আমি কোন এক বাঙালির কথা বলছি

এম এস প্রিন্স

আমি কাল্পনিক কোনো গল্প যেমন বলছি না
তেমনি কোনো রাজার কাহিনীও বলছি না
বলছি নিতান্তই সহজ সরল এক বাঙালির কথা।

আজ ছ’মাস, প্রবাস জীবনের গল্পটা আমার জেলে
জানি না মা-বাবা কেমন আছে, কেমন আছে ভাই-বোন?
আর কেমনেই বা আছে আমার দরদিয়া! বলে চিত হয়ে-
মাটিতে শোয়ে পড়ল। স্বপ্নের নীল পাখি গুলো খেলা –
করছে চার-দেয়ালের ভিতরেই।
তবু কত কথা জাগে মনের গভীরে।
তাও আবার দীর্ঘশ্বাসে পুরে- ‘বিদেশ কেন এসেছিলাম?’
এই বুলির মাঝে এসে চুপ হয়।

বুঝি দরদিয়া নিয়েই আছে?
আর দরদিয়ার মনে সন্দেহ- মা-বাবাই সব।
বাড়ছে উভয়ে ব্যবধান।
নিরাশার শাদা চাদর নতুন আস্তরের আবরণে।
ময়না শালিকের ছড়া আর ময়ূরের কবিতার পাণ্ডুলিপি পুড়ে ছাই।
শান্ত পাখিরাও নীড় ছেড়ে পালিয়েছে।
চিঠি যেমন আসে না! তেমনি জানে না কেউ কারো খবর।

খোকন, খোকন এই খোকন! ডাক শোনে মা- বলে চিৎকার-
দিয়ে ঘুম ভাঙে।
না আছে মা, না আছে হাতে নিয়ে ডাকা সোনার তালা ভরা ভাত।
অন্ধকার সেল ঘর। তবু ধীরে ধীরে সামনে এসে-
বা-হাতে মুছল লোহার দরজায় ধরে দাঁড়িয়ে নয়নের জল।
অমনি কান গলায় ঢুকল দরদিয়ার সবুজ কণ্ঠ।
আশার বাণিতে মৃদু হাসি মুখে পিছু ফিরে- কিন্তু কই?
মিটিমিটি করে জ্বলছে কেবল একটি জোনাকি।
সবুজ তৃণ মুখটির দেখা আর হল না।
জোনাকির দিকে তাকিয়ে তাই শুধু হুঙ্কারেই দিয়ে গেল-
আমাকে জেলে আনা একটি সাজানো নাটক। মুক্তি দাও-
আমি আমার দরদিয়ার কাছে যাব, ফিরে যাব যার বুকের ধন-
আঁচলের আধার তার কাছে।
কিন্তু কেউ শোনেনি। হাতাশায় অবশেষে দু’হাত মেলে মাটিতে
শোয়ে পানি পানিই করে গেল।
এই বিভীষিকা চোখের সামনে, হয়ত-বা সহায়ক হতে পারিনি-
কারণ আমিও পাশের সেলে।
হয়ত ভাষা তেমন জানা নেই তবু কালজয়ী বেদনার সাক্ষী হিসেবে-
নিষ্ঠুর ভাগ্য থেকে শিখে বর্ণনা করছি এই ভয়ানক দৃশ্যের।
আসসালাতু-খায়রুন মিনান-নাও- আসসালাতুখায়রুন মিনান নাও
মুয়াযযিনের আযান ধ্বনি কান গলায় প্রবেশ করল।
রাতের পাখি গেল ঘুমের ঘরে।
সব তারা শূন্যের আড়ালে গেলেও মিটিমিটি করে জ্বলছে একটি-
সেও বুঝি মিলাবে সব হারাদের মাঝে।
এ সময় হাওয়ায় ভাসমান গ্লাস দিল দু’ফোটা নিরদ
অতপর খোকনের প্লাইট হয়ে গেল না ফেরার দেশে।
জীবনের পাণ্ডুলিপির শেষ দৃশ্যে লিখে গেল- ‘আমি বাংলার সন্তান,
ফিরে যাচ্ছি আমার দরদিয়া কাছে
ফিরে যাচ্ছি মা-বাবা ভাই- বোনের কাছে।
আমি যে নিরাপরাধী, তাই বিদেশের এ জেল মুক্তি দিয়েছে-
আমাকে আটকে রাখতে পারেনি।
অপরাধী তারা যারা আমাকে প্রবাস নামে পাচার করেছিল।’