বন্যার্তদের মতো শীতার্তদের পাশে আসুন

তুহিন ওয়াদুদ:  আমি চোখ বন্ধ করে ভাবার চেষ্টা করি-দিনাজপুরের পুনর্ভবা, আত্রাই, গভেশ্বরী নদীর পানি যাদের বাড়ি ভাসিয়েছিল, এই ভয়াবহ শীতে তাদের কী অবস্থা এখন? ওখানকার বানভাসিরা শুধু পরনের কাপড় নিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছিল শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, শহর রক্ষা বাঁধে। রংপুরের ঘাঘট, যমুনেশ্বরী নদীর পানিতে ডুবে যাওয়া বানভাসিরা শীতে কি পর্যাপ্ত গরম কাপড় পেয়েছে? তিস্তা-ধরলার পানিতে লালমনিরহাট-কুড়িগ্রামের বানভাসি অসহায় মানুষগুলো কেমন আছে? ব্রহ্মপুত্র যাদের সবকিছু বিলীন করে দিয়েছে, অন্যের জমিতে আশ্রয় নেওয়া সেই হাজার হাজার মানুষের এখন কী দশা? গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতালপল্লির গৃহহীন মানুষগুলোর কথা তো কল্পনার অধিক কষ্টের। শুধু যে বন্যার্ত মানুষেরাই কষ্টে আছে তা নয়, উজানের অনেক বিত্তহীনেরও একই অবস্থা।

গত দুই শ বছরে যে বন্যা হয়নি, গেল বছর সেই বন্যা হয়েছে দেশের উত্তরের জেলাগুলোতে। এ বন্যার ধরনও ছিল কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির। হঠাৎ টানা বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢলে নদীর বাঁধ ভেঙে বাড়িঘর যে শুধু পানির নিচে তলিয়ে গেছে, তা নয়। অনেক স্থানে বাড়িঘর ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। আকস্মিক বন্যায় বাড়ির মানুষজন কোনো কিছুই নিতে পারেননি। গবাদিপশু থেকে শুরু করে সবকিছুই ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। গত বন্যায় ডুবে যাওয়া ফসল আর ঘরে তোলা সম্ভব হয়নি। অনেক কষ্টে অনেকেই বাড়িঘরটুকু কোনো রকম করেছে মাত্র। তাদের এখন তিন বেলা খাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। এই মানুষগুলো গত ৫০ বছরের মধ্যে এ বছরের রেকর্ড করা শীতে কেমন আছে, এটা কি আমরা অনুমান করার চেষ্টা করেছি। বন্যার ধকল এখনো তারা সামলে উঠতে পারেনি। তার ওপর ভয়াবহ শৈত্যপ্রবাহ চলছে।

গ্রামের ওই সব মানুষের অবস্থা করুণ থেকে করুণতর। আমরা জানি, গত বছরের শেষ দিকে বাংলাদেশের যে দারিদ্র্য-মানচিত্র প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে ৬৪ জেলার সবচেয়ে গরিব দশ জেলার মধ্যে কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট, দিনাজপুর, রংপুর, গাইবান্ধা জেলাও আছে। তার অর্থই হচ্ছে দেশের গরিবতর মানুষগুলো এখানে বাস করছে। এখানে প্রতিবছর গরিবের সংখ্যা বাড়ছে। যদিও সারা দেশে গড় দারিদ্র্য কমেছে অনেকখানি। ফলে দেশের অন্য এলাকার চেয়ে উত্তরের মানুষের শীতের কষ্ট নিবারণ করতে পারা মানুষের সংখ্যা কম।

পাঠক, আপনারা যাঁরা গত বছরের ভয়াবহ বন্যা প্রত্যক্ষ করেননি, তাঁরা একবার টেলিভিশন কিংবা পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত ছবিগুলোর কথা কল্পনা করুন। সেই সঙ্গে ভাবুন, সরকার তাদের পাশে পর্যাপ্ত সহযোগিতা নিয়ে আসেনি। এই মানুষগুলো কেমন আছে? আমরা হয়তো অনেকেই বিস্মিত হয়েছি। কিন্তু বন্যার অভিশাপে যারা সর্বস্ব কিংবা অনেকটাই হারিয়েছে, তাদের কষ্ট তো নিত্যদিনের। তাদের তো বিস্মৃত হওয়ার কোনো পথ খোলা নেই। প্রতি মুহূর্তে তাদের কষ্টের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। তাদের সেই কষ্টের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শীতের ভয়াবহতা। এ অবস্থায় তাদের জীবন বিপন্ন।

