ফের আলোচনায় যশোর রোড

নিউজ ডেস্ক: ইতিহাসের সাক্ষী যশোর রোড নতুন করে আলোচনার কেন্দ বিন্দুতে। বাংলাদেশের সাথে ভারতের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ বিন্দু বেনাপোল সীমান্ত। এশিয়ার সর্ববৃহত্ স্থলবন্দরও এটা। অর্থনৈতিক গুরুত্বের বিবেচনায় বেনাপোল সীমান্ত থেকে যশোর শহর পর্যন্ত ৩৮ কিলোমিটার সড়কের সম্প্রসারণ সময়ের দাবি। প্রতিবছর লাফিয়ে লাফিয়ে বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যের বিস্তার, আরও স্পষ্ট করে বললে পদ্মা সেতু চালুর পর অর্থনীতিবিদরা এ পথে বাণিজ্যের যে উল্লম্ফনের সম্ভাবনা দেখছেন। সেই জন্যও সড়কের সম্প্রসারণের বিকল্প নেই।

কিন্তু বিতর্কটা সৃষ্টি হয়েছে সড়কটিকে ছায়া দিয়ে ঢেকে রাখা দুই পাশের বিশাল বিশাল গাছগুলোকে রেখে নাকি কেটে রাস্তার সম্প্রসারণ হবে তাই নিয়ে। একটি পক্ষ গাছ কেটে রাস্তা তৈরির পক্ষে। পরিবেশবিদরা বলছেন, ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখতে গাছ রক্ষার বিকল্প নেই। মাঝামাঝি আরেকটি পক্ষ বলছেন, যেপাশে গাছ কম আছে, সেই একপাশ কেটে একদিকে সম্প্রসারণ করা হলে দুইয়ের সম্মিলন করা সম্ভব। নিত্যনতুন এসব বিতর্কের মধ্যে যশোর রোডের ঐতিহাসিক গাছের নতুন ঠিকানা হয়েছে আদালত পাড়া। গাছ কেন কাটা হবে, তা নিয়ে আইনগত নোটিশ পৌঁছেছে সংশ্লিষ্টদের কাছে। উচ্চ আদালতে রিটের সূত্র ধরে ৬ মাসের জন্য গাছ কাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন মহামান্য হাইকোর্ট। সব মিলিয়ে ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সভ্যতা, সংস্কৃতির ধারক বাহক তথা মুক্তিযুদ্ধের স্মারকচিহ্ন যশোর-বেনাপোল সড়কের ঐতিহাসিক প্রায় দ্বিশতবর্ষী ২ হাজার ৩১২টি গাছ আপাতত ৬ মাসের জন্য ‘প্রাণভিক্ষা’ পেল।

যশোর রোডের ইতিকথা: মার্কিন কবি ও সাংবাদিক অ্যালেন গিন্সবাগের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপর লেখা বিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ এ জীবন্ত হয়ে উঠেছে একাত্তর আর যশোর রোড। কবিতাকে গানের ফ্রেমে বন্দী করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শিল্পী মৌসুমী ভৌমিক ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’-কে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছেন।

কিন্তু এই যে কবিতা, এই যে সুর তার পিছনে কী এমন ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে যশোর রোডের? মুক্তিযুদ্ধকালীন বৃহত্তর যশোরের বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট বা বিএলএফ উপপ্রধান বীর মুক্তিযোদ্ধা রবিউল আলম মেলে ধরেন স্মৃতির ঝাঁপি— ‘২৫ মার্চের পর থেকে যশোর ক্যন্টনমেন্ট ছেড়ে বেরিয়ে এসে পাকিস্তানি আর্মিরা যশোর শহরের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিতে থাকে। রাস্তার ধারের পথচারি ও ঘুমন্ত সাধারণ মানুষকে গুলি করে হত্যা করতে থাকে। পাক হানাদার বাহিনীর এরকম আক্রমনে মানুষ ছোট ছোট দলে প্রথমে চৌগাছার বয়রা, মাসিলা ও বর্ণি সীমান্ত দিয়ে আশ্রয়ের সন্ধানে ভারতে যেতে শুরু করে। কিছুদিনের মধ্যে দেশের নানা প্রান্তের মানুষ চৌগাছার পাশাপাশি বেনাপোল সীমান্ত দিয়েও ভারতে যেতে থাকে।’ একটা সময় বেনাপোলের ওপারে যশোর রোড ধরে বনগাঁ থেকে চাপাবাড়িয়া, টালিখোলা ছাত্র-যুব শরণার্থী শিবিরে ভরে ওঠে। মহাকুমা শহর বনগাঁ ও কলকাতা অভিমুখি ছোট-বড় শহরগুলো শরণার্থীতে পূর্ণ হয়ে ওঠে। ভারতীয়রাও নিজেদের ভালোবাসার সবটুকু উজাড় করে দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়ায়। যশোর রোডের চারপাশে ভারতের নানা প্রান্তের মানুষ ছুটে আসেন সহযোগিতার হাত নিয়ে। তাদের কেউ ট্রেনে পেট্রাপোলমুখি, কেউবা যশোর রোড ধরে শরণার্থী ক্যাম্পে ছুটে আসেন।’

