শ্রেষ্ঠ উপহার গাছের চারা

নিউজ ডেস্ক: দাওয়াত খেয়ে একে একে অতিথিরা অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করছেন আর তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে গাছের চারা। গত বছরের শেষ দিনে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা এলাকায় একটি বউভাতের অনুষ্ঠানে এমন মনোরম দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বয়ং বর-কনে অতিথিদের হাতে এ উপহার তুলে দেন। কাউকে একটি, কাউকে একাধিক চারা উপহার দেওয়া হয়।

বউভাতের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন সিলেটের পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ভূমিসন্তান বাংলাদেশ’-এর কর্মীরা। তাঁরাই উপহার হিসেবে নিয়ে আসেন ৫০০ ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা। পরে ওই পরিবেশবাদী সংগঠনের কর্মীদের সম্মতিতেই বিয়ের আয়োজনে আসা অতিথিদের গাছগুলো ফিরতি উপহার হিসেবে তুলে দেন নবদম্পতি।

বনভূমি কমে যাওয়ার জন্য প্রকৃতি যতটা না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী আমরা। নিজেদের প্রয়োজনে নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলছি। কৃষিজমি লাগবে, সাফ করে ফেল জঙ্গল। বাড়িঘর বানাতে হবে, কেটে ফেল গাছ। আসবাব বানাতে হবে, কেটে ফেল গাছ। কী বোকাই না আমরা! এ রকম করতে গিয়ে আমরা যে নিজেদের সর্বনাশ ডেকে আনছি, তা একটুও ভাবছি না। গাছ কাটার পর নতুন করে গাছ না লাগানোর কারণে কত প্রজাতির গাছ যে এখন ধ্বংসের মুখে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। গাছ পাখিদের আশ্রয়স্থল। গাছ উজাড় হওয়ায় বিলুপ্ত হচ্ছে নানা প্রজাতির পাখিও।

গাছ কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে আর অক্সিজেন ত্যাগ করে। আর অক্সিজেন হচ্ছে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। আসলে গাছই হচ্ছে মানুষের পরম বন্ধু। গাছের উপকারিতার কথা বলে শেষ করা যাবে না। ক্লান্ত পথিককে ছায়া দেওয়া থেকে শুরু করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে গাছ। গাছ বজ্রপাত ঠেকায়। গাছ ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে আমাদের রক্ষা করে। গাছ থেকে ফল পাই, গাছ থেকে তৈরি হয় মূল‍্যবান ওষুধ। কোনো দেশে পর্যাপ্ত গাছ না থাকলে সে দেশে বৃষ্টিপাত হয় কম, ফলে মরুভূমিতে পরিণত হয়। আমাদের দেশ মনে হয় সেই মরুকরণের পথেই যাচ্ছে।

বনভূমি কমে আসায় আমাদের সরকার অবশ্য বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিসহ নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। পালিত হচ্ছে বৃক্ষরোপণ সপ্তাহ, আয়োজন করা হচ্ছে বৃক্ষমেলার। জনগণের মাঝে বিনা মূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের বৃক্ষের চারা। সৃজন করা হচ্ছে নার্সারি। জাতীয় পর্যায়ে দেওয়া হচ্ছে পুরস্কার। কিন্তু এসব উদ্যোগ খুব একটা কাজে আসছে বলে মনে হয় না।

কারণ, গাছ কাটা চলছেই এবং তা ব্যাপক হারে। অতিলোভী কাঠ ব্যবসায়ী, চোরাকারবারি ও ভূমিদস্যুদের সংঘবদ্ধ চক্র গাছপালা অবাধে নিধন করেই চলেছে। চলছে পাহাড় ও টিলা কাটা। সেই সঙ্গে কাটা পড়ছে পাহাড়ে ও টিলায় থাকা গাছ। ইটভাটায় পোড়ানো হচ্ছে গাছ। যেকোনো নতুন উদ্যোগ বা উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য সবার আগে গাছের ওপরই কোপ পড়ে। এভাবে বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে অথচ তা বন্ধে সরকারের পদক্ষেপ খুবই কম। এসব অপকর্ম যারা করে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। গাছপালা উজাড় হওয়া ঠেকাতে বন বিভাগের কোনো তৎপরতা নেই। আমরা উল্টো বন বিভাগের কর্মকর্তাদের বনের রক্ষক হিসেবে না পেয়ে ভক্ষক হিসেবেই বেশি পাই। এই বিভাগের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী বনদস্যুদের সঙ্গে আঁতাত গড়ে তুলে দেশের সর্বনাশ করছেন। এ ছাড়া গাছ কাটার নীতিমালা অনুসরণ না করার ফলেও বনজ সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে। কোন গাছ কখন কাটা যাবে, একটি গাছ কাটার পর কত গাছ লাগানো দরকার, সে ব্যাপারে সাধারণ মানুষের ধারণা নেই।