, এক দল অন্য দলকে বিশ্বাস করতে পারেনি বলেই নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হয়েছিল। তা ছাড়া প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক সংক্ষিপ্ত আদেশে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে পরবর্তী দুটি নির্বাচন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করা যেতে পারে বলে উল্লেখ করেছিলেন। সেটাকেও উপেক্ষা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানটি বিলুপ্ত করা হয়।

সরকারি দলের নৈতিকতাবিহীন এ ভূমিকা দেশবাসী পছন্দ করেনি।

চার বছরেও সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন আদায় করতে না পারা বিএনপির ব্যর্থতা নয় কি- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশে এখন একটা অসম ও বৈষম্যমূলক রাজনীতি চলছে। বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করতে শীর্ষ থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৪০ হাজার মামলা করা হয়। সাড়ে সাত লাখ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। কোনো ঘরোয়া বৈঠকও করতে দেওয়া হয়নি। রাতে কোনো নেতাকর্মী যেন বাড়িতে থাকতে না পারে সে জন্য পুলিশ ঘন ঘন অভিযান চালিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে গত চার বছরে বিএনপি আন্দোলনমুখী কর্মসূচি তো দূরের কথা, তাদের নিয়মিত কর্মসূচি পালন করতে পারেনি।

পঞ্চম সংসদ থেকে শুরু করে সর্বশেষ দশম সংসদের মধ্যে তুলনামূলক পার্থক্য জানতে চাইলে সাবেক এই আইনমন্ত্রী বলেন, অনেক পার্থক্য আছে। ‘৭৯, ‘৮৬, ‘৯১, ‘৯৬, ২০০১ নির্বাচনে গঠিত সংসদ মোটামুটি কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। শক্তিশালী বিরোধী দল ছিল। জনগণের কাছে সংসদকে মোটামুটিভাবে জবাবদিহি করতে হয়েছে।

সংসদের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্ট। এ রায় সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি বলেই সুপ্রিম কোর্টের ভাবমূর্তি ও ঐতিহ্যের ওপর সংসদে সমালোচনা হয়- এটা জাতির জন্য লজ্জাজনক ঘটনা। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার পরিণতি দেখে এখন বিচারকরা বিবেক অনুযায়ী রায় দিতে ভয় পান।

আগামী নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করতে নির্বাচন কমিশনের রোডম্যাপ ও সংলাপের উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মওদুদ আহমদ বলেন, সব আইওয়াশ। প্রতিদিন তাদের নতুন নতুন রূপ দেখি। প্রধানমন্ত্রীসহ ও অন্য মন্ত্রীরা সরকারি খরচে এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কীভাবে একতরফা নির্বাচনী প্রচার চালান? নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর যে প্রচার চালানোর কথা, সেটা এখন চালাচ্ছেন তারা। ইসি নিরপেক্ষ হলে এই প্রচার বন্ধ করে দিত। তা না করলে আগামীতে সুষ্ঠু ভোট কীভাবে হবে?