সরিষা ক্ষেতে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত মৌচাষী

চাটমোহর প্রতিনিধি: পাবনার চাটমোহরসহ চলনবিলের অধ্যুষিত উপজেলাগুলোতে সরিষা ক্ষেত থেকে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত মৌচাষীরা। শস্যভান্ডার খ্যাত মাছ ছাড়াও ধান, সরিষা, রসুনের পাশাপাশি মধু উৎপাদনে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে। মৌমাছির গুঞ্জনে মুখরিত হয়ে উঠেছে গোটা বিলাঞ্চল। এ অঞ্চলের ফসলের মাঠে এখন সরিষার হলুদ ফুলের সমারোহ। মাঠ জুড়ে হলুদ ফুলের দৃষ্টিনন্দন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। মধু উৎপাদনে চলনবিলে এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।

আবহাওয়া অনুকূল থাকলে চলতি মওসুমে চলনবিল অঞ্চল থেকে প্রায় দেড় হাজার টন মধু আহরণের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মৌ-চাষিরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। কৃষি স¤প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলনবিল অঞ্চলের চাটমোহর, বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, সিংড়া, তাড়াশ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলায় চলতি রবি মওসুমে ৬২ হাজার ৪৫৫ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন আগাম ও নাবী জাতের সরিষা চাষ হয়েছে।

চলনবিলের মাঝ বরাবর বনপাড়া-হাটিকুমরুল যমুনা সেতু সংযোগ মহাসড়কের দু’ধারে মাঠের পর মাঠ দৃষ্টিনন্দন মনোমুগ্ধকর থোকা থোকা হলুদ ফুলের চাঁদর বিছানো। সেই হলুদ ছুঁয়েছে দিগন্ত রেখায়। নয়নাভিরাম সেই সরিষা ক্ষেতের আলে আলে এখন শুধুই সারিসারি মৌ-বাক্স।

আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় সরষের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
চলনবিলে ইউরোপিয়ান হাইব্রীড এপিস মেলিফেরা মৌমাছির মৌ মৌ গুঞ্জনে মুখরিত হয়ে উঠেছে গোটা বিলাঞ্চল। ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি উড়ে গিয়ে সরিষা ফুলে বসছে। কিছুক্ষণ পর পর মধু নিয়ে উড়ে এসে মৌমাছির দল ফিরছে মৌ-বাক্স।

উত্তরাঞ্চল মৌচাষী সমিতির সভাপতি মোঃ জাহাঙ্গীর আলম জানায়, চলতি মওসুমে চলনবিলে থেকে এক হাজার ৫’শ থেকে এক হাজার ৬’শ টন মধু আহরণের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানালেন যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রতি কেজি সর্বনিম্ন ১৫০ টাকা হিসেবে ২২ থেকে ২৫ কোটি টাকা। প্রায় এক মাস আগে বগুড়া, যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা, সাতক্ষীরা, পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় ৭ শতাধিক প্রশিক্ষিত মৌখামারি চলনবিলে অস্থায়ী আবাস গেড়েছেন। মৌচাষিরা সরষে ক্ষেতের আলে ৪৫ থেকে ৫৫ হাজার মৌবাক্স বসিয়েছেন। প্রতি বছর নভেম্বর থেকে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত সরষে ফুলের মধু আহরণ চলে। এ সময়ে গড়ে একেকজন মৌচাষি গড়ে দুই থেকে আড়াই টন মধু আহরণ করতে পারেন।

উত্তরবঙ্গ মৌচাষি সমিতির সভাপতি পাবনার চাটমোহরের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম আরো জানায়, গত বছরের চেয়ে এবার প্রায় দ্বিগুণ মৌবাক্স নিয়ে হাজির হয়েছেন মৌচাষিরা। চলনবিল শুধু মাছের বিলই নয়; এখন মধু উৎপাদনের বিল হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে। প্রাকৃতিক উপায়ে মধু সংগ্রহের ফলে শুধু মৌচাষিরাই লাভবান হচ্ছেন তাই নয়। মৌমাছির বিচরণে সঠিকভাবে সরষের ফুলে পরাগায়ন ঘটছে। তাতে সরষের উৎপাদন ক্ষমতা বেড়ে গেছে অনেক। এতে লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা।

পরিবেশবিদরা বলছেন, ক্ষেতে কীটনাশক ব্যবহার কম হওয়ায় উপকৃত হচ্ছে পরিবেশ। মৌমাছি শুধু মধুই সংগ্রহ করে না, ফসলের জন্য ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গ মেরে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষকদের সহায়তা করে থাকে। বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে মধু সংগ্রহের পরিমাণ প্রায় এক লাখ কেজি। মধু প্রতি কেজি ১৫০ অগ্রিম বিক্রি হচ্ছে মাঠ থেকে। এ অঞ্চলে উৎপাদিত ভেজালমুক্ত মধুর গুণগত মান খুবই ভালো।

এ জন্য ভারতের ডাবর কোম্পানী, প্রাণ, স্কয়ার, এপি, এসিআইসহ ব্যান্ড প্রসাধনী কোম্পানীর এজেন্টরা চলনবিলের মাঠ থেকে অপরিশোধিত মধু অগ্রিম কেনা শুরু করেছে। সুন্দরবনের মধুচাষিরা চলনবিলে মধু সংগ্রহ করতে এসেছেন। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে এখানে মধু সংগ্রহ পুরোদমে শুরু হয়েছে।

পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ড. তাহমিনা হক জানান, অতীত কাল থেকে মধু বহু রোগের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। মধু পরিপাকে সহায়তা করে, ক্ষুধা বাড়ায়, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি, সর্দি, কাশি, জ্বর, হাপানি, হৃদরোগ, পুরনো আমাশয়, দাঁত, ত্বক, পেটের পীড়াসহ নানা জটিল রোগ নিরাময় করে থাকে। মধুতে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান ও ভেষজ গুণ রয়েছে। মধুর উচ্চমাত্রার ফ্রুক্টোজ ও গøুকোজ যা যকৃতে গ্রাইকোজেনের মজুত গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

মধুতে রয়েছে ফল শর্করা ৩৮.২ ভাগ, গøুকোজ ৩১.৩ ভাগ, মালটোস ৭.১ ভাগ, সুক্রোজ ১.৩ ভাগ, পানি ১৭.২ ভাগ, উচ্চ চিনি ১.৫ ভাগ, ছাই ০.২ ভাগ, খনিজ পদার্থ আয়রন, ক্যালসিয়াম, ফসফেট, সোডিয়াম ক্লোরিন, পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম রয়েছে ৩ দশমিক ২ ভাগ। এছাড়া মধু ভাল শক্তি প্রদায়ী খাদ্য।

খুলনা থেকে চলনবিল এলাকায় মধু সংগ্রহ করতে আসা নাছির উদ্দিন বলেন, প্রায় পাঁচ বছর ধরে তিনি মধু আহরণ করছেন। গত বছর দুই টন মধু আহরণ করেছিলেন, এবার আবহাওয়া ভালো থাকলে তিন টনের বেশি মধু সংগ্রহ করতে পারবেন। মৌ-চাষিরা জানান, বছরের সাত মাস মধু পাওয়া যায়। সরষের পর লিচু, আম, ধনিয়া, তিলসহ বিভিন্ন ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়।