তার কথায় জানা গেল এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি থেকে বাংলাদেশ অংশে পাকবাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে সরাসরি যশোর রোড ধরে কলকাতা যাওয়াটা সহজ ছিল না। এজন্য সাধারণ মানুষ এই রোডের পাশের গ্রামের রাস্তা ধরে কলকাতা পৌঁছানোর পন্থা বেছে নেন। নভেম্বরের শেষদিকে অথবা ডিসেম্বরের প্রথমদিকে এই রোডের ঝিকরগাছায় কপোতাক্ষ নদের ওপর নির্মিত ব্রিজটি পাকসেনারা উড়িয়ে দেয়। এর প্রধান কারণই ছিল যশোর রোড হয়ে কলকাতার সাথে ভারতের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া।

২ ডিসেম্বর ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তান যুদ্ধ ঘোষণা করে। এসময় মিত্রবাহিনী গঠন হলে ভারত থেকে সৈন্যরা বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য প্রথমে অপেক্ষাকৃত স্বল্প দূরত্ব ও সড়ক যোগাযোগের তাত্ক্ষণিক সুবিধার জন্য চৌগাছার সীমান্ত পথ বেছে নেন। যশোর ক্যান্টনমেন্টের অবস্থান চৌগাছা সীমান্তের কাছে থাকাও এ পথকে বেছে নেয়ার বড় একটি কারণ। এখানকার ভয়ঙ্কর ট্রাঙ্ক যুদ্ধ ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ট্রাঙ্ক যুদ্ধ বলে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে। চৌগাছার যুদ্ধ পাকিস্তানিদের বিপর্যয় চূড়ান্ত রুপ নিলে তারা যশোর শহর হয়ে খুলনার দিকে পালাতে শুরু করে।

চৌগাছা সীমান্ত দিয়ে প্রথমে মিত্রবাহিনী প্রবেশ করলেও সে পথটি যোগাযোগের জন্য খুব মসৃণ ছিল না। এজন্য সেই যশোর রোডকেই প্রধান সড়কে পরিণত করতে হয়। ভারতীয় পদাতিক ও আর্টিলারি বাহিনীর প্রধান প্রবেশপথই হয়ে এই রোড। ৬ ডিসেম্বর যশোর মুক্ত হলে ঐতিহাসিক আরেক ঘটনার সাক্ষী হয়ে ওঠে যশোর। ১১ ডিসেম্বর শহরের টাউন হল ময়দানে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রবাসী সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদসহ নেতৃবৃন্দ এই জনসভায় ভাষণ দেন। তারা ওইদিনই আবার কলকাতা ফিরে যান। তাদের আসা-যাওয়ার পথেরও সাক্ষী সেই ঐতিহাসিক যশোর রোড। কেবল তাই নয়। এই রোড লাখ লাখ শরণার্থীর পদচিহ্নেরও সাক্ষী হয়ে আছে। এই রোড বিজয়ী বাঙালির ঘরে ফিরে আসার সাক্ষী। সম্ভমহারা নারী, সন্তানহারা পিতার অশ্রুতে সিক্ত হয়ে আছে। এই রোড আমাদের মহান ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধের বিজয় দ্বারের অভিধায় গৌরবদীপ্ত।