দেশবাসীর নিশ্চয়ই মনে আছে, সরকারের বক্তব্য যতটা আন্তরিকতাপূর্ণ ছিল, বাস্তবায়ন ততটা ছিল না। দেশবাসীর আরও মনে থাকার কথা, কুড়িগ্রামের অনেক সাংসদ দুই শ বছরের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যায় এলাকার পরিস্থিতি একবারও দেখতে আসেননি। সারা দেশ থেকে অসংখ্য সহৃদয় মানুষ এসেছিলেন তাৎক্ষণিক সহযোগিতার হাত নিয়ে। ঢাকা-চট্টগ্রাম-খুলনা-ময়মনসিংহসহ সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-দাতা সংস্থাসহ অনেক ব্যক্তি এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ছোট ছোট সহযোগিতা বন্যার্ত মানুষদের চরম সংকট কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। এরা ভোটপ্রত্যাশী নয়। এরা প্রচার চায়নি। বরং তারা বাংলাদেশে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে।

রংপুর অঞ্চলে এখন আর শণের ঘর দেখা যায় না। অধিকাংশ বিত্তহীনেরা উচ্চ সুদে বেসরকারি সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে টিনের বাড়ি বানায়। দারিদ্র্যপীড়িত মানুষগুলোর ঘর এখন টিনের। টিনের চালাগুলোর পদ্ধতিটাই এমন, যাতে প্রচুর বাতাস ঘরে ঢুকতে পারে। এই মানুষগুলোর বিছানার তোশক নেই। কাঠের চকি। টিনের চালার নিচ দিয়ে এবং বেড়ার নিচ দিয়ে হু হু করে কুয়াশা-বাতাস ঢুকতে থাকে। তাদের ঘরের তাপমাত্রা খোলা আকাশের নিচের তাপমাত্রার চেয়ে খুব কমবেশি হয় না। বরং টিনের চালা থেকে কুয়াশা জমে বৃষ্টির মতো ফোঁটা ফোঁটা গড়িয়ে পড়তে থাকে। একটু নড়াচড়া করলেই মনে হয় শীতল জলে ভেজা বিছানা। তখন তারা শুধু স্রষ্টাকেই স্মরণ করে। প্রার্থনা করে একটুখানি রোদের জন্য, উষ্ণতার জন্য।

প্রবল শীতে প্রতিদিন মৃত ব্যক্তির সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে শীতজনিত রোগের প্রকোপ। আমরা শীত কম থাকলে শীতের আগাম কোনো প্রস্তুতি গ্রহণ করি না। পৌষ শেষ। সামনে পুরো মাঘ মাসটি রয়েছে। কথায় আছে-‘মাঘের শীতে বাঘ পালায়।’ উত্তর জনপদে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে এলেই ঠান্ডা অস্থির করে তোলে। এখানে অনেক স্থানে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে আসছে তাপমাত্রা। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কি না, তা-ও গবেষণা করে দেখা জরুরি। আমাদের দেশের সহস্রাধিক নদীর মৃত্যুও এর কারণ কি না, তা-ও গবেষণার দাবি রাখে। শীত যে পর্যায়ে নেমে আসছে, তাতে বড় রকমের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা কম নয়।

শীতের তীব্রতা যতই হোক না কেন, গ্রামের কৃষিজীবীদের যেতে হয় বীজতলায়। সেখান থেকে কাদাপানিতে নেমে তাঁরা চারা রোপণ করেন। অনেকেই মাছ ধরেন। অনেকেই রিকশা চালান। শীত মৌসুমে অনেক নারী মাটি কাটার কাজ করেন। তাঁদের কোনো কাজ বন্ধ রাখার উপায় নেই। এসব তাঁদের জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন। অনেকের মাথার ওপর আছে ঋণের সাপ্তাহিক কিস্তির চাপ।

শীতজনিত রোগে অনেকের মৃত্যু হয়। মৃত্যুভয়ে ঘরে বসে থাকার কোনো উপায় তাঁদের নেই। তাঁদের আমরা উন্নয়নের নায়ক আখ্যা দিই। কিন্তু তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর কথা আমরা ভাবি না। এই নায়কেরা জানেন না দেশের অর্থনীতিতে তাঁদের অবদান কত বড়। আমাদের দেশ থেকে ব্রিটিশ বেনিয়ারা বিদায় হয়েছে, পাকিস্তানি শোষকগোষ্ঠীকে আমরা তাড়িয়েছি। কিন্তু আমাদের এখনো উন্নয়নবৈষম্য দূর হয়নি। না এক জেলার সঙ্গে অন্য জেলার, না উচ্চবিত্তের সঙ্গে বিত্তহীনের। সভ্যতার শুরু থেকে আজ অবধি শ্রমজীবীরা শ্রমের ন্যায্য অধিকার লাভ করেননি। তা ছাড়া, এ অঞ্চলের বিত্তহীন মানুষ সরকারের কাছে খুব বেশি সহযোগিতা আশাও করে না। বিপদের সময় এ অঞ্চলের মানুষ সহৃদয় মানুষের দিকে চেয়ে থাকে। বন্যার্ত মানুষের পাশে স্বেচ্ছাসেবীরা যেভাবে এসেছিলেন, সেভাবে শীতার্ত মানুষের পাশেও আসুন।

তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail.com